উদ্বোধনের আগেই বন্ধ ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি শোধনাগার
- আপডেট সময় ০৪:৪৮:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২৩ বার পড়া হয়েছে
উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগী পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের নিরাপদ খাবার পানির সংকট নিরসনে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক পানি শোধনাগারটি (সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) কোনো কাজেই আসছে না। নির্মাণের এক বছর পার হলেও পৌর কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার অভাবে প্ল্যান্টটি চালু করে পৌরবাসীকে নিরাপদ পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না । নির্মাণ ত্রুটির কারণে পাইপলাইন ফেটে যাওয়া, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা এবং দক্ষ জনবলের অভাবে প্রকল্পটি পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে আছে। ফলে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো মুখ থুবড়ে পড়ছে; নিরাপদ পানির তীব্র সংকটে দিন কাটাচ্ছেন পৌরবাসী।
এ নিয়ে বেতাগী পৌরসভা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। পৌরসভার দাবি, কাজের গুণগত মান অত্যন্ত নিম্নমানের। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তরের দাবি, নির্ধারিত নকশা ও গুণগত মান বজায় রেখেই প্রকল্পের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মূল প্রশাসনিক ভবন, ফিল্টারিং ইউনিট, কেমিক্যাল হাউস ও পানি সংরক্ষণাগারসহ যাবতীয় অবকাঠামো দৃশ্যমান হলেও প্রাঙ্গণজুড়ে বিরাজ করছে ভৌতিক নীরবতা। প্ল্যান্টের মূল আকর্ষণ প্রিসাইডিমেন্টেশন ট্যাংক ও ওয়াটার রিজার্ভারের পানিতে জমেছে ঘন সবুজ শেওলা, আবর্জনা ও কচুরিপানা। দীর্ঘদিন ধরে আবদ্ধ থাকা সেই পানি থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। রাসায়নিক মিশ্রণ ও পরিশোধনের জন্য স্থাপিত চেম্বারগুলোতে ধুলাবালু ও মাকড়সার জালের আস্তরণ পড়েছে। অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থাকা কোটি কোটি টাকা মূল্যের ওয়াটার পাম্প, ব্যাকওয়াশ ইউনিট, ফিল্টার বেড এবং প্রধান সঞ্চালন পাইপলাইনের জয়েন্টগুলোতে ইতোমধ্যে মরিচা ধরে ক্ষয় শুরু হয়েছে।
এছাড়া নদী থেকে পানি তোলার জন্য স্থাপিত ইনটেক পয়েন্টটিতেও পলি জমেছে। কার্যকর তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ের এ আধুনিক শোধনাগারটি চালু হওয়ার আগেই মুখ থুবড়ে পড়ে ধ্বংসের পথে এগোচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পটির কার্যাদেশ অনুসারে ১৮ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার চুক্তি থাকলেও নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন বছর পর ২০২৫ সালের ১৫ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটি পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে হস্তান্তরের আগে পরীক্ষামূলক পানি সরবরাহ শুরু করতেই বাধে বিপত্তি; বিভিন্ন স্থানে প্রধান সঞ্চালন লাইন ফেটে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামত করে দিলেও শঙ্কা কাটেনি।
এদিকে, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল পৌর এলাকার সর্বত্র পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিশোধিত ও নিরাপদ খাবার পানি সরবরাহ সম্প্রসারণ করা এবং পানির অপচয় রোধ ও গুণগত মান পর্যবেক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা চালু করা।
উপকূলবর্তী এলাকা হওয়ায় বেতাগীর ভূগর্ভস্থ পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আয়রনের সমস্যা দীর্ঘদিনের। পৌর এলাকায় সরকারিভাবে অগভীর ও গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধ থাকায় নদী বা জলাশয়ের পানি শোধন করে ঘরে ঘরে নিরাপদ সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা এখন ভেস্তে যেতে বসেছে। কারিগরি ত্রুটির পাশাপাশি প্রকল্পটির বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
প্ল্যান্টের কেয়ারটেকার মো. খোকন তালুকদার বলেন, কাজ শেষে কয়েকবার পরীক্ষামূলক চালু করা হয়েছিল। এখন বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ না থাকায় পুরো প্ল্যান্ট অচল। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মূল্যবান যন্ত্রাংশগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. মোতালেব সিকদার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানালেন, শোধনাগারের কাজ শেষ হলেও আমরা এক ফোঁটা পানিও পেলাম না। পরীক্ষামূলক সরবরাহের দিনই পাইপ ফেটে রাস্তা ভেসে গিয়েছিল, এরপর আর কোনো খবর নেই।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী সজল চন্দ্র সিকদার বলেন, নির্ধারিত নকশা ও গুণগত মান বজায় রেখেই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করে ২০২৫ সালের ১৫ জুন পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ও দক্ষ জনবল না থাকায় পৌরসভা এটি পরিচালনা করতে পারছে না।
বেতাগী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, প্রকল্পের কাজের মান নিম্নমানের এবং শিডিউলেই বড় গলদ ছিল। বিপুল অর্থ ব্যয়ে ব্যাপক সংস্কার ছাড়া বর্তমান অবস্থায় এ প্ল্যান্ট চালানো কিংবা পৌরবাসীকে নিরাপদ পানি সরবরাহ করা পৌরসভার পক্ষে সম্ভব নয়।
বেতাগী পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহ. সাদ্দাম হোসেন বলেন, ইতোমধ্যে পৌর পরিষদ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পাইপলাইনের ত্রুটি চিহ্নিত করে বিদ্যুৎ সংযোগ দ্রুত পুনঃস্থাপনের করে পানি শোধনাগারটি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।



















