ঢাকা ০৫:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লেবাননে ইসরাইলি হামলায় একই পরিবারের তিন প্রজন্ম নিহত

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৪:৪২:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২০ বার পড়া হয়েছে

দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকায় ইসরাইলি বিমান হামলায় একই পরিবারের তিন প্রজন্মের সদস্য নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে শিশু ও নারীসহ পরিবারের সদস্যদের লাশ বের করে আনা হয়। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল মাত্র দুই মাস বয়সী একটি শিশু।

স্থানীয় সময় সোমবার রাতে নাবাতিয়েহর কাছাকাছি এলাকায় ওই বিমান হামলা চালানো হয়। হামলায় একটি আবাসিক ভবন ধসে পড়ে। বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মীরা রাতভর এবং পরদিন সকাল পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে লাশ উদ্ধারের চেষ্টা করেন। শেষ দুইজনের লাশ, যাদের একজন শিশু, হামলার প্রায় দুই ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয়।

আলজাজিরার প্রতিবেদক জেইনা খোদর ঘটনাস্থল থেকে জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে সহিংসতা তুলনামূলক কম থাকায় ওই পরিবারের সদস্যরা নিজেদের নিরাপদ মনে করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি হামলা আবার বেড়ে যাওয়ায় সেই নিরাপত্তাবোধ ভেঙে পড়েছে।

দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুত। সীমান্তবর্তী একটি গ্রামের বাসিন্দা মুস্তাফা জানান, তিনি প্রায় তিন বছর আগে নিজের গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। তার ভাষায়, সীমান্তের গ্রামটি ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকেই সংঘাতের সম্মুখসারিতে রয়েছে এবং বর্তমানে সেটি ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এখন কী হবে, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চিত।

দক্ষিণ লেবাননে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কৌশলগত আলি আল-তাহের রিজ। উচ্চভূমিটি নাবাতিয়েহ ও আশপাশের বিস্তৃত এলাকা পর্যবেক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইসরাইলি বাহিনী কয়েক সপ্তাহের সংঘর্ষের পর ওই এলাকায় ‘অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে। ইসরাইলের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে হিজবুল্লাহর ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো ও সামরিক সক্ষমতা রয়েছে।

ইসরাইলি বাহিনী দাবি করছে, দক্ষিণ লেবাননে তাদের সাম্প্রতিক অভিযান হিজবুল্লাহর সশস্ত্র তৎপরতার জবাব। ইসরাইলের অভিযোগ, হিজবুল্লাহ তাদের সেনাদের লক্ষ্য করে সশস্ত্র ড্রোন ব্যবহার করেছে। তবে হিজবুল্লাহ সাম্প্রতিক ওই অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে লেবাননের কর্মকর্তারা ইসরাইলি হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, এ ধরনের অভিযান যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক উদ্যোগকে আরো দুর্বল করে দিচ্ছে।

এর আগেও নাবাতিয়েহ এলাকায় ইসরাইলি হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। ৭ সেপ্টেম্বর নিকটবর্তী কাফর রুম্মান এলাকায় ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে দুই শিশু ও চার নারী ছিলেন বলে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে এপি জানিয়েছে। ইসরাইল দাবি করেছে, হামলাগুলো হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় চালানো হয়েছে।

আগস্টেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত ও ১৯ জন আহত হন। নাবাতিয়েহ জেলার আনসার ও দেইর আল-জাহরানি এলাকায় ওই হামলায় তিন শিশুও নিহত হয়েছিল। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সে সময় পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলে সতর্ক করেছিলেন।

আনুষ্ঠানিকভাবে দক্ষিণ লেবাননে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় জুনে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে যে কাঠামোগত সমঝোতা হয়েছিল, তার লক্ষ্য ছিল হিজবুল্লাহর সামরিক উপস্থিতি সীমিত করা এবং ধাপে ধাপে ইসরাইলি বাহিনীকে দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া। কিন্তু বাস্তবে ওই প্রক্রিয়া থমকে আছে। ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি কৌশলগত এলাকায় অবস্থান ধরে রেখেছে এবং হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার দাবি করছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ ও লেবাননের বিভিন্ন পক্ষ ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

ফলে যুদ্ধবিরতি থাকলেও দক্ষিণ লেবাননের সাধারণ মানুষের জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরছে না। যারা ঘরবাড়িতে ফিরে এসেছিলেন, তাদের অনেকেই নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একই পরিবারের তিন প্রজন্মের লাশ উদ্ধারের ঘটনা সেই অনিশ্চয়তাকেই আরো স্পষ্ট করে তুলেছে।

দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতি এখন শুধু ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর সংঘর্ষের প্রশ্ন নয়; এটি একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কতটা টেকসই, সে প্রশ্নও সামনে এনেছে। কূটনৈতিক আলোচনা দ্রুত পুনরায় শুরু না হলে এবং উভয় পক্ষের সামরিক কর্মকাণ্ড কমানো না গেলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলটিতে আরও বড় সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সূত্র: আলজাজিরা, রয়টার্স ও এপি নিউজ

