ঢাকা ০২:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
তিন মাসেও উদ্ধার হয়নি অপহৃত শিশু

তদন্ত কর্মকর্তা বললেন- ‘তোমার সন্তান উদ্ধারের দায়িত্ব আমার না’

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১১:১৯:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২৬ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রামে অপহৃত চার বছরের ফুটফুটে শিশুসন্তানকে উদ্ধারে পাগলপারা হয়ে উঠেছেন এক মা। অপহরণের পর শিশুটিকে উদ্ধারে মামলা করা হলেও তাকে উদ্ধারের পরিবর্তে উল্টো সেই মাকেই হয়রানি করছেন মামলার আইও (তদন্ত কর্মকর্তা)!

আদালত সুস্পষ্ট নির্দেশ দিলেও মামলার আইও বলছেন- ‘তোমার সন্তান উদ্ধারের দায়িত্ব আমার না।’

চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মুহাম্মদ ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এনেছেন ভুক্তভোগী ওই মা।

মামলার অভিযোগ সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সুরাইয়া আক্তারকে বিয়ে করেন নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার অক্সিজেন পাঠানপাড়া এলাকার বাসিন্দা আবু সালেহ জুবাইর। একই বছরের ২৩ নভেম্বর এই দম্পতির ঘরে ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। তার নাম মো. আবু হুরাইরা জুরাইজ। তবে যৌতুকের জেরে দাম্পত্য কলহ চরম পর্যায়ে পৌঁছলে ২০২২ সালের ২৭ জুন এই দম্পতির মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।

পরবর্তীতে শিশু জুরাইজকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান সুরাইয়া আক্তার। চলতি বছর জুরাইজকে তার নানার বাড়ি সীতাকুণ্ড উপজেলার মুঈনুল ইসলাম নুরানি মাদ্রাসায় প্লে শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। এজন্য তার জন্ম নিবন্ধনের প্রয়োজন হয়। বিষয়টি আবু সালেহ জুরাইজকে জানানো হলে তিনি জন্ম নিবন্ধন তৈরি করে দিবেন বলে আশ্বস্ত করেন। পরে জুরাইজের চাচা মো. ইদ্রিস জন্ম নিবন্ধন কপিটি নেওয়ার জন্য নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন কামাল বাজার এলাকায় তার বাসায় ডাকেন সুরাইয়া আক্তারকে।

গত ৮ জুন শিশু জুরাইজকে নিয়ে জন্ম নিবন্ধন কপিটি সংগ্রহ করতে যান সুরাইয়া। ওই দিনই বাসার সামনে পৌঁছার পর শিশু জুরাইজকে জোরপূর্বক তার কোল থেকে কেড়ে নেয় মো. ইদ্রিস। এরপর শিশুটির মা সুরাইয়াকে ব্যাপক মারধর করে বাড়ির বাইরে অচেতন অবস্থায় রাস্তায় ফেলে দেন। পরবর্তীতে স্থানীয়রা ওই নারীকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করেন।

সূত্র আরও জানায়, ঘটনার পর সুরাইয়া আক্তারের মেসেঞ্জারে মুন্না হাসান নামে এক ব্যক্তি জানায়, শিশুটিকে উদ্ধারের ব্যাপারে পুলিশের কাছে অভিযোগ বা মামলা করলে তাকে প্রাণে মেরে ফেলা হবে। ওই ভয়ে থানায় মামলা পর্যন্ত করেনি সুরাইয়া। উপায় না পেয়ে গত ২৩ আগস্ট এ ঘটনায় চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫-এর পিটিশন মামলা নং-৫৯/২০২৬-এর আদেশের ভিত্তিতে চান্দগাঁও থানায় মামলা করা হয়। এরপর ২৬ আগস্ট চান্দগাঁও থানাধীন কামাল বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. ইদ্রিসের স্ত্রী উর্মি আক্তারকে (জুবাইরের চাচি) গ্রেফতার করে পুলিশ।

জানতে চাইলে সুরাইয়া আক্তারের বড় বোন সুফিয়া আক্তার কলি বলেন, আমার ভাগিনাকে অপহরণের পর আমার ছোট বোন নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। আমরা তাকে কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছি না। বর্তমানে সে মানসিক রোগীর মতো আচরণ করছে। দিনে কয়েকবার খিঁচুনি দিয়ে অচেতন হয়ে যাচ্ছে। শনিবার সন্ধ্যায় তাকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। তিনি বিষয়টিকে পারিবারিক সমস্যা বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন।

