ঢাকা ০৯:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৭৯ জনের তালিকা নিয়ে চাঞ্চল্য

মাউশি ডিজি-বোর্ড চেয়ারম্যান থেকে কলেজ অধ্যক্ষ সব পদেই বসবেন সাবেক ছাত্রদল নেতা

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৭:৫৮:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
  • / ২৮ বার পড়া হয়েছে

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ডিজি থেকে শুরু বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, বড় কলেজের অধ্যক্ষসহ শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ পদে পদায়নের একটি তালিকা ঘিরে তীব্র বিতর্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তালিকায় থাকা ৭৯ জনের প্রায় সবাই ছাত্রজীবনে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা ইতোমধ্যে নিজেদের পছন্দের পদে বসতে শুরু করেছেন। এভাবে তালিকা করে পদায়নের ফলে শিক্ষা প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা তৈরির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর ফলে মেধাবী এবং কর্মঠ কর্মকর্তারা বঞ্চিত হতে পারেন। বিপাকে পড়তে পারে বিএনপি সরকার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদায়নের এ তালিকা বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের নেতৃত্বে করা হয়েছে। তালিকায় তিনি এক নম্বরে ছিলেন। তাকে মাউশি ডিজি পদে পদায়ন করা হবে বলে উল্লেখ ছিল তালিকায়। ইতোমধ্যে তিনি এ পদে আসীন হয়েছেন। ড. সোহেলকে ঢাবির ফজলুল হক হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পূর্বে প্রকাশিত ওই তালিকায়।

সূত্র বলছে, পদায়নের এ তালিকায় থাকা অনেকেই বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ছিলেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বাসায় অনেকেই যাতায়াত করতেন। শুধু তাই নয়; সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির আস্থাভাজন ছিলেন অনেকেই। বিগত সময়ের সুবিধাভোগীরাই নিজেদের বঞ্চিত দাবি করে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যা বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

শিক্ষা ক্যাডারদের পদায়নের তালিকা তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই।’ যদিও ইতোমধ্যেই পদায়ন হওয়া আরেক অধ্যাপক এই তালিকাটি দেখেছেন বলে স্বীকার করেছেন।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে শিক্ষার একটি দপ্তরের একজন পরিচালক বলেন, ‘তালিকায় থাকা অনেকেই বিতর্কিত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন। বলা হচ্ছে, তার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে; যা বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত। এই সিন্ডিকেটই একটি তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের চেষ্টা করছে।

মাদ্রাসা অধিদপ্তরে পদায়ন চান তালিকায় থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক ছাত্রদল নেতা বলেন, ‘তালিকায় আছি, বাকিটা দেখা যাক। ইনশাআল্লাহ’

তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চার নম্বরে থাকা প্রফেসর শাহনাজ পারভীন বর্তমানে ঢাকা কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি ছাত্রজীবনে জগন্নাথ হল ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদক এবং একই হলের ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাকে ঢাকা কলেজ বা ইডেন মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে তাকে ইডেন মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ পদ দেওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইডেন কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ শামিম আরা বিসিএস (শিক্ষা) ১৬ ব্যাচের কর্মকর্তা। অন্যদিকে, উপাধ্যক্ষ শাহনাজ পারভীন বিসিএস (শিক্ষা) ১৭ ব্যাচের। অধ্যক্ষ শামিম আরার চাকরির মেয়াদ প্রায় এক বছর অবশিষ্ট রয়েছে। তার অবসরের পরই শাহনাজ পারভীন কলেজটির অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন— তালিকা ঘিরে তৈরি হওয়া শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে এমনটাই আলোচনা চলছে।

শিক্ষা ক্যাডারদের পদায়নের জন্য তৈরিকৃত তালিকার বিষয়টি দেখেছেন বলে স্বীকার করে ইডেন কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘আপনি যেমন তালিকা দেখেছেন, তেমনি আমিও দেখেছি। এই তালিকা কারা তৈরি করেছে সেটি আমার জানা নেই। এই তালিকা অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। আমি উপাধ্যক্ষ পদেই আবেদন করেছিলাম। আবেদনের প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় আমাকে এ পদে পদায়ন করেছে।’

