সার ডিলার নিয়োগে সচিবালয়ে এমপি-নেতাদের দৌড়ঝাঁপ
- আপডেট সময় ১১:০৭:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১২ বার পড়া হয়েছে
সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে কৃষি মন্ত্রণালয়ে এখন তদবিরকারীদের ভিড়। মন্ত্রী ও সচিবের দপ্তরে গত কয়েক দিন ধরে সংসদ সদস্য, বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, জনপ্রতিনিধি ও তাদের অনুসারীদের দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে। সবারই লক্ষ্য নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া।
চলতি মাসের ১০ সেপ্টেম্বর ছিল নতুন সার ডিলার নিয়োগের আবেদনের শেষ দিন। এরপর থেকেই সচিবালয়ে জোর তদবির শুরু হয়েছে। বিশেষ করে গত রোববার ও সোমবার কৃষিমন্ত্রীর দপ্তরের সামনে শত শত মানুষের ভিড় দেখা যায়। তাদের অধিকাংশই ডিলারশিপ পাওয়ার আশায় মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেন। গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রী ঢাকার বাইরে থাকায় তদবিরকারীদের বড় একটি অংশ সচিবের দপ্তরের সামনে ভিড় করেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সূত্র জানায়, সারা দেশে ৪৯৩১টি নতুন সার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে মন্ত্রণালয়ে মোট ৪৬ হাজার ৯৫৫টি আবেদন জমা পড়েছে। প্রতিটি ডিলারশিপের বিপরীতে গড়ে প্রায় ১০ জন করে আবেদন করেছেন।
এদিকে, ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক তদবিরের পাশাপাশি অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার নামে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তির অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মঙ্গলবার কৃষি মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সচিবের দপ্তরের আশপাশে সকাল থেকেই লোকজনের জটলা। অনেকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের অধিকাংশের কথাতেই উঠে আসে সার ডিলার নিয়োগের বিষয়টি।
এদিন নাটোরের লালপুরের সংরক্ষিত আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সানজিদা ইয়াসমিন তুলি দলবল নিয়ে কৃষি সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দুপুরে সচিবের দপ্তর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে থাকা একজন জানান, নিজ এলাকার সার ডিলার নিয়োগের বিষয়েই তিনি কথা বলতে এসেছিলেন।
এর কিছুক্ষণ পর বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমানও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সচিবের দপ্তর থেকে বের হন। তারও আসার কারণ ছিল সার ডিলারশিপের তদবির।
মন্ত্রণালয়ের করিডোরে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় রংপুর সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাসুদ রানার। তিনি জানান, তার স্ত্রীর নামে সার ডিলারশিপের জন্য আবেদন করা হয়েছে। সেই আবেদন নিয়ে সচিবের সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন তিনি।
ভোলা সদরের ভোলা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কবীর মৃধাও ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছেন। বর্তমানে সার বিক্রয় প্রতিনিধি এই ব্যবসায়ী জানান, তার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স কবীর মৃধা। সচিবের দপ্তরের আশপাশে ঘোরাঘুরি করলেও সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, গত রোববার থেকে চলতি সপ্তাহে অর্ধশতাধিক সংসদ সদস্য মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের বড় অংশের সাক্ষাতের উদ্দেশ্য ছিল নিজ নিজ এলাকার পছন্দের ব্যক্তিকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন সংসদ সদস্য তার এলাকার একটি ইউনিয়নের ডিলার নিয়োগের জন্য তিনজনের নাম সুপারিশ করে পাঠিয়েছেন। তালিকায় প্রথমে থাকা প্রার্থীকে বাদ দিয়ে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য পরে ওই সংসদ সদস্য তদবির করছেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে, ডিলার নিয়োগের তালিকা এখনো প্রকাশ করেনি প্রশাসন। তবে সেটি চূড়ান্ত হয়েছে বলে প্রশাসন ও বিএনপি নেতাদের কথায় উঠে এসেছে। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য সার ডিলার হিসেবে কয়েকজনের নাম নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে। তবে এই তালিকা এখনো কৃষি মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। ফলে তালিকাটি চূড়ান্ত কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পীরগাছার কান্দি ইউনিয়নের সম্ভাব্য ডিলার আতাউর রহমানকে ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে ২৭ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অডিওতে অন্নদানগর ইউনিয়নের কীটনাশক ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন ও সার-কীটনাশক ব্যবসায়ী আবদুর রহিমের কথোপকথন শোনা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। তারা দুজনই ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেও তালিকায় স্থান না পাওয়ায় আক্ষেপ করেন।
কৃষি মন্ত্রণালয় গত ২৭ আগস্ট নতুন সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা প্রকাশ করে। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রথমে আবেদনপত্রগুলো জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি যাচাই-বাছাই করবে। যাচাই শেষে দুই কার্যদিবসের মধ্যে আবেদনপত্র উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠানো হবে।
উপজেলা কমিটি আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই করে বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করবে। এরপর উপজেলা কমিটির প্রস্তাবিত প্রার্থীদের তথ্য জেলা কমিটি পুনরায় যাচাই করবে। যাচাই শেষে প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন প্রার্থীর তালিকা সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানো হবে।
কেন্দ্রীয় কমিটি আবেদনপত্র ও প্রার্থীদের তথ্য পরীক্ষা করে ইউনিয়নপ্রতি একজনকে মনোনয়ন দেবে। এরপর সাত কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত ডিলার নিয়োগ অনুমোদনের কথা রয়েছে। অনুমোদনের পর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করবে।
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। ফলে মাঠপর্যায়ে আবেদন যাচাই-বাছাই ও প্রার্থী বাছাইয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এ বিষয়ে কৃষি সচিব সেলিম খান আমার দেশকে বলেন, ডিলারশিপের আবেদনগুলো উপজেলা ও জেলার মাধ্যমে এসেছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত মানদণ্ডের আলোকে বর্তমানে এসব আবেদন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আমরা বিভাগ ও জেলা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দিয়েছি। আমাদের কর্মকর্তারা আবেদনগুলো যাচাই করছেন। চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে আরো কয়েক দিন সময় লাগবে।
লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার নামে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সেলিম খান বলেন, মন্ত্রণালয়ের কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি।
সচিব আরো বলেন, নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে এবং সবচেয়ে যোগ্য আবেদনকারীকে নির্বাচিত করা হবে।




















