নিজ দলের শতাধিক নেতাকর্মীর নামে ৪ মামলা এমপি আশরাফের
- আপডেট সময় ০২:৫১:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
- / ১৯ বার পড়া হয়েছে
নিজ দলের শতাধিক নেতাকর্মীর নামে ৪ টি মামলা দিয়েছেন লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে অপকর্মে জড়িয়ে পড়া নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নিজের ঘর থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন এমপি নিজান। ফলে বিতর্কিত অনেক নেতাকর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন এবং তৃণমূলে স্বস্তি ফিরে আসে।
সম্প্রতি দলীয় পরিচয়ে চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্য, সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দায়ের করা ৪ মামলায় প্রায় শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
সাধারণ মানুষের ভাষ্যমতে অতীতে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় এসব অপকর্ম নিয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস না পেলেও এবার ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে এ আসনে।
বিএনপির ৪ জন নেতা জানান, দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মহড়ায় জড়িত হওয়ার অভিযোগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রামগতিতে বিএনপির ২৬ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়। ওই দুইটি মামলার প্রেক্ষিতে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই অভিযোগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি কমলনগরের চরকাদিরা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম মেম্বার বাদী হয়ে ৩ নেতার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত বেশ কিছু নেতাকর্মীকে আসামি করে কমলনগর থানায় মামলা দায়ের করেন।
২০ এপ্রিল কমলনগরের চরলরেন্স ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মোরশেদ বাদী হয়ে যুবদল নেতা মিলনসহ ৫ জনের বিরুদ্ধ কমলনগর থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করেন। অজ্ঞাত আসামি করা হয় বেশ কিছু নেতাকর্মীকে। ওই মামলায় মিলনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠান পুলিশ। নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ওই ৪ মামলার মাধ্যমে নেতাকর্মীদের কড়া বার্তা দেন আশরাফ উদ্দিন নিজান। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ারও ঘোষণা দেন তিনি।
এর পর থেকে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনে দলীয় পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার, টেন্ডারবাজি, সাধারণ মানুষকে হয়রানির ঘটনা অনেকটা কমে যায়।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, একজন স্বচ্ছ রাজনীতিবিদ হিসেবে সারা দেশে নিজানের রয়েছে বেশ পরিচিতি। ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত টানা দুইবার এমপি হন আশরাফ উদ্দিন নিজান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে তিনি তৃতীয়বারের মত এমপি হন। বর্তমানে তিনি জাতীয় সংসদের হুইপ পদে রয়েছে।
এদিকে সাধারণ জনগণের মধ্যেও আশরাফ উদ্দিন নিজানের এমন সিদ্ধান্তে ইতিবাচক আলোচনা দেখা গেছে। অনেকে মনে করছেন, রাজনৈতিক দলে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে এলাকার উন্নয়ন ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা সহজ হয়। সে কাজটি করেছেন এমপি নিজান। এতে বিএনপির ভেতরে নতুন গতি তৈরি হয়েছে। আর এ কারণেই স্থানীয় রাজনীতিতে এমপির প্রশংসাও দিন দিন বাড়ছে। আগের তুলনায় বর্তমানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অপকর্মের ঘটনা তেমন নেই। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। বিশেষ করে বাজার, ঘাট ও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত চাপও কমে এসেছে বলে জানিয়েছেন তারা।
রামগতি উপজেলার কয়েকজন এ প্রতিবেদককে জানান, কিছু অসাধু নেতাকর্মী দীর্ঘদিন ধরে দলের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করেছেন। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এমপি নিজানের কঠোর অবস্থানকে স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখছেন তৃণমূলের কর্মী ও সাধারণ মানুষ। সাধারণত জনপ্রতিনিধিরা বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও নিজ দলের বিতর্কিত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখান। কিন্তু আশরাফ উদ্দিন নিজান সেই প্রচলিত ধারা ভেঙে দলীয় শৃঙ্খলা, সুস্থ রাজনীতি ও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এতে রাজনীতিতে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়েছে। এমপি নিজানের এমন কঠোরতায় রামগতি-কমলনগরের বিরোধী মতের নেতাকর্মীরা বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে।
তৃণমূল বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী জানান, ‘দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ায় এখন সবাই সতর্ক। কেউ আর দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপকর্ম করার সাহস পাচ্ছে না।’
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আশরাফ উদ্দিন নিজানের এ পদক্ষেপ নিয়ে চলছে আলোচনা। অনেকে এটিকে রাজনীতিতে সাহসী সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নিজের দলের বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সহজ নয়, কিন্তু এমপি নিজান সে সাহসিকতা দেখিয়েছেন। এমন উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে স্থানীয় রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
কমলনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক এম. দিদার হোসেন জানান, দলকে জনবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন রাখতে এমপি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারবে না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দলীয় পদ-পদবি বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়া নির্দেশ দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও পদ পদবি বিবেচনা না করে আইন প্রয়োগের নির্দেশনা দিয়েছেন।
রামগতি উপজেলা বিএনপির সভাপতি ডাক্তার জামাল উদ্দিন বলেন, এমপির এমন কর্মকাণ্ড প্রশংসিত হয়েছে। সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভরসার ঠিকানা তিনি। দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে এলাকার উন্নয়নে বেশী ব্যস্ত। সবসময় মানুষের কথা ভাবছেন। কোন অন্যাকে প্রশ্রয় না দিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা তার নির্দেশনায় কাজ করছি।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না, দীর্ঘমেয়াদি এ ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে নিয়মিত মনিটরিং ও সাংগঠনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই রাজনীতিতে শৃঙ্খলা ও জনআস্থা বাড়বে। এ উদ্যোগ যেন ধারাবাহিকভাবে চলমান থাকে। তাহলে রাজনীতিতে জবাবদিহিতা বাড়বে, সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের কমলনগর উপজেলা সভাপতি মিজানুর রহমান মানিক ও সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন জুয়েল বলেন, রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকলে কেউ ফ্যাসিস্ট হবেনা। মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করলে সেক্ষেত্রে এলাকার উন্নয়ন হবে। দুর্নীতি, দুঃশাসন ও দলীয়করণ আর থাকবেনা। এমপি নিজান সে ধারার রাজনীতি চালু করতে চায়। নিঃসন্দেহে এটি ভাল লক্ষ্মণ।
এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি একটি সুশৃঙ্খল দল। যারা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী বা সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতনে লিপ্ত হবে, তাদের বিরুদ্ধে দল ও প্রশাসন কঠোর হবে। নিজ দলের কেউ অপরাধ করলে তাকে আরো বেশি শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। চাঁদাবাজি ও মানুষের সঙ্গে আচরণ খারাপ করে কেউ ছাড় পাবেনা। এসব বিষয়ে বিএনপির হাইকমান্ড ‘জিরো টলারেন্স’। অপরাধী যেই হোক, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।



