তালিকায় দুই নম্বরে থাকা প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান ঢাবি ছাত্রদলের জিয়াউর রহমান হলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যান অথবা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) হিসেবে পদায়নের প্রস্তাব রয়েছে প্রকাশ্যে আসা ওই তালিকায়।

তালিকায় থাকা মো. সাখাওয়াত হোসেন খান বর্তমানে পল্লবী সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ছাত্রজীবনে তিনি কবি জসিম উদ্দিন হল ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ছিলেন। তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অথবা সচিব হিসেবে পদায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

তালিকার পাঁচ নম্বরে থাকা প্রফেসর মো. শাহজাহান বর্তমানে মাউশির সাধারণ প্রশাসন শাখার উপ-পরিচালক। ছাত্রজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন। তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) হিসেবে পদায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রফেসর মো. আব্দুস সালাম বর্তমানে লেইস প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ছাত্রজীবনে ফজলুল হক হল ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। তাকে একই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে পদায়নের প্রস্তাব করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি প্রকল্প পরিচালকের (ভারপ্রাপ্ত) দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রফেসর মো. নুরুল হক সিকদার বর্তমানে মাউশির সরকারি কলেজ শাখার উপ-পরিচালক। ছাত্রজীবনে তিনি জাতীয়তাবাদী ধারার সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) হিসেবে পদায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রফেসর ড. মাসুদ রানা খান বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ড, ঢাকায় বিদ্যালয় পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে শিক্ষা বোর্ডের সচিব অথবা মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রফেসর মুনসী হুমায়ুন কবির বর্তমানে কলেজ পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্রজীবনে তিনি শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। তাকে শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে পদায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তালিকার সেলিনা আক্তার বর্তমানে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক পদে কর্মরত। ছাত্রজীবনে তিনি কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্রদলের সভাপতি এবং রোকেয়া হল ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ছিলেন। তাকে শিক্ষা বোর্ডের সচিব অথবা কারিগরি/মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়নের কথা উল্লেখ রয়েছে।

মো. নূরুল ইসলাম বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে উপ-পরিচালক (হিসাব ও নিরীক্ষা) হিসেবে কর্মরত। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন সংগঠনে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে একই বোর্ডে বিদ্যালয় পরিদর্শক হিসেবে পদায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

মো. শামিম আল মামুন বর্তমানে টাঙ্গাইলের সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের কর্মী ছিলেন। তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রশিক্ষণ) হিসেবে পদায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সুলতানা খান বর্তমানে মাউশির এইচআরমএম শাখা সহকারী পরিচালক পদে কর্মরত রয়েছেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের ‘নিবেদিত’ কর্মী ছিলেন উল্লেখ করা হয়েছে তালিকায়। তাকে উপ-পরিচালক (এইচআরএম) পদে পদায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

ড. এস এম ফারুক হোসেন বর্তমানে তিতুমীর কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বিশেষজ্ঞ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

রিনা পারভীন বর্তমানে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ছাত্রজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (বিশেষ শিক্ষা) হিসেবে পদায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিটি জায়গায় রাজনীতিকরণ করা হচ্ছে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবর রহমান বলেন, ‘উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও দলীয় পরিচয় প্রাধান্য পেয়েছে। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাজনীতি করার সুযোগ পান। সেজন্য হয়তো দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি চাকরিজীবীরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তাদের রাজনীতি করার সুযোগ নেই। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধাজনক জায়গায় পদায়ন পাওয়াটা দুঃখজনক।’

দলমত নির্বিশেষ যোগ্যদের যথাযথ জায়গায় পদায়ন করা উচিত জানিয়ে এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘বিএনপির কেউ যোগ্য হলে তাকে ভালো জায়গায় পদায়ন দেওয়া হোক। তেমনিভাবে বিরোধীদলে যদি যোগ্য ব্যক্তি থাকে তাহলে তারও ভালো জায়গায় পদায়ন পাওয়া দরকার। তবে কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ে পদায়ন করা হলে সেটি শিক্ষার জন্য ক্ষতিকর হবে।’

