ঢাকা ১০:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে চার নারীর কথা বলেন নুসরাত, ফাঁসি বহাল দুই পুরুষের

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৭:৩৭:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৮১ বার পড়া হয়েছে

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল ও চার আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই মামলায় বাকি ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী  শিশির মনির।

সোমবার (২৪ আগস্ট) নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ মন্তব্য করেন।

শিশির মনির বলেন, নুসরাত মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিতে চারজন নারীর কথা বলেছিলেন। আর সাজার সময় একজন নারী পাওয়া গেল, বাকি তিনজন পুরুষ হয়ে গেল কী করে? এটা রহস্য থেকে থেকে গেল। আর নুসরাতের সাইক্লোন সেন্টারের তিন তলার উপরে নুসরাতের গায়ে কীভাবে সেখানে আগুন লাগাল? কেউই শুনল না, আশপাশের কেউ জানল না, কেউ শব্দ পেল না—একা একা কী আগুন লেগে গেল? এই অংশের রহস্য থেকেই গেল।

নুসরাত হত্যা মামলাকে চাঞ্চল্যকর উল্লেখ করে  শিশির মনির বলেন, বিচারিক আদালত মামলায় ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ১২ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন। বাকি চারজনের কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ছিল না।

তিনি আরও বলেন, ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে হাইকোর্ট ১০ আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন, চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন এবং দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন।

শিশির মনির আরও বলেন, বিচারিক আদালতের রায়ে নির্বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে এসেছে। সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর ওপর এর ‘বিধ্বংসী প্রভাব’ পড়েছে বলেও আদালত মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে ওই বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও জানান, মামলায় তিনি তিন আসামির আইনজীবী ছিলেন। তারা হলেন কামরুন নাহার মনি, সাইফুর রহমান জুবায়ের ও মোহাম্মদ শামীম। তাদের মধ্যে মনি ও মোহাম্মদ শামীম খালাস পেয়েছেন। সাইফুর রহমান জুবায়েরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

শিশির মনির বলেন, আমরা জুবায়েরের জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করব।

মামলার ঘটনাস্থলে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি বলেন, আমরা আদালতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি যুক্তি তুলে ধরেছিলাম, রাষ্ট্রপক্ষ তার জবাব দেয়নি। ছয় বছর আগেও সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা বা প্রসিকিউশন সেই ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে আদালতে উপস্থাপন করেনি।

তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ আদালতে উপস্থাপন করা হলে কে কাকে কোথায় কী করেছে, কীভাবে কে কাকে মেরেছে কিংবা মারেনি—এসব সুনির্দিষ্টভাবে বোঝা যেত। ফুটেজ পাওয়া গেলে মামলার মূল ভিত্তি ও আসামিপক্ষের যুক্তি ভিন্ন হতে পারত।

নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দির অডিও ও ভিডিও হাইকোর্টে উপস্থাপনের জন্য তারা আবেদন করেছিলেন বলেও জানান শিশির মনির। তার মতে, ওই ভিডিও সরাসরি দেখা হলে নুসরাত কী বলেছিলেন এবং কী বলেননি, তা স্পষ্টভাবে বোঝা যেত।

শিশির মনিরের দাবি, মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে চারজন বোরকা পরা নারীর কথা বলা হলেও পরবর্তী মামলায় তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আসামি পাওয়া যায়নি। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী হওয়ায় জবানবন্দিতে উল্লেখ করা চার নারীর সঙ্গে মামলার আসামিদের মিল না থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে।

তিনি আরও বলেন, কিন্তু একটা রহস্য থেকে গেল যে তিন তালার উপরে সাইক্লোন সেন্টারে নুসরাতের গায়ে কি করে আগুন লাগলো কেউই শুনল না, আশপাশের লোক কেউ জানল না, কেউ শব্দ পেল না একা একা আগুন লেগে গেল- এই পার্টটুকুর রহস্য এখানে থেকেই গেল। ফলে আমরা এর বিরুদ্ধে আপিল করব। আমরা আশা করি আপিল বিভাগে গিয়ে এই রহস্যের উন্মোচন হবে।

এর আগে, সোমবার (২৪ আগস্ট) হাইকোর্টের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। একইসঙ্গে চারজনের যাবজ্জীবন এবং ১০ জনকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা আসামিরা হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি)মাদরাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম। যাদের যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে তারা হলেন, নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের এবং উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।

খালাসপ্রাপ্তরা হলেন, কামরুন নাহার মনি, হাফেজ আব্দুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, আব্দুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন, আবছার উদ্দিন, তৎকালীন কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর।

এছাড়া নুসরাত হত্যার মামলার রায় দেওয়া ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদকে ফৌজদারি মামলা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাইন্ডলেস সেন্টেন্স তথা বিচারিক বিবেচনাবোধ প্রয়োগ না করে ১৬ আসামিকে ফাঁসি দেওয়ায় ওই বিচারকের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির ও মোহাম্মদ ইমাম হোসেন তারেক এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবা তাসনিম আঁখি। অন্যদিকে, আসামিপক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, এস এম শাহজাহান, মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ শিশির মনির ও আইনজীবী খন্দকার মুশফিকুল হুদা, এস এম মাসুদ হোসেন দোলন প্রমুখ।

নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ জন আসামির মধ্যে আদালত দুজন আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়কে বহাল রেখেছেন। তারা হলেন এই মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ-দৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম। আদালত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে চারজনের সাজা মৃত্যুদণ্ড থেকে কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। তারা হলেন নুর উদ্দিন, জাবেদ, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের এবং উম্মে সুলতানা পপি।

১৬ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্য থেকে ১০ জনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় কিংবা দণ্ডটি আদালতের দৃষ্টিতে বহাল থাকা উচিত নয় মর্মে ১০ জন ব্যক্তিকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়েছে। তারা হলেন কামরুন নাহার মনি (ঘটনার সময় যিনি গর্ভবতী ছিলেন), হাফেজ মোহাম্মদ আবদুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন মামুন, আব্দুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, রুহুল আমিন, আবসার উদ্দিন এবং মাকসুদ কাউন্সিলর। এই ১০ জনের বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের দৃষ্টিতে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় তাদেরকে খালাস প্রদান করা হয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, এই রায়ের পরে আদালত নিম্ন আদালত কর্তৃক প্রদত্ত যে রায়, সে বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। এই মামলার নিম্ন আদালতের বিচারক যিনি ছিলেন, বিচারক মামুনুর রশিদ—তার সম্পর্কে আদালত বলেছেন যে একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড প্রদানটা অনেকটা মাইন্ডলেস সেন্টেন্স। অর্থাৎ আদালত তার বিচারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার পুরোপুরি মনের কিংবা বিচারিক যে জুডিশিয়াল মাইন্ড থাকা দরকার, তিনি সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এবং তিনি এই জাজমেন্টটা রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে কার কীভাবে দণ্ড দেওয়া উচিত, কার কী কতটুকু মামলার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা-সেটাও আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই বিচারক মামুনুর রশিদকে অবিলম্বে পেনাল এবং সেন্টেন্সিং-অর্থাৎ ফৌজদারি মামলার বিচার এবং সে ক্ষেত্রে তার দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্র থেকে তাকে সরিয়ে আনার জন্য আইন, বিচার এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশনা প্রকাশ করেছেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।

মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি ঘটান। এ ঘটনায় মামলা হলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান (নোমান) সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ। আলোচিত সে রায়ে মামলার প্রধান আসামি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে চার নারীর কথা বলেন নুসরাত, ফাঁসি বহাল দুই পুরুষের

আপডেট সময় ০৭:৩৭:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল ও চার আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই মামলায় বাকি ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী  শিশির মনির।

সোমবার (২৪ আগস্ট) নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ মন্তব্য করেন।

শিশির মনির বলেন, নুসরাত মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিতে চারজন নারীর কথা বলেছিলেন। আর সাজার সময় একজন নারী পাওয়া গেল, বাকি তিনজন পুরুষ হয়ে গেল কী করে? এটা রহস্য থেকে থেকে গেল। আর নুসরাতের সাইক্লোন সেন্টারের তিন তলার উপরে নুসরাতের গায়ে কীভাবে সেখানে আগুন লাগাল? কেউই শুনল না, আশপাশের কেউ জানল না, কেউ শব্দ পেল না—একা একা কী আগুন লেগে গেল? এই অংশের রহস্য থেকেই গেল।

নুসরাত হত্যা মামলাকে চাঞ্চল্যকর উল্লেখ করে  শিশির মনির বলেন, বিচারিক আদালত মামলায় ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ১২ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন। বাকি চারজনের কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ছিল না।

তিনি আরও বলেন, ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে হাইকোর্ট ১০ আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন, চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন এবং দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন।

শিশির মনির আরও বলেন, বিচারিক আদালতের রায়ে নির্বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে এসেছে। সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর ওপর এর ‘বিধ্বংসী প্রভাব’ পড়েছে বলেও আদালত মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে ওই বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও জানান, মামলায় তিনি তিন আসামির আইনজীবী ছিলেন। তারা হলেন কামরুন নাহার মনি, সাইফুর রহমান জুবায়ের ও মোহাম্মদ শামীম। তাদের মধ্যে মনি ও মোহাম্মদ শামীম খালাস পেয়েছেন। সাইফুর রহমান জুবায়েরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

শিশির মনির বলেন, আমরা জুবায়েরের জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করব।

মামলার ঘটনাস্থলে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি বলেন, আমরা আদালতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি যুক্তি তুলে ধরেছিলাম, রাষ্ট্রপক্ষ তার জবাব দেয়নি। ছয় বছর আগেও সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা বা প্রসিকিউশন সেই ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে আদালতে উপস্থাপন করেনি।

তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ আদালতে উপস্থাপন করা হলে কে কাকে কোথায় কী করেছে, কীভাবে কে কাকে মেরেছে কিংবা মারেনি—এসব সুনির্দিষ্টভাবে বোঝা যেত। ফুটেজ পাওয়া গেলে মামলার মূল ভিত্তি ও আসামিপক্ষের যুক্তি ভিন্ন হতে পারত।

নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দির অডিও ও ভিডিও হাইকোর্টে উপস্থাপনের জন্য তারা আবেদন করেছিলেন বলেও জানান শিশির মনির। তার মতে, ওই ভিডিও সরাসরি দেখা হলে নুসরাত কী বলেছিলেন এবং কী বলেননি, তা স্পষ্টভাবে বোঝা যেত।

শিশির মনিরের দাবি, মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে চারজন বোরকা পরা নারীর কথা বলা হলেও পরবর্তী মামলায় তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আসামি পাওয়া যায়নি। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী হওয়ায় জবানবন্দিতে উল্লেখ করা চার নারীর সঙ্গে মামলার আসামিদের মিল না থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে।

তিনি আরও বলেন, কিন্তু একটা রহস্য থেকে গেল যে তিন তালার উপরে সাইক্লোন সেন্টারে নুসরাতের গায়ে কি করে আগুন লাগলো কেউই শুনল না, আশপাশের লোক কেউ জানল না, কেউ শব্দ পেল না একা একা আগুন লেগে গেল- এই পার্টটুকুর রহস্য এখানে থেকেই গেল। ফলে আমরা এর বিরুদ্ধে আপিল করব। আমরা আশা করি আপিল বিভাগে গিয়ে এই রহস্যের উন্মোচন হবে।

এর আগে, সোমবার (২৪ আগস্ট) হাইকোর্টের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। একইসঙ্গে চারজনের যাবজ্জীবন এবং ১০ জনকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা আসামিরা হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি)মাদরাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম। যাদের যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে তারা হলেন, নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের এবং উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।

খালাসপ্রাপ্তরা হলেন, কামরুন নাহার মনি, হাফেজ আব্দুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, আব্দুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন, আবছার উদ্দিন, তৎকালীন কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর।

এছাড়া নুসরাত হত্যার মামলার রায় দেওয়া ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদকে ফৌজদারি মামলা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাইন্ডলেস সেন্টেন্স তথা বিচারিক বিবেচনাবোধ প্রয়োগ না করে ১৬ আসামিকে ফাঁসি দেওয়ায় ওই বিচারকের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির ও মোহাম্মদ ইমাম হোসেন তারেক এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবা তাসনিম আঁখি। অন্যদিকে, আসামিপক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, এস এম শাহজাহান, মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ শিশির মনির ও আইনজীবী খন্দকার মুশফিকুল হুদা, এস এম মাসুদ হোসেন দোলন প্রমুখ।

নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ জন আসামির মধ্যে আদালত দুজন আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়কে বহাল রেখেছেন। তারা হলেন এই মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ-দৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম। আদালত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে চারজনের সাজা মৃত্যুদণ্ড থেকে কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। তারা হলেন নুর উদ্দিন, জাবেদ, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের এবং উম্মে সুলতানা পপি।

১৬ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্য থেকে ১০ জনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় কিংবা দণ্ডটি আদালতের দৃষ্টিতে বহাল থাকা উচিত নয় মর্মে ১০ জন ব্যক্তিকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়েছে। তারা হলেন কামরুন নাহার মনি (ঘটনার সময় যিনি গর্ভবতী ছিলেন), হাফেজ মোহাম্মদ আবদুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন মামুন, আব্দুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, রুহুল আমিন, আবসার উদ্দিন এবং মাকসুদ কাউন্সিলর। এই ১০ জনের বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের দৃষ্টিতে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় তাদেরকে খালাস প্রদান করা হয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, এই রায়ের পরে আদালত নিম্ন আদালত কর্তৃক প্রদত্ত যে রায়, সে বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। এই মামলার নিম্ন আদালতের বিচারক যিনি ছিলেন, বিচারক মামুনুর রশিদ—তার সম্পর্কে আদালত বলেছেন যে একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড প্রদানটা অনেকটা মাইন্ডলেস সেন্টেন্স। অর্থাৎ আদালত তার বিচারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার পুরোপুরি মনের কিংবা বিচারিক যে জুডিশিয়াল মাইন্ড থাকা দরকার, তিনি সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এবং তিনি এই জাজমেন্টটা রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে কার কীভাবে দণ্ড দেওয়া উচিত, কার কী কতটুকু মামলার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা-সেটাও আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই বিচারক মামুনুর রশিদকে অবিলম্বে পেনাল এবং সেন্টেন্সিং-অর্থাৎ ফৌজদারি মামলার বিচার এবং সে ক্ষেত্রে তার দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্র থেকে তাকে সরিয়ে আনার জন্য আইন, বিচার এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশনা প্রকাশ করেছেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।

মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি ঘটান। এ ঘটনায় মামলা হলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান (নোমান) সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ। আলোচিত সে রায়ে মামলার প্রধান আসামি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়।