গবেষণাপত্র রিট্র্যাকশন মানেই কি গবেষকের জালিয়াতি?
- আপডেট সময় ০৮:২১:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
- / ৭২ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের গবেষকদের ৩২৫টি গবেষণাপত্র বিভিন্ন জার্নাল থেকে রিট্র্যাক্ট বা প্রত্যাহার হওয়ার তথ্য প্রকাশের পর গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে কোনো গবেষণাপত্র রিট্র্যাক্ট হওয়াকে সরাসরি সংশ্লিষ্ট গবেষকের জালিয়াতি বা অসততার প্রমাণ হিসেবে দেখার প্রবণতাও তৈরি হয়েছে।
তবে গবেষণা সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো গবেষণাপত্র রিট্র্যাক্ট হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট গবেষক গবেষণায় প্রতারণা করেছেন দুটি বিষয়কে সবসময় এক করে দেখা যায় না। রিট্র্যাকশনের কারণ, সংশ্লিষ্ট লেখকের ভূমিকা এবং জার্নালের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত Retraction Watch Dataset (Crossref)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৩২৫টি গবেষণাপত্র রিট্র্যাক্টেড হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। একই তথ্যচিত্রে চীনের ৩৭ হাজার ৭৩৫টি, যুক্তরাষ্ট্রের ৭ হাজার ৪০৫টি, ভারতের ৬ হাজার ২৫০টি, রাশিয়ার ৩ হাজার ১৬০টি, সৌদি আরবের ২ হাজার ৪৯৫টি, ইরানের ২ হাজার ১৩৭টি, যুক্তরাজ্যের ২ হাজার ১১০টি, জাপানের ১ হাজার ৮৭২টি এবং পাকিস্তানের ১ হাজার ৫৮৪টি গবেষণাপত্র রিট্র্যাক্টেড হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, রিট্র্যাকশন শুধু বাংলাদেশের গবেষণা ব্যবস্থার ঘটনা নয়; এটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনা ব্যবস্থারও একটি অংশ।
কেন রিট্র্যাক্ট হয়?
গবেষণাপত্র রিট্র্যাক্ট হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে: তথ্য জাল বা তৈরি করা (Fabrication), তথ্য বিকৃতি (Falsification), Plagiarism, Duplicate বা redundant publication, Authorship dispute, গবেষণার নৈতিক অনুমোদনসংক্রান্ত সমস্যা, Compromised peer review (ফেইক ই-মেইল দিয়ে নিজের পেপার নিজে রিভিউ করা বা কোনো একটা সিন্ডিকেট নিজেরা নিজেদের পেপারগুলো রিভিউ করা যেমন-কলিগ বা সহকর্মী বা পরিচিত কেউ/ পাবলিশার নিজেরাও এক্ষেত্রে জড়িত থাকতে পারেন), ডেটা বিশ্লেষণ বা পদ্ধতিগত গুরুতর ভুল, অনিচ্ছাকৃত বৈজ্ঞানিক বা পরিসংখ্যানগত ভুল।
অর্থাৎ, সব রিট্র্যাকশনের নৈতিক গুরুত্ব বা দায়ের মাত্রা এক নয়। কোনো ক্ষেত্রে গবেষণাগত অসদাচরণ থাকতে পারে, আবার কোনো ক্ষেত্রে গবেষক সততার সঙ্গে কাজ করলেও প্রকাশের পর গুরুতর ভুল শনাক্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনা ব্যবস্থায় রিট্র্যাকশন মূলত প্রকাশিত গবেষণার রেকর্ড সংশোধনের একটি প্রক্রিয়া। ফলে ‘রিট্র্যাক্টেড’ শব্দটি দেখেই সংশ্লিষ্ট গবেষককে জালিয়াত হিসেবে চিহ্নিত করার আগে রিট্র্যাকশন নোটিশে উল্লেখ করা সুনির্দিষ্ট কারণটি জানা গুরুত্বপূর্ণ।
নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের পেপারও হয়েছে রিট্র্যাক্ট
রিট্র্যাকশন নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা জগতের উদাহরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বের সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি নোবেল পুরস্কার পাওয়া বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্রও বিভিন্ন সময়ে রিট্র্যাক্ট হয়েছে।
Retraction Watch-এর Nobel laurea-সংক্রান্ত তালিকায় দেখা যায়, ২০১৯ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী Gregg Semenza-র ১৫টি, David Baltimore ও Linda B. Buck-এর ৩টি করে, Thomas Südhof ও Jack W. Szostak-এর ২টি করে গবেষণাপত্র রিট্র্যাক্ট হয়েছে। এছাড়া Frances H. Arnold, Carolyn R. Bertozzi, Bruce A. Beutler, Ben Feringa, Tasuku Honjo, Robert J. Lefkowitz, Michael Rosbash, Harold E. Varmus, Shinya Yamanaka ও Michael W. Young-সহ আরও নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর অন্তত একটি করে গবেষণাপত্র রিট্র্যাক্টেড হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।