সুরাইয়া অভিযোগ করেছেন, মামলার আইও শুরু থেকে আসামিদের সঙ্গে মিলে আমার সাথে চরম দুর্ব্যবহার এমনকি আপত্তিকর কথাবার্তা বলেন- আদালত নির্দেশ দিয়েছেন কী হয়েছে, তোর সন্তান উদ্ধারের দায়িত্ব আমার না। তোর বাপ নাই, ভাই নাই মামলা কে চালাবে। উকিলকে কেন ভাতার ধরেছিস? সুরাইয়া হিজাব ও নেকাব পড়লে থানায় তাকে এমনও বলা হয়- ‘হিজাব খোল। তোর আবার কিসের পর্দা।’

সুরাইয়া আরও বলেন, জন্মের ৫ মাসের মাথায় স্বামী আমাকে ডিভোর্স দিয়েছে। সেই বয়স থেকেই যে সন্তানটি আমার কাছে বড় হয়েছে, সেই সন্তানকে অপহরণ করে গায়েব করে ফেলেছে। অথচ আমার হাতে ছাড়া কারো হাতের খাবারও খায় না। এই ছেলে কোথায় আছে, কিভাবে আছে, বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে কিছুই জানতে পারছি না। আদালতের নির্দেশকেও পুলিশ গ্রাহ্য করছে না। একজন মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ ও আকুতিকেও পুলিশ আমলে নিচ্ছে না। আমি সন্তানকে ছাড়া কিভাবে বাঁচব।

শিশুটিকে উদ্ধারের পরিবর্তে তার মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও আপত্তিকর আচরণের বিষয়ে চান্দগাঁও থানার এসআই মুহাম্মদ ফারুক হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বাদীর সঙ্গে আমি কোনো খারাপ আচরণ করিনি। বরং ভিকটিমকে উদ্ধারের জন্য মামলার ২ নাম্বার আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করেছি। মামলার ১ নাম্বার আসামি চট্টগ্রামের বাইরে থাকায় তাকে গ্রেফতার করা যায়নি। ভিকটিমকে উদ্ধারে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

তিন মাসেও উদ্ধার হয়নি অপহৃত শিশু

তদন্ত কর্মকর্তা বললেন- ‘তোমার সন্তান উদ্ধারের দায়িত্ব আমার না’

আপডেট সময় ১১:১৯:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামে অপহৃত চার বছরের ফুটফুটে শিশুসন্তানকে উদ্ধারে পাগলপারা হয়ে উঠেছেন এক মা। অপহরণের পর শিশুটিকে উদ্ধারে মামলা করা হলেও তাকে উদ্ধারের পরিবর্তে উল্টো সেই মাকেই হয়রানি করছেন মামলার আইও (তদন্ত কর্মকর্তা)!

আদালত সুস্পষ্ট নির্দেশ দিলেও মামলার আইও বলছেন- ‘তোমার সন্তান উদ্ধারের দায়িত্ব আমার না।’

চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মুহাম্মদ ফারুক হোসেনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এনেছেন ভুক্তভোগী ওই মা।

মামলার অভিযোগ সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সুরাইয়া আক্তারকে বিয়ে করেন নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার অক্সিজেন পাঠানপাড়া এলাকার বাসিন্দা আবু সালেহ জুবাইর। একই বছরের ২৩ নভেম্বর এই দম্পতির ঘরে ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। তার নাম মো. আবু হুরাইরা জুরাইজ। তবে যৌতুকের জেরে দাম্পত্য কলহ চরম পর্যায়ে পৌঁছলে ২০২২ সালের ২৭ জুন এই দম্পতির মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।

পরবর্তীতে শিশু জুরাইজকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান সুরাইয়া আক্তার। চলতি বছর জুরাইজকে তার নানার বাড়ি সীতাকুণ্ড উপজেলার মুঈনুল ইসলাম নুরানি মাদ্রাসায় প্লে শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। এজন্য তার জন্ম নিবন্ধনের প্রয়োজন হয়। বিষয়টি আবু সালেহ জুরাইজকে জানানো হলে তিনি জন্ম নিবন্ধন তৈরি করে দিবেন বলে আশ্বস্ত করেন। পরে জুরাইজের চাচা মো. ইদ্রিস জন্ম নিবন্ধন কপিটি নেওয়ার জন্য নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন কামাল বাজার এলাকায় তার বাসায় ডাকেন সুরাইয়া আক্তারকে।

