লেবুফুলের সুবাসের শহর এখন লাশের দুর্গন্ধে ভারী
- আপডেট সময় ০৫:৩২:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
- / ৩৪ বার পড়া হয়েছে
লেবু বাগানের জন্য একসময় খ্যাতি ছিল সুদানের উত্তর কোর্দোফানের বাজার শহর বাড়া-র। বসন্ত আসতেই শহরের রাস্তাগুলোতে ভরে থাকত লেবুফুলের মিষ্টি সুবাস। কিন্তু আজ অবরুদ্ধ দশা, যুদ্ধ আর নৃশংস গণহত্যার পর বাড়া পুরোপুরি পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। যে গাছে পানি পড়ার কথা ছিল, সেখানে ঢেলে দেওয়া হয়েছে মানুষের রক্ত।
২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এই শহরের জনসংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। আজ আর কেউ বেঁচে নেই বললেই চলে। শহরের রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য লাশ। আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর হাতে নিহত এসব নাগরিকদের দাফন করতেও দেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি সুদানের সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) ও তাদের সহযোগীরা আরএসএফ-কে পরাজিত করে শহরটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করার পর সেখানে প্রবেশের সুযোগ পান স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র—ঘরবাড়ি ও রাস্তায় পচে গলছে বহু লাশ। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, বাড়ার বাতাসে আজ লেবুফুলের পরিপূরক হয়ে উঠেছে গলিত লাশের দুর্গন্ধ।
শহরের এক প্রকৌশলী সতর্ক করে জানিয়েছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এসব গলিত লাশ বাড়ার পুরো পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিষাক্ত করে তুলতে পারে।
তিনি বলেন, ‘বাড়ার পানির মূল উৎস ভূগর্ভস্থ কূপ, যার গভীরতা ২০ থেকে ৩০ মিটারের বেশি নয়। পচন ধরা লাশগুলোর তরল উপাদান এসব পানির উৎসে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এমনটা ঘটলে মানুষ ও গবাদিপশুর জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়বে।’
খাড়তুম থেকে খনিজসমৃদ্ধ কোর্দোফান যাওয়ার কৌশলগত রুটে অবস্থিত এই শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তুমুল লড়াই চলছে আরএসএফ-এসএএফের মধ্যে। গত বছরের অক্টোবরে আরএসএফ শহরটি দখল করে এবং ৬০ কিলোমিটার দূরের সেনাঘাঁটি ‘এল-ওবেইদ’-এ ড্রোন হামলার ঘাঁটি হিসেবে এটি ব্যবহার করে।
উত্তর কোর্দোফানের পপুলার রেজিস্ট্যান্স কমিটির সদস্য ওসমান আব্দুল লতিফ জানান, ‘বাড়ায় ঘটে যাওয়া আরএসএফের নৃশংসতার কথা অন্য অঞ্চলের মতো গণমাধ্যমে ততটা আসেনি, তবে আমরা ধারণা করছি বাড়া ও তার আশেপাশের গ্রামগুলোতে শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা সেনা নিয়ন্ত্রণের পর গিয়ে দেখি সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরো শহর জনশূন্য, কেবল দুজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বেঁচে আছেন, যাদের দীর্ঘদিন খেতে দেওয়া হয়নি।’
তিনি আরও জানান, শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাশ দ্রুত অপসারণ এবং পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ অবিস্ফোরিত গোলা বারুদ ও মাইন নিষ্ক্রিয় করা অত্যন্ত জরুরি।
বাড়ার পাশাপাশি আশেপাশের এলাকা যেমন উম সিয়ালা এবং গাবরাত আল-শেখ থেকেও শত শত লাশ উদ্ধারের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও মানবতাবাদী সংস্থাগুলো। উম সিয়ালার এক স্বেচ্ছাসেবক জানান, শুধু তাদের এলাকাতেই এখনো অন্তত ২০০ লাশ পড়ে রয়েছে।
এই এলাকাগুলো দখল করা সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্য দিয়েই গেছে ‘এক্সপোর্ট রোড’, যা দিয়ে কোর্দোফানের সোনা, বাবলা আঠা, সিলিকা ও কৃষি পণ্য রাজধানীর দিকে পরিবহন করা হয়। সেনাবাহিনী বর্তমানে এই রাস্তাটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ শহর ‘এল-ওবেইদ’-এ খাদ্য ও প্রয়োজনীয় রসদ পৌঁছাতে শুরু করেছে। ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা কমেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাড়া পুনর্দখলের পর থেকে এল-ওবেইদ ও ওমদুরমানে আরএসএফের ড্রোন হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তবে আরএসএফ এখনো আশা ছাড়েনি। তারা ইতোমধ্যে গাবরাত আল-শেখ, ওমদুরমান এমনকি উত্তরাঞ্চলেও পালটা ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, বাড়া থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরের সোদারী ও আল-মাজরুব এলাকায় এখনো আরএসএফ সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে। সেনাবাহিনী যদি দ্রুত সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে বাকি এলাকাগুলো মুক্ত না করে, তবে এই সাময়িক জয় ফের হাতছাড়া হতে পারে।




















