ঢাকা ০২:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হিজবুল্লাহর অবিস্ফোরিত বোমার ঝুঁকিতে ইসরায়েল, শিক্ষা সফরে ১ শিক্ষার্থী নিহত, আহত ২৪

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১২:২২:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
  • / ২৩ বার পড়া হয়েছে

বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ ইসরায়েলকে অবিস্ফোরিত বোমা এবং অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র থেকে সৃষ্ট একটি সম্ভাব্য ব্যাপক এবং অনির্দিষ্ট হুমকির মুখে ফেলেছে। এই বিপদ কমাতে জনসচেতনতামূলক প্রচার ও অস্ত্র অপসারণ অভিযান চালানো হলেও সোমবার (১২ অক্টোবর) উত্তর ইসরায়েলের একটি বনে এক স্কুলের শিক্ষা সফর চলাকালে কিশোরদের খুঁজে পাওয়া ক্লাস্টার বোমার একটি অংশ বিস্ফোরিত হয়। এতে এক শিক্ষার্থী নিহত এবং আরও ২৪ জন আহত হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অনুমান, দেশটির প্রায় সব অঞ্চলেই বিভিন্ন সময়ের সংঘর্ষে পড়ে থাকা শত শত, এমনকি হাজার হাজার অবিস্ফোরিত অস্ত্র ছড়িয়ে থাকতে পারে।

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে কয়েক ডজন বিআরবি১ (এ-০৯ নামেও পরিচিত) সাবমিউনিশন বহনকারী গ্র্যাড রকেট নিক্ষেপ করে। রকেটগুলো বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্লাস্টার বোমার অংশ ছড়িয়ে দেয়। এসব বোমার অংশ অনেক সময় মাটিতে আঘাত করার পরও বিস্ফোরিত হয় না।

সোমবারের ঘটনার ছবি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, লেবানন সীমান্তের কাছে রামিম রিজ এলাকায় নাফতালি মাউন্টেনস ফরেস্টের একটি প্রাকৃতিক পথ ধরে হাঁটার সময় ওআরটি মাআলত স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দলটি ধরনের একটি বোমার মুখোমুখি হয়েছিল। পথটি ব্যবহারের অনুমতিও দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

হাঁটার সময় এক শিক্ষার্থী পথের ওপর বা কাছাকাছি পড়ে থাকা হিজবুল্লাহর একটি সাবমিউনিশন দেখতে পায় এবং সেটি তুলে নেয়। একপর্যায়ে বোমার ছোট অংশটি বিস্ফোরিত হয়। এতে নবম শ্রেণির ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী এলাজার ইয়াইর উইলেনস্কি নিহত হয় এবং আরও ২৪ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আহত হন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

হিজবুল্লাহ ছাড়াও ইরান ও তাদের ইয়েমেনভিত্তিক মিত্রগোষ্ঠী হুতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেডযুক্ত শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলে নিক্ষেপ করেছে। এসব বোমার কিছু অংশ মাটিতে পড়ার পরও বিস্ফোরিত হয়নি। ফলে সেগুলোর সামনে পড়ে যাওয়া মানুষের জন্য বিপদ থেকে যায়। তবে সোমবারের মতো প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের ঘটনা বিরল।

স্থলমাইনের মতো না হলেও এসব বোমা গোলান মালভূমি ও পশ্চিম তীরে এখনো বিপদ তৈরি করছে। অবিস্ফোরিত ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেড পড়ে থাকতে পারে- এমন এলাকা কর্তৃপক্ষের পক্ষে বেড়া দিয়েও ঘিরে রাখা সম্ভব নয়। এসব অস্ত্র বছরের পর বছর অচেনা অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে, পরে কোনো ব্যক্তি অসতর্কভাবে সেগুলোর সংস্পর্শে এলে বিপদ ঘটতে পারে। এই হুমকি কতটা বিস্তৃত, তা নির্ভরযোগ্যভাবে নিরূপণের কোনো উপায় নেই।