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

৭৯ জনের তালিকা নিয়ে চাঞ্চল্য

মাউশি ডিজি-বোর্ড চেয়ারম্যান থেকে কলেজ অধ্যক্ষ সব পদেই বসবেন সাবেক ছাত্রদল নেতা

আপডেট সময় ০৭:৫৮:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ডিজি থেকে শুরু বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, বড় কলেজের অধ্যক্ষসহ শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ পদে পদায়নের একটি তালিকা ঘিরে তীব্র বিতর্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তালিকায় থাকা ৭৯ জনের প্রায় সবাই ছাত্রজীবনে সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা ইতোমধ্যে নিজেদের পছন্দের পদে বসতে শুরু করেছেন। এভাবে তালিকা করে পদায়নের ফলে শিক্ষা প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা তৈরির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর ফলে মেধাবী এবং কর্মঠ কর্মকর্তারা বঞ্চিত হতে পারেন। বিপাকে পড়তে পারে বিএনপি সরকার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদায়নের এ তালিকা বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের নেতৃত্বে করা হয়েছে। তালিকায় তিনি এক নম্বরে ছিলেন। তাকে মাউশি ডিজি পদে পদায়ন করা হবে বলে উল্লেখ ছিল তালিকায়। ইতোমধ্যে তিনি এ পদে আসীন হয়েছেন। ড. সোহেলকে ঢাবির ফজলুল হক হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পূর্বে প্রকাশিত ওই তালিকায়।

সূত্র বলছে, পদায়নের এ তালিকায় থাকা অনেকেই বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ছিলেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বাসায় অনেকেই যাতায়াত করতেন। শুধু তাই নয়; সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির আস্থাভাজন ছিলেন অনেকেই। বিগত সময়ের সুবিধাভোগীরাই নিজেদের বঞ্চিত দাবি করে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যা বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

শিক্ষা ক্যাডারদের পদায়নের তালিকা তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই।’ যদিও ইতোমধ্যেই পদায়ন হওয়া আরেক অধ্যাপক এই তালিকাটি দেখেছেন বলে স্বীকার করেছেন।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে শিক্ষার একটি দপ্তরের একজন পরিচালক বলেন, ‘তালিকায় থাকা অনেকেই বিতর্কিত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন। বলা হচ্ছে, তার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে; যা বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত। এই সিন্ডিকেটই একটি তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের চেষ্টা করছে।

মাদ্রাসা অধিদপ্তরে পদায়ন চান তালিকায় থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক ছাত্রদল নেতা বলেন, ‘তালিকায় আছি, বাকিটা দেখা যাক। ইনশাআল্লাহ’

তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চার নম্বরে থাকা প্রফেসর শাহনাজ পারভীন বর্তমানে ঢাকা কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি ছাত্রজীবনে জগন্নাথ হল ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদক এবং একই হলের ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাকে ঢাকা কলেজ বা ইডেন মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে তাকে ইডেন মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ পদ দেওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইডেন কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ শামিম আরা বিসিএস (শিক্ষা) ১৬ ব্যাচের কর্মকর্তা। অন্যদিকে, উপাধ্যক্ষ শাহনাজ পারভীন বিসিএস (শিক্ষা) ১৭ ব্যাচের। অধ্যক্ষ শামিম আরার চাকরির মেয়াদ প্রায় এক বছর অবশিষ্ট রয়েছে। তার অবসরের পরই শাহনাজ পারভীন কলেজটির অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন— তালিকা ঘিরে তৈরি হওয়া শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে এমনটাই আলোচনা চলছে।

শিক্ষা ক্যাডারদের পদায়নের জন্য তৈরিকৃত তালিকার বিষয়টি দেখেছেন বলে স্বীকার করে ইডেন কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘আপনি যেমন তালিকা দেখেছেন, তেমনি আমিও দেখেছি। এই তালিকা কারা তৈরি করেছে সেটি আমার জানা নেই। এই তালিকা অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। আমি উপাধ্যক্ষ পদেই আবেদন করেছিলাম। আবেদনের প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় আমাকে এ পদে পদায়ন করেছে।’

