কুবিতে ফের ‘গণরুম সংস্কৃতি’ চালু করলেন ছাত্রদল নেতারা, দুই রুমে তুললেন ২৪ জনকে
- আপডেট সময় ০২:০৬:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
- / ৩৫ বার পড়া হয়েছে
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) গণরুম সংস্কৃতি বিলুপ্তির প্রায় তিন বছর পর আবার তা ফিরে আসার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত নীতিমালা উপেক্ষা করে আবাসিক হলে শিক্ষার্থী ওঠানোর অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে। বিজয়-২৪ হলে প্রশাসনের অনুমতি ব্যতিরেকেই নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্তত ২৪ শিক্ষার্থীকে হলে তোলার ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে নীতিমালার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি ছিল, সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হলে ছাত্র ওঠানোর এই ঘটনায় কুবির আবাসন ব্যবস্থা আবারও পুরোনো বিশৃঙ্খলায় ফিরে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষক- শিক্ষার্থীদের মুখে। ঘটনাটি ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও গণরুম সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছ। তবে অভিযুক্ত নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করলেও হল প্রভোস্ট জানিয়েছেন, এতে নির্ধারিত আবাসন নীতিমালা উপেক্ষিত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মেধা, সিনিয়র-জুনিয়র, দূরত্ব ও আর্থিক অবস্থাসহ কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে আবাসিক হলে সিট বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম করা হয়। কিন্তু এসব নিয়ম অনুসরণ না করে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মো. আবুল বাশার ও যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাসিম বিল্লাহ রিফাত (পাটোয়ারী) নিজেদের অনুসারী শিক্ষার্থীদের হলে তোলার উদ্যোগ নেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিজয়-২৪ হলের ১০১ ও ১০৮ নম্বর কক্ষে ১২ জন করে মোট ২৪ জন শিক্ষার্থীকে রাখা হয়েছে। তারা সবাই ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। প্রথম দফায় ১০৮ নম্বর কক্ষে শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করেন ছাত্রদল কর্মী তুহিব মাহমুদ, যিনি সদস্য সচিব আবুল বাশারের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। পরে দ্বিতীয় দফায় ১০১ নম্বর কক্ষে আরও ১২ জন শিক্ষার্থীকে থাকার ব্যবস্থা করেন যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাসিম বিল্লাহ রিফাত (পাটোয়ারী)।
দুই কক্ষে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা হল প্রশাসনের মাধ্যমে নয়, বরং ছাত্রদলের সিনিয়র নেতাদের সহযোগিতায় হলে উঠেছেন। ১০৮ নম্বর কক্ষের শিক্ষার্থীরা জানান, তুহিব মাহমুদের মাধ্যমে তারা হলে ওঠেন। অন্যদিকে ১০১ নম্বর কক্ষের শিক্ষার্থীরা বলেন, তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন মোতাসিম বিল্লাহ রিফাত (পাটোয়ারী)।
তবে কয়েকজন শিক্ষার্থী দাবি করেন, হলে ওঠার আগে তারা হলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আমিরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। যদিও এ দাবি নাকচ করে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।”
অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রদল কর্মী তুহিব মাহমুদ বলেন, “আমার নামে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই অসহায় শিক্ষার্থীদের হলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক সমস্যায় ছিল। তাদের সমস্যার কথা বিবেচনা করে প্রভোস্টের সহযোগিতায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাসিম বিল্লাহ রিফাত (পাটোয়ারী) বলেন, “এখানে আহামরি কিছু হয়নি। ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা অনেক আগে ভাইভা দিয়েছে। তারা আবাসনের সমস্যার কথা জানালে বিষয়টি প্রভোস্ট স্যারকে জানাই। তিনি বলেন, ১৮ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা উপরে উঠলে ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সিট দেওয়া সহজ হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এরপর ১০১ নম্বর কক্ষে থাকা ১৮ ব্যাচের দুই শিক্ষার্থীকে তাদের বন্ধুদের কক্ষে ডাবলিং করে থাকতে বলি। আমি কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে হলে তুলিনি। পরে পুরো বিষয়টি প্রভোস্টকে জানিয়েছি।”
শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব আবুল বাশার বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে হলে উঠাইনি। যতটুকু জানি, ১০৮ নম্বর কক্ষে যে শিক্ষার্থীরা উঠেছে, তারা হল প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই উঠেছে। প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের আবাসনের বিষয়ে সহযোগিতা চেয়েছে। আমি শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমন্বয় করেছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেটির কোনো সত্যতা নেই। আমরা কাউকে অবৈধভাবে হলে তুলি না। অনেক শিক্ষার্থী পারিবারিক ও আর্থিক সংকটের কারণে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আমরা বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়ে সমাধানের চেষ্টা করি।”
গণরুম সংস্কৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গণরুম বা গেস্টরুম সংস্কৃতি চালুর কোনো সুযোগ নেই। আমরা এ ধরনের সংস্কৃতির পক্ষে নই। বর্তমানে আবাসন সংকট রয়েছে। প্রশাসনের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের হলে থাকার ব্যবস্থা করা উচিত।”
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, “মাত্রই বিষয়টি জানতে পেরেছি। হলে যে-ই উঠুক, তাকে নিয়ম মেনেই উঠতে হবে। সে আমার দলের কর্মী হোক বা অন্য কেউ, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।”
বিজয়-২৪ হলের প্রভোস্ট মাহমুদুল হাসান খান বলেন, “দুই কক্ষে দুই গ্রুপের ২৪ জন শিক্ষার্থী উঠেছে। ১০৮ নম্বর কক্ষে বাশারের গ্রুপ এবং ১০১ নম্বর কক্ষে রিফাতের গ্রুপের শিক্ষার্থীরা উঠেছে। তারা কেউই হলে ওঠার আগে আমাকে জানায়নি। ওঠানোর পরে আমার সঙ্গে সমন্বয় করেছে। আমি তাদের কোনো তালিকা দিইনি।”
তিনি আরও বলেন, “আমি কিছুদিন পরেই হলের আবাসিকতার তালিকা প্রকাশ করতাম। জুনিয়র শিক্ষার্থীরা কথা না শোনায় কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থীকে বলেছিলাম, ১৮ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা উপরে উঠলে ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সিট দেওয়া সহজ হবে। তবে আমাকে আগে না জানিয়েই শিক্ষার্থীদের হলে তোলা হয়েছে।”





