অবিস্ফোরিত অস্ত্র বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। কিছু অস্ত্রকে রকেট, গ্রেনেড বা শঙ্কু আকৃতির ওয়ারহেড হিসেবে চেনা গেলেও অন্যগুলো বিভিন্ন আকৃতির ছোট ধাতব পাত্রের মতো অতি সাধারণ দেখাতে পারে। অস্ত্রের ধরন অনুযায়ী বিস্ফোরণের শক্তি ব্যাপকভাবে ভিন্ন হয়। তবে ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেড থেকে বের হওয়া ছোট বোমার অংশও প্রাণঘাতী আঘাত হানতে সক্ষম।

দক্ষিণ ইসরায়েলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর পড়ে থাকা গ্রেনেডসহ বিভিন্ন অস্ত্রও কয়েক বছর পর ইসরায়েলি জনপদের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া গেছে। এ ছাড়া যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর অভিযানের কারণে সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্ত্রশস্ত্র ভুলবশত পড়ে রয়েছে। বেসামরিক মানুষকে সেসব এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেয়াও হয়। ফলে বড় ঝুঁকি রয়েছে হতাহতের।

এমন ঘটনা নতুন নয়
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবিস্ফোরিত অস্ত্রের কারণে বেসামরিক মানুষের নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনা সোমবারের বিস্ফোরণই প্রথম নয়। আগস্টে উত্তরাঞ্চলীয় শহর মেতুলার কাছে একটি কৃষিজমিতে পুরোনো বিস্ফোরক বিস্ফোরিত হলে ছয় বিদেশি শ্রমিক আহত হন। গত তিন বছরে ওই এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে।

একইভাবে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে উত্তরাঞ্চলীয় কিবুতজ ইরোনের কাছে একটি বাগানে হিজবুল্লাহর আগে নিক্ষেপ করা একটি অস্ত্র বিস্ফোরিত হলে থাইল্যান্ডের ২৭ বছর বয়সী এক শ্রমিক নিহত হন এবং আরেকজন আহত হন। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে জর্ডান উপত্যকায় একটি সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্রের কাছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) আগে নিক্ষেপ করা অবিস্ফোরিত অস্ত্রের বিস্ফোরণে এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত এবং আরও দুই শিশু আহত হয়।

ইসরায়েলে অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণের দায়িত্ব তিনটি সংস্থার মধ্যে ভাগ করা। আর সেগুলো হলো- প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল মাইন অ্যাকশন অথরিটি, সামরিক বাহিনী ও পুলিশ। ২০১১ সালের মাইনফিল্ড ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ আইন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই সংস্থার দায়িত্ব হলো মাইনফিল্ড ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র থাকা এলাকা অপসারণের পরিকল্পনা করা এবং অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করা।

পাশাপাশি নিরাপদ আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো ও ঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া, পরিকল্পনা করা ও পরিচালনা করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রমের বিষয়ে পরামর্শ দেয়াও তাদের দায়িত্ব।

সংস্থাটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নথিতে এর উদ্দেশ্য বলা হয়েছে। তা সত্ত্বেও, মঙ্গলবার আর্মি রেডিও জানায়, প্রাণঘাতী এই ঘটনার দায় নিতে অস্বীকার করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, ‘শত্রুপক্ষের গোলাবর্ষণের ফলে পড়ে থাকা অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ করা এই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়- এটি পুলিশের কাজ।’

সোমবারের প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ইসরায়েল পুলিশের কমিশনার ড্যানি লেভি। তবে অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণে পুলিশের দায়িত্বের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, শিক্ষা সফরটির জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়া হয়েছিল।

সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মধ্যে বাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষকে বাড়িতে ফিরতে দেয়ার জন্য উত্তর ইসরায়েলের প্রায় ৪০টি জনপদে বিস্তৃত অভিযান চালানো হয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল- সামরিক সরঞ্জাম সরানো, বর্জ্য পরিষ্কার করা এবং অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ করা। তবে এ বছর লেবাননের এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সর্বশেষ দফার লড়াইয়ের পর একই ধরনের কোনো অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়নি আইডিএফ।

