ওসমান হাদী হত্যা
আসামিদের ফেরত চেয়ে চারবার চিঠি দিলেও সাড়া দেয়নি ভারত
- আপডেট সময় ০৩:১১:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
- / ২৯ বার পড়া হয়েছে
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অগ্রনায়ক শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চারবার চিঠি দেওয়া হলেও সাড়া দেয়নি ভারত। মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ, তার সহযোগী আলমগীর হোসেন এবং সীমান্ত পার হতে সহযোগিতাকারী ফিলিপ সানালকে ফেরানোর বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি এসব চিঠি পাঠায়।
এর মধ্যে এনসিবি একবার এবং সিআইডি তিনবার ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসকে চিঠি দেয়। এছাড়াও বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সকে (এসটিএফ) মেইল করা হয়েছিল। চারবার চিঠি পাঠানো হলেও জবাব দেয়নি ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস। আলাদা করে একাধিক মেইল দিয়েও জবাব মেলেনি। মূল দুই আসামি ভারতে আটক থাকায় চার্জশিট দিতে দেরি হচ্ছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।
চিঠিতে হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা, মামলার এজাহার, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত, আসামিদের বায়োডাটা, ভারতে আটক হওয়া দুজনের বিস্তারিত পরিচয়, ঘটনার ভিডিও ফুটেজের লিংক, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদের কপিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি উল্লেখ করা হয়।
গত ১৬ মার্চ পুলিশ সদর দপ্তর থেকে চিঠি দেওয়া হয় ভারতের পুলিশের কাছে। পাশাপাশি সিআইডি এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে চতুর্থবার চিঠি পাঠায়।
সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভারতের পুলিশের সাড়া না পাওয়ায় পালিয়ে যাওয়া আসামিদের ফিরিয়ে আনা যায়নি। এতে সিআইডির মামলার চার্জশিট প্রক্রিয়া থমকে আছে। তবে মামলার আরো খুঁটিনাটি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। ভারতের পুলিশের জবাবের অপেক্ষায় আছেন জানিয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, তারা জবাব না দিলে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে কূটনীতিক চ্যানেলেও কাজ করছে সরকার। তবে সেদিক থেকেও কোনো সাড়া দেয়নি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ-ভারতের বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় তিন আসামিকে ফেরত আনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে পুলিশ।
এ বিষয়ে সিআইডির এসপি (জনসংযোগ) জসিম উদ্দিন খান আমার দেশকে বলেন, ‘দুই আসামিকে ফেরতের চেষ্টা চলছে। সিআইডি ভারতের পুলিশকে চিঠি দিয়েছে। কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, মামলার ১৭ আসামির মধ্যে ১১ জন কারাগারে আছে। এর মধ্যে ৯ জন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। পলাতক আছে ছয়জন।
জানা গেছে, হত্যা মামলায় অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১৫ জুলাই দিন ধার্য করেছেন আদালত। গত ২৮ জুন ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত এ দিন ধার্য করেন। এদিন অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে আদালতে কোনো প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল কাদির ভূঞা।
গত ১৫ জানুয়ারি মামলার বাদী ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের একই আদালতে ডিবির দেওয়া অভিযোগপত্রে অসন্তোষ জানিয়ে নারাজি দাখিল করেন। তার নারাজি আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটি পুনরায় তদন্তের আদেশ দেন আদালত।
সিআইডির তদন্ত
বাদীর নারাজির পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন। সিআইডির তদন্তে সন্দেহভাজন হিসেবে মাদারীপুরের মো. রুবেলকে ২২ জানুযারি কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে জবানবন্দিতে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের পিএস বিপ্লব এবং আদাবর থানা ছাত্রলীগের সেক্রেটারি কামরুজ্জামান রুবেল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে উল্লেখ করেন। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র সরবরাহকারী মাজেদুলকে চিটাগাং থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূইয়ার কাছে তিনি অস্ত্রটি বিক্রি করেন বলে জানান। ভারতে গ্রেপ্তার হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল, আলমগীর ও ফিলিপ সানালকে দেশে ফেরত আনার যাবতীয় কাজ সিআইডি করে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, ভারতে আটক তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে জানা যাবে খুনের আসল রহস্য। মূল দুই আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় সিআইডি ক্লু পাচ্ছে না। তারা ভারতে আটক থাকায় মামলার তদন্তে হোঁচট খাচ্ছে তদন্তের দায়িত্বে থাকা সিআইডি। ভারত তাদের ফেরত দেওয়ার বিষয়ে কোনো সাড়া না দেওয়ায় মামলার অগ্রগতি থেমে আছে। এছাড়াও গত ৩ জুন হাদির খুনের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার বক্তব্যও খতিয়ে দেখছে সিআইডি।
জানা গেছে, গত ৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁও সীমান্ত এলাকা থেকে হাদি হত্যার দুই প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ বলছে, ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর ওসমান হাদিকে হত্যা করে মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়।
গত ২৩ মার্চ তাদের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনআইএ) হেফাজতে দেয় পশ্চিমবঙ্গের বিধাননগরের আদালত।
সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, হাদি হত্যার পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ, ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলি লুকানো এবং মূল দুই আসামিকে পালাতে সহায়তার অভিযোগে এ পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তাররা হলেন— হুমায়ুন কবির, হাসি বেগম, সাহেদা পারভীন সামিয়া, ওয়াহিদ আহমেদ শিপু, মারিয়া আক্তার লিমা, মো. কবির, নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, সিবিয়ন দিও, সঞ্জয় চিসিম, মো. আমিনুল ইসলাম রাজু ও মো. আব্দুল হান্নান। তবে হত্যার নির্দেশদাতা এবং সরাসরি জড়িত দুজনসহ পাঁচজনকে এখনো তারা গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
সূত্র জানায়, দুই আসামিকে ফেরানোর প্রক্রিয়া বিলম্ব হওয়ায় হাদি হত্যার মূল গডফাদার কারা তা জানতে দেরি হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। পরে হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন।
