গবেষণা সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদাহরণ রিট্র্যাকশনকে হালকাভাবে দেখার কারণ নয়; বরং রিট্র্যাকশনের কারণ ও সংশ্লিষ্ট গবেষকের দায় আলাদাভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা বোঝায়।
কারণ, রিট্র্যাকশনের পেছনে গবেষণায় জালিয়াতি যেমন থাকতে পারে, তেমনি থাকতে পারে অনিচ্ছাকৃত বৈজ্ঞানিক ভুল, তথ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা, লেখকত্ব নিয়ে বিরোধ, প্রকাশনা-সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা গবেষণাগারের অন্য কোনো সদস্যের অনিয়ম।
নোবেলজয়ী ইয়ামানাকার ঘটনাতেও দায়ের প্রশ্ন আলাদা
রিট্র্যাকশনের ক্ষেত্রে একটি গবেষণাপত্রের সব লেখকের দায় সবসময় একই নয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা জগতের বিভিন্ন ঘটনাতেও এর উদাহরণ রয়েছে।
Nobel laureate Shinya Yamanaka-র গবেষণাগারে কাজ করা একজন গবেষকের বিরুদ্ধে data fabrication ও falsification-এর অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্ট গবেষণার সঙ্গে যুক্ত একটি পেপার রিট্র্যাক্ট করা হয়। তদন্তে অন্য লেখকদের সম্পৃক্ততা না পাওয়া গেলেও গবেষণাগারের পরিচালক হিসেবে Yamanaka গবেষণায় অসদাচরণ প্রতিরোধ করতে না পারার জন্য নৈতিক দায় গ্রহণ করেছিলেন। ঘটনাটি দেখায়, একটি গবেষণাপত্রে একাধিক লেখক থাকলেও প্রত্যেকের কাজ, ভূমিকা ও দায় একই ধরনের নাও হতে পারে।
একটি পেপারের সব লেখকের দায় কি সমান?
আধুনিক গবেষণা ক্রমেই সহযোগিতানির্ভর হয়ে উঠছে। একটি গবেষণাপত্রে ১০, ২০ বা তারও বেশি লেখক থাকতে পারেন। কেউ পরীক্ষা পরিচালনা করেন, কেউ তথ্য সংগ্রহ করেন, কেউ ডেটা বিশ্লেষণ করেন, কেউ পাণ্ডুলিপি লেখেন, আবার corresponding author জার্নালের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রকাশনার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন। তাই কোনো একটি গবেষণাপত্র রিট্র্যাক্ট হলে সংশ্লিষ্ট সব লেখকের দায় সমান ধরে নেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গবেষণা সংশ্লিষ্টদের মতে, রিট্র্যাকশনের ঘটনায় প্রথমে দেখা প্রয়োজন কী কারণে পেপারটি প্রত্যাহার হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট লেখকের ভূমিকা কী ছিল।
রিট্র্যাকশন বাতিলও হতে পারে
রিট্র্যাকশনের সিদ্ধান্ত সবসময় অপরিবর্তনীয় এমন উদাহরণও নেই। সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় পদার্থবিজ্ঞানে ১৯১৮ সালের নোবেলজয়ী Max Planck-এর দুটি গবেষণাপত্র ২০১১ সালে copyright violation-এর কারণে রিট্র্যাক্ট করা হয়েছিল। পরে Springer Nature-এর তদন্তে ওই রিট্র্যাকশনই মানবিক ভুলের ফল বলে চিহ্নিত হয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশক দুটি পেপার পুনর্বহাল করে এবং রিট্র্যাকশন প্রত্যাহার করে। এ ঘটনা দেখায়, রিট্র্যাকশনের সিদ্ধান্তও পরবর্তী সময়ে পুনর্বিবেচিত হতে পারে।
নিজের গবেষণাপত্র রিট্র্যাকশন নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা জানালেন নোবিপ্রবির শিক্ষক
সম্প্রতি জার্নাল থেকে নিজের গবেষণাপত্র রিট্র্যাক্ট হওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন নোবিপ্রবির অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান।
তিনি বলেন, “জার্নাল থেকে রিসার্চ পেপার রিট্র্যাক্ট করার ঘটনায় আমাদের শিক্ষার্থী এবং কলিগদের কাছে যাতে কোনো ভুল মেসেজ না যায়, সেজন্য আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি।”