শিক্ষা সফর ঘিরে প্রশ্ন
ইসরায়েল ট্রেইল ধরে তিন দিনের শিক্ষা সফরটির অনুমোদন দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অথচ ওই এলাকায় ইহুদি জাতীয় তহবিল কেকেএল-জেএনএফের টাঙানো একটি সাইনবোর্ডে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করে বন ও ক্যাম্পসাইটে প্রবেশে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে কেকেএল-জেএনএফের ওয়েবসাইটেও একই ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

মঙ্গলবার আর্মি রেডিওকে কেকেএল-জেএনএফের চেয়ারম্যান আইয়াল অস্ট্রিনস্কি বলেন, পথটি বন্ধ ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন সেখানে শিক্ষা সফরের অনুমোদন দিয়েছিল, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি বলেন, ইসরায়েল সোসাইটি ফর দ্য প্রোটেকশন অব নেচারের পরিচালিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অপারেশনস রুমকে আগেই জানানো হয়েছিল যে এলাকাটি বন্ধ।

এক বিবৃতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, শিক্ষা সফরের অনুমোদিত পথটি কোনো নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করেনি। এতে ইঙ্গিত দেয়া হয়, দলটি হয়তো নির্ধারিত পথ থেকে সরে গিয়েছিল। মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, সফরের অনুমোদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্পষ্ট নিরাপত্তা নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ বা অবিস্ফোরিত অস্ত্র স্পর্শ করার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং এ ধরনের কোনো বস্তু দেখামাত্র তা জানানোর নির্দেশনাও ছিল।’

বিপজ্জনক এলাকা
অস্ত্র অপসারণের দায়িত্বে থাকা তিনটি সংস্থাই এ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার চালিয়েছে। তবে এসব প্রচার শিক্ষা ব্যবস্থা বা সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা পৌঁছেছে, তা স্পষ্ট নয়। মঙ্গলবার আর্মি রেডিও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আর্থিক নথির বরাতে জানায়, গত দুই বছরে অবিস্ফোরিত অস্ত্র নিয়ে জনসচেতনতা কার্যক্রম ও প্রচারে ১০ লাখ শেকেলের বেশি (৩ লাখ ২৫ হাজার ডলার) ব্যয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৭ লাখ ৫০ হাজার শেকেল বা ২ লাখ ৪৫ হাজার ডলার এবং ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত ৪ লাখ ৫০ হাজার শেকেল বা ১ লাখ ৪৬ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছে।

তবে আইনে মাইন অপসারণ কর্তৃপক্ষের ওপর শিক্ষা ব্যবস্থায় অবিস্ফোরিত অস্ত্র নিয়ে সচেতনতা তৈরির যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সেই খাতে বাজেটের কত অংশ ব্যয় হয়েছে, নথিতে তা উল্লেখ নেই। যুদ্ধ চলাকালে এবং অবিস্ফোরিত অস্ত্রের বিস্ফোরণের বিভিন্ন ঘটনার পর ইসরায়েল পুলিশ একাধিকবার সাধারণ মানুষের জন্য নির্দেশনা জারি করেছে।

সামরিক বাহিনীর হোম ফ্রন্ট কমান্ডও এর আগে একই ধরনের নির্দেশনা দিয়েছে। সোমবারের প্রাণঘাতী ঘটনার পর আইডিএফ জানিয়েছে, অবিস্ফোরিত অস্ত্রের বিপদ সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক প্রচার আরও বিস্তৃত করবে হোম ফ্রন্ট কমান্ড।

অবিস্ফোরিত অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা অজানা। বিশেষ করে জনসাধারণের হাঁটাচলার জন্য উন্মুক্ত বনাঞ্চল কিংবা কৃষিশ্রমিকদের কাজের মাঠে এসব অস্ত্রের উপস্থিতি এবং সীমিত অপসারণ কার্যক্রমের কারণে একই ধরনের ট্র্যাজেডি ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে ইসরায়েল। এছাড়া বহুদিন পড়ে থাকার কারণে মাটির নিচে চলে যাওয়ায় অনেক সময় হাঁটাচলায় চোখে পড়ে না অস্ত্রগুলো। ফলে বড় ধরনের প্রাণঘাতী ঝুঁকির মধ্যে দিয়েই দিন পার করছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ইসরায়েলিরা।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

