পানির নিচে কৃষকের স্বপ্ন: ফসল হারিয়ে ঋণের বোঝা মাথায় চাষিদের হাহাকার
- আপডেট সময় ০১:৩৩:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬
- / ২২ বার পড়া হয়েছে
দেশের বিভিন্ন স্থানে টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে পাকা বোরো ধান। পানি পেয়ে এসব ধানে চারা গজিয়ে যাচ্ছে। তাই কাঁচা-পাকা ধান কেটে নিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা । তারা ঋণ নিয়ে বোরোর আবাদ করেছিলেন। এখন ফসল হারিয়ে ঋণ পরিশোধে দুশ্চিন্তায় আছেন। ঝড়-বৃষ্টিতে পাকা বোরো ধান হারিয়ে কাঁদছেন তারা। কোথাও কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করেছে জেলা কৃষি বিভাগ। জেলা প্রশাসন দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি মনিটরিং সেল গঠন করেছে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, জেলায় দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে জলাবদ্ধতায় ২০ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে ২ হাজার হেক্টর জমির ফসল । এতে প্রায় ২০ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। টানা বৃষ্টিতে ধান কাটতে না পারা আর কাটা ধান রোদ না থাকায় নষ্ট হওয়ার দুশ্চিন্তার মধ্যেই এবার বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল তলিয়ে গেছে। বুকসমান পানিতে নেমে নৌকা কিংবা ভেলায় ভাসিয়ে ধান কেটে খলায় তুললেও রোদের অভাবে সেই ধান শুকানো যাচ্ছে না।
মধ্যনগরে (সুনামগঞ্জ), গতকাল শনিবার ভোররাতে গুড়াডুবা উপপ্রকল্পের একটি বাঁধ ভেঙে মধ্যনগরের বোয়ালা হাওরে পানি প্রবেশ শুরু হয়। এতে তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল। হাওরে ডুবে যাওয়া ধান কাটবেন, নাকি বাঁধ রক্ষা করবেন— এ নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। এই সংকটে পড়ে কৃষকদের অনেকেই আশা ছেড়ে কেবল হা-হুতাশ করছেন।
হবিগঞ্জে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে জেলার আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই ও নবীগঞ্জ হাওর অধ্যুষিত এলাকায় পাকা ধান কাটার আগেই পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। প্রায় ১১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির পাকা ধান পানির নিচে চলে গেছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলায় হঠাৎ বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার প্রভাবে মাঠে থাকা পাকা ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে, যা কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মাড়াই ও শুকানো নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
ময়মনসিংহের ভালুকায় অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢল এবং জলাবদ্ধতায় ভালুকা উপজেলার নামা জমির শত শত একর বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলার সবগুলো বিলের ধান প্রায় সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। কৃষক ধান কাটার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। এতে তাদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।
নিজের শ্রম আর ঘামে উৎপাদিত সোনালি ফসল চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েছেন নবীগঞ্জ উপজেলার বড় ভাকৈর (পশ্চিম) ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামের কৃষক হরলাল বৈষ্ণব। টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে বাঁধভাঙা পানি কেড়ে নিয়েছে তার স্বপ্ন, রেখে গেছে শুধু এক বুক হাহাকার।
এছাড়া উজানে টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার নিচু এলাকার বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলের বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে ওই এলাকার জমির পাকা ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বৃষ্টিপাত কমলেও সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা।
অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল। এতে উপজেলার মেদির হাওর, মাছমা হাওর, চিনাকান্দি হাওর, বড়কান্দি হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে কৃষকের ফলানো ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছে। এতে প্রায় ৮০ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে নিমজ্জিত হয়েছে। তবে দুদিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ধান কাটা অব্যাহত রয়েছে। ফলে তলিয়ে থাকা ধানের ১০ শতাংশ নতুন করে কাটা সম্ভব হয়েছে।
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায় কালবৈশাখী ও টানা বৃষ্টির প্রকোপে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আধাপাকা ধান মাটিতে শুয়ে পড়েছে, অনেক ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। মৌসুমের শেষ সময়ে এ দুর্যোগে কৃষকরা চরম উদ্বেগ ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় টানা বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় বোরো ধান, পাট, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাঠজুড়ে আধাপাকা ও কাঁচা ধান নুয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও জমে থাকা পানিতে ধানক্ষেত তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি ও শ্রমিক সংকটে মাঠেই নষ্ট হচ্ছে সোনালি ধান। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর গত বৃহস্পতিবার সূর্যের দেখা মিললেও শনিবার থেকে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এতে ফলন বিপর্যয়ের পাশাপাশি ধান ঘরে তোলা নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা।
নীলফামারীতে বৃষ্টিপাত ও ঝড়ে হেলে পড়া ভুট্টা ও নিচু এলাকার বোরো ধান, পাট ও সবজি পচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন প্রান্তিক কৃষকরা। আলুতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর কৃষকদের আশার আলো এসব ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হবে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
সুনামগঞ্জের শাল্লায় দুই-তিনদিন আগেও যেখানে ঝলমল করছিল সোনালি ফসল, সেখানে এখন কোমর ও গলাসমান পানি। হঠাৎ পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে কৃষকদের সারা বছরের স্বপ্ন। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ও সংসারের সারা বছরের খরচের জোগান আসে এ ফসল থেকে। কিন্তু টানা ভারী বৃষ্টিতে ফসল তলিয়ে কৃষকদের এখন মাথায় হাত। এ যেন আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ার মতো। শাল্লা উপজেলায় ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত ১৫টি হাওর রয়েছে। অধিকাংশ হাওরে এখন কোমর ও গলাসমান পানি।