নিউজটি শেয়ার করুন

লেবাননে ইসরাইলি হামলায় একই পরিবারের তিন প্রজন্ম নিহত

আপডেট সময় ০৪:৪২:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকায় ইসরাইলি বিমান হামলায় একই পরিবারের তিন প্রজন্মের সদস্য নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে শিশু ও নারীসহ পরিবারের সদস্যদের লাশ বের করে আনা হয়। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল মাত্র দুই মাস বয়সী একটি শিশু।

স্থানীয় সময় সোমবার রাতে নাবাতিয়েহর কাছাকাছি এলাকায় ওই বিমান হামলা চালানো হয়। হামলায় একটি আবাসিক ভবন ধসে পড়ে। বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মীরা রাতভর এবং পরদিন সকাল পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে লাশ উদ্ধারের চেষ্টা করেন। শেষ দুইজনের লাশ, যাদের একজন শিশু, হামলার প্রায় দুই ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয়।

আলজাজিরার প্রতিবেদক জেইনা খোদর ঘটনাস্থল থেকে জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে সহিংসতা তুলনামূলক কম থাকায় ওই পরিবারের সদস্যরা নিজেদের নিরাপদ মনে করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি হামলা আবার বেড়ে যাওয়ায় সেই নিরাপত্তাবোধ ভেঙে পড়েছে।

দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুত। সীমান্তবর্তী একটি গ্রামের বাসিন্দা মুস্তাফা জানান, তিনি প্রায় তিন বছর আগে নিজের গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। তার ভাষায়, সীমান্তের গ্রামটি ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকেই সংঘাতের সম্মুখসারিতে রয়েছে এবং বর্তমানে সেটি ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এখন কী হবে, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চিত।

দক্ষিণ লেবাননে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কৌশলগত আলি আল-তাহের রিজ। উচ্চভূমিটি নাবাতিয়েহ ও আশপাশের বিস্তৃত এলাকা পর্যবেক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইসরাইলি বাহিনী কয়েক সপ্তাহের সংঘর্ষের পর ওই এলাকায় ‘অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে। ইসরাইলের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে হিজবুল্লাহর ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো ও সামরিক সক্ষমতা রয়েছে।

ইসরাইলি বাহিনী দাবি করছে, দক্ষিণ লেবাননে তাদের সাম্প্রতিক অভিযান হিজবুল্লাহর সশস্ত্র তৎপরতার জবাব। ইসরাইলের অভিযোগ, হিজবুল্লাহ তাদের সেনাদের লক্ষ্য করে সশস্ত্র ড্রোন ব্যবহার করেছে। তবে হিজবুল্লাহ সাম্প্রতিক ওই অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে লেবাননের কর্মকর্তারা ইসরাইলি হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, এ ধরনের অভিযান যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক উদ্যোগকে আরো দুর্বল করে দিচ্ছে।

এর আগেও নাবাতিয়েহ এলাকায় ইসরাইলি হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। ৭ সেপ্টেম্বর নিকটবর্তী কাফর রুম্মান এলাকায় ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে দুই শিশু ও চার নারী ছিলেন বলে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে এপি জানিয়েছে। ইসরাইল দাবি করেছে, হামলাগুলো হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় চালানো হয়েছে।

আগস্টেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত ও ১৯ জন আহত হন। নাবাতিয়েহ জেলার আনসার ও দেইর আল-জাহরানি এলাকায় ওই হামলায় তিন শিশুও নিহত হয়েছিল। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সে সময় পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলে সতর্ক করেছিলেন।

আনুষ্ঠানিকভাবে দক্ষিণ লেবাননে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় জুনে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে যে কাঠামোগত সমঝোতা হয়েছিল, তার লক্ষ্য ছিল হিজবুল্লাহর সামরিক উপস্থিতি সীমিত করা এবং ধাপে ধাপে ইসরাইলি বাহিনীকে দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া। কিন্তু বাস্তবে ওই প্রক্রিয়া থমকে আছে। ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি কৌশলগত এলাকায় অবস্থান ধরে রেখেছে এবং হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার দাবি করছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ ও লেবাননের বিভিন্ন পক্ষ ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

ফলে যুদ্ধবিরতি থাকলেও দক্ষিণ লেবাননের সাধারণ মানুষের জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরছে না। যারা ঘরবাড়িতে ফিরে এসেছিলেন, তাদের অনেকেই নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একই পরিবারের তিন প্রজন্মের লাশ উদ্ধারের ঘটনা সেই অনিশ্চয়তাকেই আরো স্পষ্ট করে তুলেছে।

দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতি এখন শুধু ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর সংঘর্ষের প্রশ্ন নয়; এটি একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কতটা টেকসই, সে প্রশ্নও সামনে এনেছে। কূটনৈতিক আলোচনা দ্রুত পুনরায় শুরু না হলে এবং উভয় পক্ষের সামরিক কর্মকাণ্ড কমানো না গেলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলটিতে আরও বড় সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সূত্র: আলজাজিরা, রয়টার্স ও এপি নিউজ