গ্যাস সংকটে শিল্পে হাহাকার, ছুটিতে হাজারো শ্রমিক
- আপডেট সময় ০২:৪০:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
- / ২৬ বার পড়া হয়েছে
নরসিংদীর পাঁচদোনা ইউনিয়নের তালহা টেক্স প্রো. লিমিটেড গত বুধবার হঠাৎ করে শ্রমিকদের ছুটি ঘোষণা করে। কারখানার পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, গ্যাস সরবরাহ না বাড়ায় দুদিন বন্ধ থাকবে প্রতিষ্ঠানটি। এই ছুটি পরবর্তী সময়ে সাপ্তাহিক বন্ধের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। কারখানাটির শ্রমিকদের দাবি, এর আগেও গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাটি কয়েক দফায় কর্মীদের ছুটিতে পাঠিয়েছে। গতকাল শনিবার কারখানা চালু করার ঘোষণা দেওয়া হলেও গ্যাসের চাপ না থাকায় ছুটি আরো বাড়িয়ে আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত করা হয়েছে।
শুধু তালহা টেক্স কারখানাই নয়, বরং গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র গ্যাস সংকটে এমন আকস্মিক ছুটিতে যেতে হয়েছে অনেক কারখানাকে। আর কিছু কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলে একসঙ্গে ২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হওয়ায় শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শিল্পকারখানাগুলোর গ্যাসের পরিস্থিতি আদৌ বদলাবে কি নাÑসেটিও নিশ্চিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে জীবন-জীবিকা নিয়ে সংকটে রয়েছেন শ্রমিকরা। অন্যদিকে যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পেরে ক্রয়াদেশ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন উদ্যোক্তারা।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশে গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করে। এ ঘটনার ফলে রাতারাতি দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ বন্ধ হয়ে যায় এবং শিল্পোৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গৃহস্থালির রান্নায় তীব্র ভোগান্তি শুরু হয়। শিল্পকারখানাগুলোর জ্বালানির প্রধান উৎস গ্যাস। এ সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত ঠিক কতটি কারখানা বন্ধ হয়েছেÑএ ব্যাপারে শিল্প সংগঠন ও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য জানানো হয়নি। তবে শিল্পকারখানার উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, গত এক মাসে গ্যাস সংকটের কারণে শতাধিক কারখানা সাময়িক বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া প্রায় সমপরিমাণ কারখানায় উৎপাদন না থাকায় কর্তৃপক্ষ তাদের কর্মীদের ছুটিতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে। ফলে বেকারত্বের ঝুঁকিতে পড়েছে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশেষ করে আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, কালিয়াকৈর, ময়মনসিংহ, ভালুকা, ত্রিশাল, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকটের মুখে পড়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। এর মধ্যে কেবল নরসিংদীতেই ছোট-বড় শতাধিক শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। এর মধ্যে রয়েছে নিত্যপণ্য, ওষুধ, সিরামিক, ইস্পাতসহ গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন শিল্পকারখানা। কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রেখেছে। এতে তাদের ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) গ্যাস-বিদ্যুতের বিল ১২টি সমান কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চেয়ে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। ওই চিঠিতে সংগঠনটির দাবি, গ্যাসের ঘাটতির কারণে উৎপাদন সচল রাখতে কারখানাগুলোকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নগদ অর্থে অতিরিক্ত দামে ডিজেল, এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানি সংগ্রহ করেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কারখানাগুলোর নগদ অর্থপ্রবাহেও চাপ তৈরি হয়েছে।
জানতে চাইলে তালহা টেক্স প্রো. লিমিটেডের পক্ষে জাবের-জোবায়ের গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক সিফাত হোসেন ফাহিম আমার দেশকে বলেন, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে গত এক মাসে অন্তত ১৫ দফা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছি। এ সময় আমাদের ৬০ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কারখানা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলেও মনে করেন তিনি। এ কারণে দ্রুত সমস্যার সমাধানে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এদিকে গত জুন মাসে গাজীপুরে দুটি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রায় ১,৮০০ শ্রমিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। এছাড়া চলতি মাসে আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানা তাদের ৫৬৫ শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক অর্থায়নের অভাব ও কাজের সংকটকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। শিল্প পুলিশ ও ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরে গ্যাস সংকটের কারণে চলতি মাসেই প্রায় ২০ শতাংশ শিল্পকারখানা উৎপাদন কমিয়ে বা বাড়তি ছুটি দিয়ে কার্যক্রম সীমিত রেখেছে। এসব কারণে সামনে দেশের রপ্তানি আয়ে প্রভাব পড়বে বলেও মনে করেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, শিল্পাঞ্চলগুলোতে আগে থেকেই গ্যাসের সংকট থাকলেও গত প্রায় ২০ দিনের পরিস্থিতি ছিল নজিরবিহীন। দেশের বিভিন্ন এলাকার কারখানা এমন সংকটে পড়েছে যে, গ্যাসের চাপ কোথাও শূন্যে, আবার কোথাও এক পিএসআইয়ে নেমে এসেছিল। অথচ উৎপাদন চালাতে অন্তত তিন থেকে চার পিএসআই চাপ প্রয়োজন। তিনি বলেন, তার নিজের কারখানাও প্রায় ২০ দিন বন্ধ ছিল।
বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, এমন চলতে থাকলে উৎপাদনের অভাবে কারখানাগুলোর আয় বন্ধ হয়ে যাবে। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়া যাবে না। আবার ব্যাংকের ঋণও পরিশোধ করতে পারবে না। এক পর্যায়ে কারখানার মালিকরা দেউলিয়া হয়ে পড়বেন। ফলে বন্ধ হয়ে যাবে কারখানা, বাড়বে বেকারত্বের চাপ।



