হিজবুল্লাহর অবিস্ফোরিত বোমার ঝুঁকিতে ইসরায়েল, শিক্ষা সফরে ১ শিক্ষার্থী নিহত, আহত ২৪

আপডেট সময় ১২:২২:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ ইসরায়েলকে অবিস্ফোরিত বোমা এবং অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র থেকে সৃষ্ট একটি সম্ভাব্য ব্যাপক এবং অনির্দিষ্ট হুমকির মুখে ফেলেছে। এই বিপদ কমাতে জনসচেতনতামূলক প্রচার ও অস্ত্র অপসারণ অভিযান চালানো হলেও সোমবার (১২ অক্টোবর) উত্তর ইসরায়েলের একটি বনে এক স্কুলের শিক্ষা সফর চলাকালে কিশোরদের খুঁজে পাওয়া ক্লাস্টার বোমার একটি অংশ বিস্ফোরিত হয়। এতে এক শিক্ষার্থী নিহত এবং আরও ২৪ জন আহত হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অনুমান, দেশটির প্রায় সব অঞ্চলেই বিভিন্ন সময়ের সংঘর্ষে পড়ে থাকা শত শত, এমনকি হাজার হাজার অবিস্ফোরিত অস্ত্র ছড়িয়ে থাকতে পারে।

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে কয়েক ডজন বিআরবি১ (এ-০৯ নামেও পরিচিত) সাবমিউনিশন বহনকারী গ্র্যাড রকেট নিক্ষেপ করে। রকেটগুলো বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্লাস্টার বোমার অংশ ছড়িয়ে দেয়। এসব বোমার অংশ অনেক সময় মাটিতে আঘাত করার পরও বিস্ফোরিত হয় না।

সোমবারের ঘটনার ছবি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, লেবানন সীমান্তের কাছে রামিম রিজ এলাকায় নাফতালি মাউন্টেনস ফরেস্টের একটি প্রাকৃতিক পথ ধরে হাঁটার সময় ওআরটি মাআলত স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দলটি ধরনের একটি বোমার মুখোমুখি হয়েছিল। পথটি ব্যবহারের অনুমতিও দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

হাঁটার সময় এক শিক্ষার্থী পথের ওপর বা কাছাকাছি পড়ে থাকা হিজবুল্লাহর একটি সাবমিউনিশন দেখতে পায় এবং সেটি তুলে নেয়। একপর্যায়ে বোমার ছোট অংশটি বিস্ফোরিত হয়। এতে নবম শ্রেণির ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী এলাজার ইয়াইর উইলেনস্কি নিহত হয় এবং আরও ২৪ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আহত হন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

হিজবুল্লাহ ছাড়াও ইরান ও তাদের ইয়েমেনভিত্তিক মিত্রগোষ্ঠী হুতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেডযুক্ত শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলে নিক্ষেপ করেছে। এসব বোমার কিছু অংশ মাটিতে পড়ার পরও বিস্ফোরিত হয়নি। ফলে সেগুলোর সামনে পড়ে যাওয়া মানুষের জন্য বিপদ থেকে যায়। তবে সোমবারের মতো প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের ঘটনা বিরল।

স্থলমাইনের মতো না হলেও এসব বোমা গোলান মালভূমি ও পশ্চিম তীরে এখনো বিপদ তৈরি করছে। অবিস্ফোরিত ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেড পড়ে থাকতে পারে- এমন এলাকা কর্তৃপক্ষের পক্ষে বেড়া দিয়েও ঘিরে রাখা সম্ভব নয়। এসব অস্ত্র বছরের পর বছর অচেনা অবস্থায় পড়ে থাকতে পারে, পরে কোনো ব্যক্তি অসতর্কভাবে সেগুলোর সংস্পর্শে এলে বিপদ ঘটতে পারে। এই হুমকি কতটা বিস্তৃত, তা নির্ভরযোগ্যভাবে নিরূপণের কোনো উপায় নেই।

