পুঁজিবাজারে অস্থিরতা: সপ্তাহের ব্যবধানে ৩ হাজার কোটি টাকা মূলধন উধাও
- আপডেট সময় ০৩:০৯:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
- / ৪ বার পড়া হয়েছে
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতায় দেশের পুঁজিবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন থেকে প্রায় ৩ হাজার ৩১ কোটি টাকা উধাও হয়ে গেছে।
শুধু গত সপ্তাহ নয়, মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে মূলধন হারানোর বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে শেয়ারবাজার। মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে বাজার থেকে মূলধন হারিয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এরপর মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে বাজারে তীব্র পতনে উধাও হয়ে যায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বাজার আবারও মূলধন হারায় ৪ হাজার কোটি টাকা। গত সপ্তাহেও পুঁজি হারানোর বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি শেয়ারবাজার। গত সপ্তাহে বাজার মূলধন হারায় ৩ হাজার ৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত এক মাসের ব্যবধানে ঢাকা স্টক একচেঞ্জ বাজার মূলধন হারিয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বড় মূলধনি কোম্পানিগুলোর শেয়ার বিক্রির চাপে গত সপ্তাহে বিশাল অঙ্কের মূলধন হারিয়েছে। যুদ্ধবিরতির আলোচনায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক ফল না আসায় বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা কাটছে না। যার প্রভাব সরাসরি পড়েছে সূচক ও বাজার মূলধনে।
গত সপ্তাহের শুরুতে ডিএসইর মোট বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। সপ্তাহ শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৬৩১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে বিনিয়োগকারীরা ৩ হাজার ৩১ কোটি টাকা সমমূল্যের বাজার মূলধন হারিয়েছেন।
এ সময় ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ২৫৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। তবে বড় কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস-৩০ সপ্তাহের ব্যবধানে ১২ পয়েন্ট হারিয়ে ১ হাজার ৯৯০ পয়েন্টে নেমে এসেছে। শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস অবশ্য কিছুটা স্থিতিশীলতা বজায় রেখে ৩ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৬৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
সূচক ও মূলধনে ভাটা পড়লেও গত সপ্তাহে লেনদেনের গতি ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেন ২২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৮১৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৬৭০ কোটি টাকা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেয়ারের দাম কমে যাওয়ায় কিছু বিনিয়োগকারী নতুন করে শেয়ার কেনার ঝুঁকি নিচ্ছেন। যদিও বড় একটি অংশ এখনো পর্যবেক্ষণমূলক অবস্থানে রয়েছেন।
গত সপ্তাহে সূচকের পতনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল বড় মূলধনি পাঁচটি কোম্পানির। এগুলো হলো ইসলামী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, ব্র্যাক ব্যাংক এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস।
খাতভিত্তিক লেনদেনে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ দখল নিয়ে শীর্ষে ছিল প্রকৌশল খাত। এরপর যথাক্রমে ওষুধ ও রসায়ন এবং সাধারণ বীমা খাতের অবস্থান ছিল। অন্যদিকে, রিটার্নের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ১ দশমিক ৪ শতাংশ লোকসান দিয়েছে ব্যাংক খাত।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা বড় অঙ্কের বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না। গত সপ্তাহের শুরুতে লভ্যাংশ পাওয়ার আশায় বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হলেও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার খবরে পুনরায় বিক্রয় চাপ শুরু হয়। ফলে বাজার পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
একই চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১১ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৭৬২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সিএসইতে গত সপ্তাহে লেনদেন হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ৯৩ কোটি টাকা কম।
শেয়ারবাজারে বর্তমানে এক ধরনের ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ অবস্থা বিরাজ করছে। লেনদেন বাড়লেও বাজার মূলধন উধাও হওয়া এবং বড় কোম্পানিগুলোর দরপতন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘স্থিতিশীল কিন্তু নাজুক’ হিসেবে দেখছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। একদিকে লেনদেন বাড়ায় বাজারে তারল্য ফেরার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক সংকট ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই বাজারের গতিপথ নির্ধারিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।



















