ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচক
বাড়িতে তল্লাশির পর ইলহান ওমরের ঘোষণা, ‘চুপ করানো যাবে না’
- আপডেট সময় ১১:৫৫:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৮ বার পড়া হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচক ও ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছেন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।গতকাল সোমবার সকালে ওয়াশিংটন ডিসি এলাকার বাড়িতে এ তল্লাশি চালানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, চলমান একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে আদালতের অনুমোদন নিয়ে তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়েছে।
তল্লাশির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইলহান ওমর অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করতে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছে।
তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে ট্রাম্প তাকে ভিত্তিহীন অভিযোগ ও অপপ্রচারের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু করেছেন। তবে তাকে চুপ করানো যাবে না।
বিচার বিভাগের এক মুখপাত্র বলেন, ‘আজ ওয়াশিংটন ডিসি এলাকায় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস আদালতের অনুমোদিত তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করেছে। এই অভিযান চলমান একটি কেন্দ্রীয় ফৌজদারি তদন্তের অংশ।’
তল্লাশি পরোয়ানার সুনির্দিষ্ট বিষয় কী, তা স্পষ্ট নয়। ইলহান ওমরের দপ্তর এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। হোয়াইট হাউস ও স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ মন্তব্যের জন্য বিচার বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে।
তবে ফক্স নিউজ তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচয় দেওয়া দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইলহান ওমরের অভিবাসনসংক্রান্ত নথিপত্র নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে এই তল্লাশি চালানো হয়েছে। ওমর শিশু থাকাকালে তার প্রয়াত বাবা এসব নথি পূরণ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ফক্স নিউজের প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসের জ্যাকেট পরা কয়েকজনকে দেখা গেছে।
সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ভিডিওটি ইলহান ওমরের ওয়াশিংটন ডিসির বাড়ির।
সোমবার তল্লাশির বিষয়ে সাংবাদিকেরা ট্রাম্পের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তদন্তের বিষয়টি বিচার বিভাগের এখতিয়ার।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি, তাকে খুব সতর্কভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি সব সময় তাকে পুরোপুরি অসৎ বলে মনে করেছি। তবে এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’
ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে ইলহান ওমর এবং তার পরিবারের অভিবাসনের ইতিহাস নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ করে আসছেন। এমনকি তার মার্কিন নাগরিকত্ব বাতিল করে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার কথাও প্রকাশ্যে বলেছেন তারা। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
ইলহান ওমর বরাবরই অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প বারবার তাকে আক্রমণ করে বিষয়গুলোকে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় এনেছেন। ২০১৯ সালে ইলহান ওমর ও কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দুই মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্য হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে রাজনৈতিক সমালোচকদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপের অভিযোগের মধ্যে এই তল্লাশি নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে, গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে একজন নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্যের বাড়িতে এ অভিযান চালানোয় সরকারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ আরো জোরালো হতে পারে।
ইলহান ওমরকে তদন্তের ইঙ্গিত ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনেক দিন ধরেই দিয়ে আসছিলেন। গত শনিবার এক নির্বাচনী সমাবেশে ওমরের নাম ধরে আক্রমণ করার পর ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘দেখা যাক কী হয়।’
তিনি আরো বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ও তার প্রশাসনের লোকজন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন।
গত কয়েক মাস ধরেই ইলহান ওমরের বিরুদ্ধে তদন্তের কথা বলে আসছেন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা। গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, ইলহান ওমর তার ভাইকে বিয়ে করেছেন। এ অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
বহু বছর ধরে প্রচারিত এই অভিযোগের দাবি হলো, ইলহান ওমর তার সাবেক স্বামীকে অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্র পেতে সহায়তা করার জন্য বিয়ে করেছিলেন এবং ওই ব্যক্তি আসলে তার ভাই। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এর কয়েক দিন পর ট্রাম্প প্রশাসনের সীমান্তবিষয়ক প্রধান টম হোমান বলেন, তারা ইলহান ওমরের নথিপত্র সংগ্রহ করছেন। তিনি জানান, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসের একজন জালিয়াতি তদন্তকারী বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। এই সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই)-এর একটি বিভাগ, যা ঐতিহাসিকভাবে তদন্তের দায়িত্ব পালন করে আসছে।