তালিকায় দুই নম্বরে থাকা প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান ঢাবি ছাত্রদলের জিয়াউর রহমান হলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যান অথবা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) হিসেবে পদায়নের প্রস্তাব রয়েছে প্রকাশ্যে আসা ওই তালিকায়।

তালিকায় থাকা মো. সাখাওয়াত হোসেন খান বর্তমানে পল্লবী সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ছাত্রজীবনে তিনি কবি জসিম উদ্দিন হল ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ছিলেন। তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অথবা সচিব হিসেবে পদায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

তালিকার পাঁচ নম্বরে থাকা প্রফেসর মো. শাহজাহান বর্তমানে মাউশির সাধারণ প্রশাসন শাখার উপ-পরিচালক। ছাত্রজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন। তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) হিসেবে পদায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রফেসর মো. আব্দুস সালাম বর্তমানে লেইস প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ছাত্রজীবনে ফজলুল হক হল ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। তাকে একই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে পদায়নের প্রস্তাব করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি প্রকল্প পরিচালকের (ভারপ্রাপ্ত) দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রফেসর মো. নুরুল হক সিকদার বর্তমানে মাউশির সরকারি কলেজ শাখার উপ-পরিচালক। ছাত্রজীবনে তিনি জাতীয়তাবাদী ধারার সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) হিসেবে পদায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রফেসর ড. মাসুদ রানা খান বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ড, ঢাকায় বিদ্যালয় পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে শিক্ষা বোর্ডের সচিব অথবা মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রফেসর মুনসী হুমায়ুন কবির বর্তমানে কলেজ পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্রজীবনে তিনি শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। তাকে শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে পদায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তালিকার সেলিনা আক্তার বর্তমানে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক পদে কর্মরত। ছাত্রজীবনে তিনি কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্রদলের সভাপতি এবং রোকেয়া হল ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ছিলেন। তাকে শিক্ষা বোর্ডের সচিব অথবা কারিগরি/মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়নের কথা উল্লেখ রয়েছে।

মো. নূরুল ইসলাম বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে উপ-পরিচালক (হিসাব ও নিরীক্ষা) হিসেবে কর্মরত। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন সংগঠনে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে একই বোর্ডে বিদ্যালয় পরিদর্শক হিসেবে পদায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

মো. শামিম আল মামুন বর্তমানে টাঙ্গাইলের সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের কর্মী ছিলেন। তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রশিক্ষণ) হিসেবে পদায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সুলতানা খান বর্তমানে মাউশির এইচআরমএম শাখা সহকারী পরিচালক পদে কর্মরত রয়েছেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের ‘নিবেদিত’ কর্মী ছিলেন উল্লেখ করা হয়েছে তালিকায়। তাকে উপ-পরিচালক (এইচআরএম) পদে পদায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

ড. এস এম ফারুক হোসেন বর্তমানে তিতুমীর কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বিশেষজ্ঞ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

রিনা পারভীন বর্তমানে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ছাত্রজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (বিশেষ শিক্ষা) হিসেবে পদায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিটি জায়গায় রাজনীতিকরণ করা হচ্ছে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবর রহমান বলেন, ‘উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও দলীয় পরিচয় প্রাধান্য পেয়েছে। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাজনীতি করার সুযোগ পান। সেজন্য হয়তো দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি চাকরিজীবীরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তাদের রাজনীতি করার সুযোগ নেই। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধাজনক জায়গায় পদায়ন পাওয়াটা দুঃখজনক।’

দলমত নির্বিশেষ যোগ্যদের যথাযথ জায়গায় পদায়ন করা উচিত জানিয়ে এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘বিএনপির কেউ যোগ্য হলে তাকে ভালো জায়গায় পদায়ন দেওয়া হোক। তেমনিভাবে বিরোধীদলে যদি যোগ্য ব্যক্তি থাকে তাহলে তারও ভালো জায়গায় পদায়ন পাওয়া দরকার। তবে কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ে পদায়ন করা হলে সেটি শিক্ষার জন্য ক্ষতিকর হবে।’