গত ৮ জুন শিশু জুরাইজকে নিয়ে জন্ম নিবন্ধন কপিটি সংগ্রহ করতে যান সুরাইয়া। ওই দিনই বাসার সামনে পৌঁছার পর শিশু জুরাইজকে জোরপূর্বক তার কোল থেকে কেড়ে নেয় মো. ইদ্রিস। এরপর শিশুটির মা সুরাইয়াকে ব্যাপক মারধর করে বাড়ির বাইরে অচেতন অবস্থায় রাস্তায় ফেলে দেন। পরবর্তীতে স্থানীয়রা ওই নারীকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করেন।

সূত্র আরও জানায়, ঘটনার পর সুরাইয়া আক্তারের মেসেঞ্জারে মুন্না হাসান নামে এক ব্যক্তি জানায়, শিশুটিকে উদ্ধারের ব্যাপারে পুলিশের কাছে অভিযোগ বা মামলা করলে তাকে প্রাণে মেরে ফেলা হবে। ওই ভয়ে থানায় মামলা পর্যন্ত করেনি সুরাইয়া। উপায় না পেয়ে গত ২৩ আগস্ট এ ঘটনায় চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫-এর পিটিশন মামলা নং-৫৯/২০২৬-এর আদেশের ভিত্তিতে চান্দগাঁও থানায় মামলা করা হয়। এরপর ২৬ আগস্ট চান্দগাঁও থানাধীন কামাল বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. ইদ্রিসের স্ত্রী উর্মি আক্তারকে (জুবাইরের চাচি) গ্রেফতার করে পুলিশ।

জানতে চাইলে সুরাইয়া আক্তারের বড় বোন সুফিয়া আক্তার কলি বলেন, আমার ভাগিনাকে অপহরণের পর আমার ছোট বোন নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। আমরা তাকে কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছি না। বর্তমানে সে মানসিক রোগীর মতো আচরণ করছে। দিনে কয়েকবার খিঁচুনি দিয়ে অচেতন হয়ে যাচ্ছে। শনিবার সন্ধ্যায় তাকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। তিনি বিষয়টিকে পারিবারিক সমস্যা বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন।

সুরাইয়া অভিযোগ করেছেন, মামলার আইও শুরু থেকে আসামিদের সঙ্গে মিলে আমার সাথে চরম দুর্ব্যবহার এমনকি আপত্তিকর কথাবার্তা বলেন- আদালত নির্দেশ দিয়েছেন কী হয়েছে, তোর সন্তান উদ্ধারের দায়িত্ব আমার না। তোর বাপ নাই, ভাই নাই মামলা কে চালাবে। উকিলকে কেন ভাতার ধরেছিস? সুরাইয়া হিজাব ও নেকাব পড়লে থানায় তাকে এমনও বলা হয়- ‘হিজাব খোল। তোর আবার কিসের পর্দা।’

সুরাইয়া আরও বলেন, জন্মের ৫ মাসের মাথায় স্বামী আমাকে ডিভোর্স দিয়েছে। সেই বয়স থেকেই যে সন্তানটি আমার কাছে বড় হয়েছে, সেই সন্তানকে অপহরণ করে গায়েব করে ফেলেছে। অথচ আমার হাতে ছাড়া কারো হাতের খাবারও খায় না। এই ছেলে কোথায় আছে, কিভাবে আছে, বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে কিছুই জানতে পারছি না। আদালতের নির্দেশকেও পুলিশ গ্রাহ্য করছে না। একজন মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ ও আকুতিকেও পুলিশ আমলে নিচ্ছে না। আমি সন্তানকে ছাড়া কিভাবে বাঁচব।

শিশুটিকে উদ্ধারের পরিবর্তে তার মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও আপত্তিকর আচরণের বিষয়ে চান্দগাঁও থানার এসআই মুহাম্মদ ফারুক হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বাদীর সঙ্গে আমি কোনো খারাপ আচরণ করিনি। বরং ভিকটিমকে উদ্ধারের জন্য মামলার ২ নাম্বার আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করেছি। মামলার ১ নাম্বার আসামি চট্টগ্রামের বাইরে থাকায় তাকে গ্রেফতার করা যায়নি। ভিকটিমকে উদ্ধারে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।