ভারতে ‘৬০০ বছরের প্রাচীন’ মসজিদ রক্ষায় মুসলিমদের জীবনবাজি: হতাশ করল হাইকোর্ট
- আপডেট সময় ০৭:১৭:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১১ বার পড়া হয়েছে
ভারতের মধ্যপ্রদেশের ঐতিহাসিক শহর উজ্জয়িনীতে ২০২৮ সালের ‘সিংহস্থ কুম্ভ মেলা’কে কেন্দ্র করে রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদ আংশিক ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তে তীব্র উত্তেজনা ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের তীব্র প্রতিরোধ ও আইনি লড়াই, অন্যদিকে প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান এবং উচ্চ আদালতের হতাশার রায়ে এলাকাটিতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
রাস্তা ১৫ মিটার চওড়া করার উদ্দেশ্যে পৌর কর্পোরেশন শাহী মসজিদের অংশবিশেষ ভাঙার পরিকল্পনা গ্রহণ করলে রবিবারের রাত থেকেই হাজারো মুসলিম নারী-পুরুষ মসজিদ প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এই প্রতিবাদকে ‘গান্ধীবাদী আন্দোলন’ বলে আখ্যা দিয়ে ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদের তীব্র বিরোধিতা করেছেন।
সোমবার সকালে আন্দোলনকারীদের সরাতে গেলে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারী নারীদের নিরাপদ দূরত্বে সরাতে গিয়ে পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের টাউন ইন্সপেক্টর পুষ্পা পাঞ্চাল আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও একাধিক কাঁদানে গ্যাসের শেল (টিয়ার গ্যাস) নিক্ষেপ করে। পরে র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) সহ আড়াই হাজারের বেশি পুলিশ মোতায়েন করে পুরো শহরে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়।
যেদিন মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে মসজিদ কর্তৃপক্ষের দায়ের করা আপিলের ওপর শুনানি হওয়ার কথা ছিল, ঠিক সেদিনই এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, উজ্জয়িনীর কাঁঠাল ক্রসিং থেকে গোপাল মন্দির পর্যন্ত রাস্তাটি ১৫ মিটারে উন্নীত করা হচ্ছে, যা প্রায় ৯০০ মিটার দীর্ঘ। এই রাস্তার সীমানার মধ্যে পড়া বিভিন্ন স্থাপনা সরিয়ে ফেলা বা পরিবর্তন করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে মসজিদের একটি অংশ ভাঙার উদ্যোগ নেওয়ায় এলাকায় তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
হাইকোর্টের রায়ে হতাশ মুসলিম সম্প্রদায়
মসজিদ কর্তৃপক্ষের দাবি, এই শাহী মসজিদটি ১৩৯০ সালে নির্মিত প্রায় ৬৩৬ বছরের প্রাচীন একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তারা মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে আপিল দায়ের করেছিলেন। কিন্তু আদালতের আদেশ আসার আগেই সেটি ভাঙার প্রক্রিয়া শুরু করে প্রশাসন।
তবে সোমবার মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দেন। আদালত জানান, পৌর কর্পোরেশন আইনি প্রক্রিয়া মেনেই কাজ করছে এবং একই প্রকল্পের অধীনে রাস্তার উভয় পাশে ১০টি মন্দির ও একটি মসজিদের অংশবিশেষ ইতোমধ্যে অপসারণ করা হয়েছে। পৌর কর্পোরেশন ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির আলোচনার ভিত্তিতে হাইকোর্ট উচ্ছেদের উপর কোনো স্থগিতাদেশ না দিয়ে আপিলটি নিষ্পত্তি করে দেন, যা স্থানীয় মুসলিমদের চরমভাবে হতাশ করেছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, এই প্রকল্পের ফলে মসজিদের জামাতখানা (নামাজ ঘর), একটি ১২০ ফুট উঁচু মিনার এবং মাঝার চক শাহীর অংশ প্রভাবিত হবে।
এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের একক বেঞ্চ অপসারণের বিরুদ্ধে করা আবেদনগুলো খারিজ করে দেন। আদালত সেসময় জানান, পৌর কর্পোরেশন প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন মেনেই কাজ করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষগুলোকে আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
উজ্জয়িনীর জেলা সংগ্রাহক (কালেক্টর) রৌশন কুমার অবশ্য দাবি করেছেন, সংঘাত সত্ত্বেও মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকেই স্বেচ্ছায় রাস্তার সীমানায় পড়া অংশগুলো সরিয়ে নিতে সহযোগিতা করছেন। তিনি কোনো প্রকার গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তবে স্থানীয় সাধারণ মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষের মতে, শতবর্ষের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক এই শাহী মসজিদটির পবিত্রতা রক্ষায় জীবন বাজি রেখে তারা প্রতিবাদে নেমেছেন। তাঁদের মূল দাবি— প্রশাসন যেন বিকল্প কোনো নকশার মাধ্যমে মসজিদটিকে রাস্তা সম্প্রসারণের সীমানামুক্ত রাখে।



