অবিস্ফোরিত অস্ত্র বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। কিছু অস্ত্রকে রকেট, গ্রেনেড বা শঙ্কু আকৃতির ওয়ারহেড হিসেবে চেনা গেলেও অন্যগুলো বিভিন্ন আকৃতির ছোট ধাতব পাত্রের মতো অতি সাধারণ দেখাতে পারে। অস্ত্রের ধরন অনুযায়ী বিস্ফোরণের শক্তি ব্যাপকভাবে ভিন্ন হয়। তবে ক্লাস্টার বোমার ওয়ারহেড থেকে বের হওয়া ছোট বোমার অংশও প্রাণঘাতী আঘাত হানতে সক্ষম।

দক্ষিণ ইসরায়েলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর পড়ে থাকা গ্রেনেডসহ বিভিন্ন অস্ত্রও কয়েক বছর পর ইসরায়েলি জনপদের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া গেছে। এ ছাড়া যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর অভিযানের কারণে সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্ত্রশস্ত্র ভুলবশত পড়ে রয়েছে। বেসামরিক মানুষকে সেসব এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেয়াও হয়। ফলে বড় ঝুঁকি রয়েছে হতাহতের।

এমন ঘটনা নতুন নয়
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবিস্ফোরিত অস্ত্রের কারণে বেসামরিক মানুষের নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনা সোমবারের বিস্ফোরণই প্রথম নয়। আগস্টে উত্তরাঞ্চলীয় শহর মেতুলার কাছে একটি কৃষিজমিতে পুরোনো বিস্ফোরক বিস্ফোরিত হলে ছয় বিদেশি শ্রমিক আহত হন। গত তিন বছরে ওই এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে।

একইভাবে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে উত্তরাঞ্চলীয় কিবুতজ ইরোনের কাছে একটি বাগানে হিজবুল্লাহর আগে নিক্ষেপ করা একটি অস্ত্র বিস্ফোরিত হলে থাইল্যান্ডের ২৭ বছর বয়সী এক শ্রমিক নিহত হন এবং আরেকজন আহত হন। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে জর্ডান উপত্যকায় একটি সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্রের কাছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) আগে নিক্ষেপ করা অবিস্ফোরিত অস্ত্রের বিস্ফোরণে এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত এবং আরও দুই শিশু আহত হয়।

ইসরায়েলে অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণের দায়িত্ব তিনটি সংস্থার মধ্যে ভাগ করা। আর সেগুলো হলো- প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল মাইন অ্যাকশন অথরিটি, সামরিক বাহিনী ও পুলিশ। ২০১১ সালের মাইনফিল্ড ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ আইন অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই সংস্থার দায়িত্ব হলো মাইনফিল্ড ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র থাকা এলাকা অপসারণের পরিকল্পনা করা এবং অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করা।

পাশাপাশি নিরাপদ আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো ও ঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া, পরিকল্পনা করা ও পরিচালনা করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রমের বিষয়ে পরামর্শ দেয়াও তাদের দায়িত্ব।

সংস্থাটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নথিতে এর উদ্দেশ্য বলা হয়েছে। তা সত্ত্বেও, মঙ্গলবার আর্মি রেডিও জানায়, প্রাণঘাতী এই ঘটনার দায় নিতে অস্বীকার করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, ‘শত্রুপক্ষের গোলাবর্ষণের ফলে পড়ে থাকা অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ করা এই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়- এটি পুলিশের কাজ।’

সোমবারের প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ইসরায়েল পুলিশের কমিশনার ড্যানি লেভি। তবে অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণে পুলিশের দায়িত্বের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, শিক্ষা সফরটির জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়া হয়েছিল।

সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মধ্যে বাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষকে বাড়িতে ফিরতে দেয়ার জন্য উত্তর ইসরায়েলের প্রায় ৪০টি জনপদে বিস্তৃত অভিযান চালানো হয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল- সামরিক সরঞ্জাম সরানো, বর্জ্য পরিষ্কার করা এবং অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ করা। তবে এ বছর লেবাননের এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সর্বশেষ দফার লড়াইয়ের পর একই ধরনের কোনো অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়নি আইডিএফ।