গত মার্চে ডানপন্থি গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বেনি জনসনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা আসলে মনে করি, ইলহান ওমর নিশ্চিতভাবেই অভিবাসন জালিয়াতি করেছেন।’
এ বিষয়ে ট্রাম্পের শীর্ষ সহযোগী স্টিফেন মিলারের সঙ্গে প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে সম্প্রতি কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
গত মাসে জনসনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তামন্ত্রী মার্কওয়েন মুলিনও বলেন, ইলহান ওমরকে নিয়ে তদন্ত চলছে এবং এ বিষয়ে ‘কিছু একটা ঘটবে’।
মুলিনের অভিযোগ, ‘আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্রে আনার উদ্দেশ্যে তিনি তার ভাইকে বিয়ে করেছিলেন। আমরা জানি, ওই ব্যক্তি এখন লন্ডনে থাকেন। আমরা মনে করি, পরিবারের অভিবাসনের পুরো বিষয়টির সঙ্গে আরো কিছু জড়িত থাকতে পারে। শুরুতে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে আসার ক্ষেত্রেও বেআইনি কর্মকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। তবে আমরা সবাই বিষয়টি তদন্ত করছি।’
এর কিছুদিন পর হোমান বলেন, চলমান ফৌজদারি তদন্ত নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে পারবেন না।
তিনি বলেন, ‘হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনসকে তাদের তদন্ত চালিয়ে যেতে দেওয়া হবে।’
সোমবার তল্লাশির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ইলহান ওমর লেখেন, ‘আমি ঠিক আছি। ভুলে গেলে চলবে না, রাজনৈতিক শত্রুদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা এটি।’
তিনি আরো বলেন, ট্রাম্প বছরের পর বছর ধরে ভিত্তিহীন মিথ্যা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে তাকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন।
তার ভাষায়, ‘রাজনৈতিকভাবে ভয় দেখানোর প্রচারণায় এটি সর্বশেষ পদক্ষেপ। আমাকে চুপ করানো যাবে না।’
ইলহান ওমর দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্প ও অন্যদের ছড়ানো নানা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। এর মধ্যে তার সাবেক স্বামী আহমেদ নুর সাইদ এলমি আসলে তার ভাই—এমন অভিযোগও রয়েছে।
দাবি করা হয়, অভিবাসনসংক্রান্ত সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের বিয়ে হয়েছিল। অভিবাসন জালিয়াতি যুক্তরাষ্ট্রে গুরুতর অপরাধ; এ অপরাধের জন্য পাঁচ বছরের তামাদি মেয়াদ রয়েছে। ধর্মীয় রীতিতে বিচ্ছেদের কয়েক বছর পর ২০১৭ সালে ইলহান ওমর ও এলমির আনুষ্ঠানিক বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
গত মাসে নিউইয়র্ক পোস্ট এক অজ্ঞাতনামা ‘শীর্ষ অভিবাসন কর্মকর্তার’ বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, অভিবাসনের আবেদনে ওমর বা তার বাবা মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন—এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে ট্রাম্প প্রশাসন তার নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে ইলহান ওমরের বয়স নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। এতে বলা হয়, নাগরিকত্ব পাওয়ার সময় নথিতে উল্লেখিত ১৭ বছরের চেয়ে তার বয়স বেশি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ তিনি তার বাবা-মায়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন। ইলহান ওমরের বাবা নিজেকে শিক্ষাবিদ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে তার মৃত্যুসংবাদে সামরিক বাহিনীতে কাজ করার কথা বলা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে পরিচিত সোমালি-আমেরিকানদের একজন ওমর। বছরের পর বছর ধরে ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের বর্ণবাদী আক্রমণের মুখে পড়েছেন তিনি।
সোমবার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ইয়ংস্টাউনে নির্বাচনি প্রচারে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইলহান ওমর ‘পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ দেশগুলোর একটি’ থেকে এসেছেন। এরপর তিনি সোমালিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। এ সময় সমাবেশে উপস্থিত লোকজন ‘দেশ থেকে বের করে দাও’ বলে স্লোগান দেন।
গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছিলেন, মিনেসোটা ‘সোমালি অভিবাসীদের দখলে চলে যাচ্ছে’। অথচ অঙ্গরাজ্যটির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সোমালি-আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।
ট্রাম্প আরো লিখেছিলেন, ‘সোমালিরা যা করছে, তা করতে দেওয়া উচিত নয়।’ একই সঙ্গে অঙ্গরাজ্যটির সমর্থকদের ‘পাল্টা লড়াই’ করার আহ্বান জানান তিনি।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউস থেকে সোমালি-আমেরিকানদের নিয়মিত অপমানজনক বক্তব্যের মুখে পড়তে হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে তাদের ‘আবর্জনা’ বলে আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, তারা ‘নরক থেকে এসেছে, অভিযোগ করে এবং শুধু গালাগাল করে’।
তিনি আরো বলেছিলেন, ‘তারা যেখান থেকে এসেছে, সেখানে ফিরে যাক এবং নিজেদের সমস্যার সমাধান করুক।’






















