শরীয়তপুরের ১২ কোটি টাকার সেতুতে উঠতে লাগে বাঁশের সাঁকো
- আপডেট সময় ০১:৫৯:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
- / ২৭ বার পড়া হয়েছে
প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন কংক্রিটের সেতু। কিন্তু মূল কাঠামো তৈরি হলেও সেতুতে ওঠার জন্য নেই সংযোগ সড়ক। ভরসা কেবল বাঁশের তৈরি প্রায় ২৫ ফুট উঁচু চঙ্গ বা সিঁড়ি। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ঘড়িসার ইউনিয়নের হুগলী নদীর ওপর নির্মিত ৯০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ভোগান্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তিন বছর আগে সেতুর মূল নির্মাণকাজ শেষ হলেও মাত্র ১০৫ মিটার সংযোগ সড়কের অভাবে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন বাঁশের চঙ্গ বেয়ে সেতুতে ওঠানামা করছেন হাজারো মানুষ।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেতুর পশ্চিম প্রান্তে ওঠার জন্য কোনো সড়ক নেই। সেখানে বাঁশ দিয়ে তৈরি চঙ্গ বা সিঁড়ির মতো একটি সাঁকো ব্যবহার করে মানুষকে সেতুতে উঠতে হচ্ছে। সামান্য অসাবধানতাতেই ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য পথটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষার সময় চঙ্গ পিচ্ছিল হয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সঙ্গে ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানার একাংশের সহজ সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে পদ্মার শাখা হুগলী নদী শত শত বছর ধরে নড়িয়া থানার সঙ্গে সখিপুর থানার বিস্তীর্ণ অংশকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। তবুও শিক্ষা গ্রহণে নড়িয়ার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসা নিতে নড়িয়ার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল সখিপুরের এই অংশের অন্তত ছয়টি ইউনিয়নের মানুষ। এ ছাড়া কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণেও নড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী ঘড়িসার বাজারের ওপর নির্ভরশীল তারা। ফলে বাধ্য হয়েই নদীর থিরোপাড়া-স্বর্ণখোলা পয়েন্টে নৌকা ও ট্রলারে খেয়াপার হয়ে উত্তাল নদী পার হতে হতো সাধারণ মানুষকে।
বিগত দিনে নৌকাডুবিতে এখানে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে দুই উপজেলার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দুই পাশের অ্যাপ্রোচ সড়কসহ সেতুটি নির্মাণে ১১ কোটি ২৩ লাখ ৪৩ হাজার ৯২৫ টাকা বরাদ্দ দেয়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নিয়াজ আর কে জে ভি ২০২১-২২ অর্থবছরে কাজ শুরু করে। তারা ৯০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই পিএসসি গার্ডার ব্রিজ এবং সখিপুর অংশের সেতুর পূর্ব পাশে ১৮৩ মিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন করে। জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় নড়িয়া অংশের ১০৫ মিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সেতুটি তৈরির পর খেয়াপারাপার বন্ধ হয়ে যায়। তিন বছর আগে সেতুটি সম্পূর্ণ হলেও অ্যাপ্রোচ সড়কের পশ্চিম প্রান্ত থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করে উঠতে হচ্ছে এই সেতুতে।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মিথিলা বলেন, বৃষ্টি হলে চঙ্গ পিচ্ছিল হয়ে যায়। কয়েকবার পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছি। এ কারণে স্কুলে যেতেও দেরি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আমেনা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, সাড়ে ১২ কোটি টাকার ব্রিজ হয়েছে, কিন্তু আমাদের দুর্ভোগ কমেনি। এই চঙ্গ দিয়ে অসুস্থ মানুষ নিয়ে ওঠানামা করা খুবই কষ্টের।
কৃষক আজগর হাওলাদার বলেন, সংযোগ সড়ক না থাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে আমাদের অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় ও পরিবহন খরচ—দুটিই বাড়ছে।
তবে জমির মালিকদের দাবি, তারা উন্নয়নের বিপক্ষে নন। জমির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হলে তারা জমি দিতে প্রস্তুত।
জমির মালিক শাহ আলম মাল বলেন, আমরা জমি দিতে রাজি। কিন্তু ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দোকান সরিয়ে দিলে আমাদের আয় বন্ধ হয়ে যাবে। তাই বিষয়টির একটি সমাধান হওয়া দরকার।
নড়িয়া উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, জমি নিয়ে জটিলতার কারণেই সংযোগ সড়কের কাজ আটকে আছে। জমির মালিকেরা ক্ষতিপূরণ ছাড়া জমি দিতে রাজি না হওয়ায় সেখানে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।
শরীয়তপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রাফেউল ইসলাম বলেন, প্রকল্প গ্রহণের সময় স্থানীয়রা জমি দেওয়ার বিষয়ে মৌখিকভাবে সম্মতি দিলেও পরে জমির মালিকেরা অবস্থান পরিবর্তন করেন। প্রকল্পের বরাদ্দে জমি কেনার অর্থ না থাকায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে বিকল্প কোনো উপায়ে সংযোগ সড়কটি দ্রুত নির্মাণের চেষ্টা চলছে।



















