ঢাবিতে বিভিন্ন পদে ‘রাজনৈতিক’ রদবদল, পদত্যাগের হিড়িক
- আপডেট সময় ০৪:০৯:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
- / ১৯ বার পড়া হয়েছে
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে শুরু হয়েছে ব্যাপক রদবদল। অল্প সময়ের মধ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যাপক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানের পদত্যাগ দিয়ে শুরু হয়ে তা বিস্তৃত হয়েছে উপউপাচার্য, প্রক্টর এবং সহকারী প্রক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্তরে। ধারাবাহিক এই পরিবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে একধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, প্রশাসনের এই পুনর্বিন্যাস কেবল ব্যক্তি পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি নতুন ক্ষমতার কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়ার অংশ। আর এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে একচেটিয়া রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।
নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচদিনের মাথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান পদত্যাগ করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি শিক্ষামন্ত্রীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। এর আগে ১০ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি জানান, দায়িত্বের একটি পর্যায় শেষ হয়েছে এবং নতুন নেতৃত্বের জন্য জায়গা করে দেওয়াই সমীচীন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২৭ আগস্ট উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তিনি। তার পদত্যাগের পর নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম।
প্রশাসনিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী।
২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর সায়মা হক বিদিশা এই পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তবে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তাকে সরিয়ে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমেদ ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পর বিশ্ববিদ্যালয় এখন তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে এবং এই সময়ে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া যৌক্তিক।
তার পদত্যাগের পর চারুকলা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রাং (ইসরাফিল রতন)-কে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় নিরপেক্ষভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
এদিকে প্রক্টরের পদত্যাগের পরদিনই সহকারী প্রক্টর শেহরিন আমিন মোনামীও পদত্যাগ করেছেন। সোমবার এক ফেসবুক পোস্টে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পদত্যাগ করলেন মোনামীও
ঢাবি প্রশাসনিক পদ থেকে পদত্যাগের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ পদত্যাগ করেছেন সহকারী প্রক্টর শেহরিন আমিন মোনামী। সোমবার বেলা ১১টার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি নিজেই পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পোস্টে তিনি জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি সহকারী প্রক্টরের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
ফেসবুক পোস্টে শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামী লেখেন, শিক্ষকতা পেশার সাত বছরে তিনি কখনো প্রশাসনিক দায়িত্ব নেওয়ার কথা ভাবেননি। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করলেও প্রশাসনিক পদে আসার আগ্রহ তার ছিল না।
তবে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট সাবেক প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদের অনুরোধে তিনি দায়িত্বটি গ্রহণে আগ্রহী হন বলে জানান। এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘আমি সামান্য লেকচারার, তার চেয়েও সামান্য একজন মানুষ, এত বড় দায়িত্ব যা সচরাচর সিনিয়র শিক্ষকরা পান, সেই দায়িত্বে আমি!’
তিনি বলেন, নিজের দায়িত্ব পালনে তার মেয়াদে কতটা সফল হয়েছেন তা তিনি নির্ধারণ করতে চান না। তবে একটি দক্ষ টিমের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে তিনি ‘অভাবনীয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার পদ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে সরিয়ে নতুন নিয়োগ দেওয়ার আলোচনা চলছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
শুধু শীর্ষ পর্যায়েই নয়, রেজিস্ট্রার ভবনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ইতোমধ্যে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা বদলি, পদায়ন এবং নতুন নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
একচেটিয়া রাজনৈতিক মেরূকরণে উদ্বেগ
এদিকে প্রশাসনের এই ধারাবাহিক পরিবর্তনে একচেটিয়া রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের অনুসারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একচেটিয়া স্থলাভিষিক্তের মাধ্যমে রাজনৈতিক মেরূকরণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের একটি অংশ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, যদি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার ব্যক্তিরা ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলোতে আসীন হন, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এতে সিন্ডিকেটকেন্দ্রিক একটি একমুখী ক্ষমতা কাঠামো গড়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তাদের মতে, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে বহুমাত্রিক মত, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব থাকা জরুরি। অন্যথায় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণা পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে এসব অভিযোগ নাকচ করেছেন নতুন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী।
তিনি বলেন, যারা পদত্যাগ করেছেন তারা স্বেচ্ছায় করেছেন এবং কাউকে কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, প্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক প্রশাসনেরই নিজস্ব কাজের ধরন থাকে। যাদের সঙ্গে কাজ করলে কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা সম্ভব, তাদেরই বেছে নেওয়া হয়।’



