নিজেদের পেপারটি যে জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল, সেই PLOS ONE-এর peer-review প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, লেখকদের reviewer নির্বাচন, সুপারিশ বা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ ছিল না।

মিজানুর রহমানের ভাষ্য, “রিভিউয়ার কে হবেন, কীভাবে রিভিউ সম্পন্ন হবে এবং পুরো পিয়ার রিভিউ পরিচালনা এর সবটাই জার্নাল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকে।”
রিট্র্যাকশনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, জার্নাল কর্তৃপক্ষ তাঁদের কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি এবং তাঁদের ক্ষেত্রে আপিলের সুযোগও রাখা হয়নি। লেখকদের শুধু সিদ্ধান্তের সঙ্গে Agree অথবা Disagree করার আনুষ্ঠানিক সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, “জার্নালের ভেতরের কোনো প্রশাসনিক বা পর্যালোচনামূলক ব্যর্থতার দায় গবেষকদের দেওয়া অযৌক্তিক ও অন্যায়।”
এ কারণে জার্নালের রিট্র্যাকশন সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে Disagree করেছেন বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, জার্নালের মূল রিট্র্যাকশন নোটিশেও তাঁদের দ্বিমতের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

‘রিট্র্যাকশন শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়’
রিট্র্যাকশন নিয়ে চলমান আলোচনা প্রসঙ্গে নোবিপ্রবির ইইই বিভাগের শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, “বিশ্বের অনেক দেশেই গবেষণাপত্র রিট্র্যাক্ট হয়েছে। অর্থাৎ, রিট্র্যাকশন একটি বৈশ্বিক বিষয়।”
বাংলাদেশের গবেষণা বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সীমিত গবেষণা অনুদান, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও যন্ত্রপাতির ঘাটতির মধ্যেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকেরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তাঁদের অনেকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশ করছেন।
তাঁর ভাষায়, “গবেষণায় অনিয়ম হলে অবশ্যই তদন্ত ও জবাবদিহি হতে হবে। কিন্তু কয়েকটি রিট্র্যাক্টেড গবেষণাপত্রের কারণে পুরো শিক্ষক সমাজ বা গবেষকদের সততা ও অবদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ন্যায়সংগত নয়।”
গবেষণার অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোরতা, তবে অযাচিত সাধারণীকরণ নয়
গবেষণায় তথ্য জালিয়াতি, plagiarism, falsification, fake peer review কিংবা paper mill-এর মতো অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে গবেষকদের publication ethics, data management এবং responsible conduct of research বিষয়ে আরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
তবে কোনো গবেষণাপত্র রিট্র্যাক্ট হওয়ার পর তার কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা যাচাই না করেই গবেষককে ‘জালিয়াত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে গবেষণার স্বাভাবিক সংশোধন প্রক্রিয়া ও গবেষণা-অসদাচরণ দুটিকে এক করে ফেলা হয়।
গবেষণা সংশ্লিষ্টদের মতে, বিজ্ঞান একটি self-correcting বা স্ব-সংশোধনশীল ব্যবস্থা। নতুন তথ্য, পুনঃবিশ্লেষণ বা প্রকাশনা-পরবর্তী তদন্তে কোনো গুরুতর সমস্যা ধরা পড়লে গবেষণার রেকর্ড সংশোধন করাই এই ব্যবস্থার অংশ। তাই কোনো গবেষণাপত্র রিট্র্যাক্ট হওয়ার খবর সামনে এলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত “কেন রিট্র্যাক্ট হয়েছে?” এরপর দেখা প্রয়োজন, রিট্র্যাকশন নোটিশে কী বলা হয়েছে, সমস্যাটি গবেষণার কোন অংশে ছিল এবং সংশ্লিষ্ট লেখকের ভূমিকা কী ছিল।
শুধু ‘রিট্র্যাক্টেড’ শব্দটি দেখে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা দেশের গবেষকদের সততা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কতটা যৌক্তিক সেই প্রশ্নটিই এখন সামনে রাখছেন গবেষণা সংশ্লিষ্টরা।


