শিক্ষা সফর ঘিরে প্রশ্ন
ইসরায়েল ট্রেইল ধরে তিন দিনের শিক্ষা সফরটির অনুমোদন দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অথচ ওই এলাকায় ইহুদি জাতীয় তহবিল কেকেএল-জেএনএফের টাঙানো একটি সাইনবোর্ডে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করে বন ও ক্যাম্পসাইটে প্রবেশে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে কেকেএল-জেএনএফের ওয়েবসাইটেও একই ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

মঙ্গলবার আর্মি রেডিওকে কেকেএল-জেএনএফের চেয়ারম্যান আইয়াল অস্ট্রিনস্কি বলেন, পথটি বন্ধ ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন সেখানে শিক্ষা সফরের অনুমোদন দিয়েছিল, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি বলেন, ইসরায়েল সোসাইটি ফর দ্য প্রোটেকশন অব নেচারের পরিচালিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অপারেশনস রুমকে আগেই জানানো হয়েছিল যে এলাকাটি বন্ধ।

এক বিবৃতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, শিক্ষা সফরের অনুমোদিত পথটি কোনো নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করেনি। এতে ইঙ্গিত দেয়া হয়, দলটি হয়তো নির্ধারিত পথ থেকে সরে গিয়েছিল। মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, সফরের অনুমোদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্পষ্ট নিরাপত্তা নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ বা অবিস্ফোরিত অস্ত্র স্পর্শ করার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং এ ধরনের কোনো বস্তু দেখামাত্র তা জানানোর নির্দেশনাও ছিল।’

বিপজ্জনক এলাকা
অস্ত্র অপসারণের দায়িত্বে থাকা তিনটি সংস্থাই এ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার চালিয়েছে। তবে এসব প্রচার শিক্ষা ব্যবস্থা বা সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা পৌঁছেছে, তা স্পষ্ট নয়। মঙ্গলবার আর্মি রেডিও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আর্থিক নথির বরাতে জানায়, গত দুই বছরে অবিস্ফোরিত অস্ত্র নিয়ে জনসচেতনতা কার্যক্রম ও প্রচারে ১০ লাখ শেকেলের বেশি (৩ লাখ ২৫ হাজার ডলার) ব্যয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৭ লাখ ৫০ হাজার শেকেল বা ২ লাখ ৪৫ হাজার ডলার এবং ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত ৪ লাখ ৫০ হাজার শেকেল বা ১ লাখ ৪৬ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছে।

তবে আইনে মাইন অপসারণ কর্তৃপক্ষের ওপর শিক্ষা ব্যবস্থায় অবিস্ফোরিত অস্ত্র নিয়ে সচেতনতা তৈরির যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সেই খাতে বাজেটের কত অংশ ব্যয় হয়েছে, নথিতে তা উল্লেখ নেই। যুদ্ধ চলাকালে এবং অবিস্ফোরিত অস্ত্রের বিস্ফোরণের বিভিন্ন ঘটনার পর ইসরায়েল পুলিশ একাধিকবার সাধারণ মানুষের জন্য নির্দেশনা জারি করেছে।

সামরিক বাহিনীর হোম ফ্রন্ট কমান্ডও এর আগে একই ধরনের নির্দেশনা দিয়েছে। সোমবারের প্রাণঘাতী ঘটনার পর আইডিএফ জানিয়েছে, অবিস্ফোরিত অস্ত্রের বিপদ সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক প্রচার আরও বিস্তৃত করবে হোম ফ্রন্ট কমান্ড।

অবিস্ফোরিত অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা অজানা। বিশেষ করে জনসাধারণের হাঁটাচলার জন্য উন্মুক্ত বনাঞ্চল কিংবা কৃষিশ্রমিকদের কাজের মাঠে এসব অস্ত্রের উপস্থিতি এবং সীমিত অপসারণ কার্যক্রমের কারণে একই ধরনের ট্র্যাজেডি ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে ইসরায়েল। এছাড়া বহুদিন পড়ে থাকার কারণে মাটির নিচে চলে যাওয়ায় অনেক সময় হাঁটাচলায় চোখে পড়ে না অস্ত্রগুলো। ফলে বড় ধরনের প্রাণঘাতী ঝুঁকির মধ্যে দিয়েই দিন পার করছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ইসরায়েলিরা।