হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় স্থান পাননি অনেক প্রকৃত কৃষক
- আপডেট সময় ০১:১৭:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
- / ১৯ বার পড়া হয়েছে
সুনামগঞ্জে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ বোরো ফসলের জমি। স্বপ্নের ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক। এর পরপরই সারা জেলায় শুরু হয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কার্যক্রম। এ পর্যন্ত জেলায় মোট ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এই তালিকা প্রণয়ন ঘিরে নানা অভিযোগ উঠেছে হাওরপাড়ের কৃষকদের মধ্যে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, তালিকা তৈরির কাজে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার কারণে প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে পছন্দের ব্যক্তি কিংবা অকৃষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনেক কৃষকের দাবি, মেম্বার-চেয়ারম্যানরা নিজেদের স্বজনদের অগ্রাধিকার দিয়েছেন, ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই তালিকার বাইরে থেকে গেছেন।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ টন ধান, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এ পর্যন্ত জেলার ১৩৭টি ছোট-বড় হাওরে প্রায় ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী কৃষকদের তিন মাসব্যাপী মানবিক সহায়তা দেওয়া হবে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পাবেন ৭ হাজার ৫০০ টাকা, মাঝারি ক্ষতিগ্রস্তরা ৫ হাজার টাকা এবং কম ক্ষতিগ্রস্তরা পাবেন ২ হাজার ৫০০ টাকা। পাশাপাশি ২০ থেকে ৩০ কেজি করে চালও বিতরণ করা হবে। জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরের কৃষক মদরিছ আলী বলেন, ‘আমার ১৭ কেদার জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এক মুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারিনি। কিন্তু কেউ এসে আমার তথ্য নেয়নি। আমার ছেলে ইমন অনেক চেষ্টা করেও তালিকায় নাম তুলতে পারেনি। অথচ অনেক অকৃষকের নাম তালিকায় উঠেছে।’
শান্তিগঞ্জ উপজেলার শহীদ নুর আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, ‘তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের আত্মীয়স্বজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যাদের জমি নেই কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হননি, তাদের নামও তালিকায় এসেছে। অথচ অনেক প্রকৃত কৃষক বাদ পড়েছেন। তালিকা পুনঃযাচাই করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত।’
তাহিরপুর উপজেলার কৃষক মশিউর রহমান বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার হাওরে আমার ২০ কেদার জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু তালিকায় আমার নাম নেই। অথচ যাদের ক্ষতি হয়নি, তাদের নাম থাকার কথা শুনছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা জানান, তালিকায় প্রায় ৭০ শতাংশ প্রকৃত কৃষক স্থান পেলেও বাকি ৩০ শতাংশ নাম নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে তিনি বলেন, তালিকাভুক্তদের অনেকে সরাসরি কৃষক না হলেও ধান কাটা-মাড়াইসহ কৃষি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক বলেন, ‘হাওরে ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগামী মৌসুমে কৃষকদের বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান বলেন, ‘সুনামগঞ্জে ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ে কোনো অকৃষকের নাম পাওয়া গেলে তদন্তসাপেক্ষে তা বাদ দেওয়া হবে।’
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাওরের কৃষকদের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক। ফসলহানির কারণে তিনি তিন মাসব্যাপী মানবিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যেন এই সহায়তার আওতায় আসেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। কোনো দল বা গোষ্ঠী নয়, প্রকৃত কৃষকরাই যেন তালিকায় স্থান পান—সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।’



















