ঢাকা ০৭:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্তাপ ছড়ায় ‘একাত্তর কার্ড’

নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৬:২৩:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬
  • / ২৯ বার পড়া হয়েছে

দফায় দফায় উত্তাপ ছড়িয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। গুরুত্ব পেয়েছে সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক মতাদর্শের বিষয়টিও। এক্ষেত্রে বেশি ব্যবহার হয়েছে ‘একাত্তর কার্ড’। জুলাই সনদ, মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা, জুলাই অভ্যুত্থান, সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠক, রাষ্ট্রপতির ভাষণ, জ্বালানি সংকট এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশসহ নানা ইস্যুতে উত্তপ্ত ছিল পুরো অধিবেশন। বিষয়গুলো নিয়ে দুদল মুখোমুখি অবস্থানে থেকে সংসদে তীব্র বিতর্ক ও বাহাসে জড়িয়েছে। ঘটেছে একাধিক ওয়াকআউটের ঘটনাও। সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত ছিল জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের সংসদের প্রথম অধিবেশন।

ফ্যাসিস্টমুক্ত সংসদে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বয়ানই প্রাধান্য পেয়েছিল জাতীয় সংসদের সদ্যসমাপ্ত অধিবেশনে। আওয়ামী কায়দায় ‘রাজাকার’, ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ শব্দের বেশি ব্যবহার দেখা গেছে। তবে এবার হয়েছে ভিন্নভাবে। গত সাড়ে ১৫ বছর ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যায়িত করে বিএনপি-জামায়াতকে যেভাবে আক্রমণ করা হতো সংসদে, এবার তা হয়েছে কেবল জামায়াতে ইসলামীর ওপর। ইস্যুটি সামনে এনে এবার বিরোধী দল জামায়াতকে জোরালোভাবে ঘায়েল করেছেন সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্যরা। বিষয়টিকে অতীতের বিভাজনের রাজনীতির অংশ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ৫৫ বছরের পুরোনো ইস্যু টেনে আনাকে দুঃখজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন।

গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। বিদায়ী সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সিনিয়র সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। তার সভাপতিত্বে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হয়। পরে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সংসদ পরিচালনা করেন। ২৫ কার্যদিবসের এ অধিবেশন শেষ হয় গত ৩০ এপ্রিল। এ অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯১টি বিল আকারে পাস হয়। কয়েকটি বিল এনে রহিতকরণ এবং অধিকতর যুগোপযোগী করে পরবর্তীতে তোলা হবে উল্লেখ করে বাদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ। এগুলো নিয়ে বিরোধী দল তীব্র বিরোধিতা করে। ওই ৯১টি ছাড়াও সংসদে আরো তিনটি বিল, সব মিলিয়ে ৯৪টি বিল পাস হয়। অবশ্য একাধিক বিল পাসে কার্যপ্রণালি বিধির ব্যত্যয় ঘটেছে। এবারের সংসদে ৬২ বিধিতে দুটি ও ৬৮ বিধিতে একটি বিষয়ের ওপর আলোচনা হয়। এর মধ্যে দুটি ছিল সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার তোলা। অপরটি ছিল সরকারি দলের সদস্যের। অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৪০ ঘণ্টার বেশি আলোচনা হয়। এতে ২৮০ সদস্য অংশ নেন।

বিরোধী দল সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করে ওয়াকআউট করে। এছাড়া বিভিন্ন ইস্যুতে তারা আরো তিনবার ওয়াকআউট করে। বিরোধী দলের বিরোধিতার মুখে সংসদ অধিবেশনের শেষ দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারি এবং বিরোধী দলের মধ্যে যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতা তিনি এ অধিবেশনে দেখেছেন, অতীতের কোনো সংসদে তেমন দৃশ্য দেখেননি।

এবারের সংসদে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে জুলাই জাতীয় সংসদ ও একাত্তর নিয়ে। বিরোধী দলকে ঘায়েলে সরকারি দলের প্রধান অস্ত্রই ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে বর্তমান বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা থেকে শুরু করে প্রতিটি ইস্যুতেই সরকারি দলের এমপিরা বিষয়টি নিয়ে এসেছেন। গত ৯ এপ্রিল সংসদে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিল পাসের দিন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান যুদ্ধাপরাধী দল, রাজাকার, আলবদর, আলশামস বিষয়গুলো সামনে আনেন। পরে রাষ্ট্রপতির ভাষণের আলোচনায়ও তিনি বিষয়টি তোলেন। তিনি বলেন, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিলের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এছাড়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় সরকারি দলের প্রায় সব সদস্যই স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী ও দলটির নেতাদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। এর মধ্যে বেশি আক্রমণাত্মক ছিল সরকারি দলের এমপি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফজলুর রহমানের বক্তব্যটি। তার বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেন জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা। ফজলুর রহমান ছাড়াও সরকারি দলের কয়েকজন সদস্যের এ-সংক্রান্ত বক্তব্য নিয়ে সংসদে হট্টগোল হয়। এসব বক্তব্যের প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও তাদের আলোচনার সময় জবাব দেন।

১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া বিএনপি কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সংগঠন হয়, সে প্রশ্নও তোলা হয়। জামায়াতের একাধিক সদস্য নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন। বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের নিজেকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির এবং বিরোধীদলীয় নেতা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সন্তান দাবি করেন। অবশ্য স্বাধীনতাবিরোধী ও রাজাকার ইস্যুতে বিরোধী দলের শরিক এনসিপি পুরো সময়ই নিশ্চুপ ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী’, ‘রাজাকার’, ‘আলবদর’ প্রভৃতি শব্দ যুক্ত করে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিল পাসের সময় জামায়াতে ইসলামী বিরোধিতা করলেও এনসিপি লিখিতভাবে আইনে তাদের সমর্থনের কথা জানায়।

এদিকে একাত্তর, স্বাধীনতাবিরোধী ইস্যুতে ভিন্নধর্মী বক্তব্য দিতে দেখা যায় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিকে। অধিবেশনের শেষ দিন রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমের সংসদ’ আখ্যায়িত করে চিফ হুইপ বলেন, ‘এই সংসদে বলা হতো জামায়াত-বিএনপি’ এ কথা বলেই আমাদের আক্রমণ করা হতো। শুরুই হতো জামায়াত-বিএনপি দিয়ে। তারপর আমাদের বিরুদ্ধে স্লোগান তৈরি করল ‘৭১-এর রাজাকার, এ মুহূর্তে বাংলা ছাড়’। পত্রিকার হেডলাইন ছিল ‘তুই রাজাকার’, ‘তুই রাজাকার’। আমরা দীর্ঘদিন এরকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছি। তিনি আরো বলেন, আমরা বিএনপি-জামায়াত জাতীয় সংসদে পিঁপড়ার বলের মতো (দলাপাকিয়ে) থাকতে চাই। আমরা সবাই মিলে দেশটাকে নিয়ে বাঁচতে চাই। সে দায়িত্ব নিয়ে এখানে বসেছি।’

এবারের সংসদে বিরোধী দলের চার দফা ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করে সংসদ অধিবেশনের শুরুর দিন ১২ মার্চ প্রথম দফা ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেও আদেশের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা না ডাকাসহ তিন কারণে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। এরপর ওয়াকআউট করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের বিষয়ে কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় ১ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায়; ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কয়েকটি অধ্যাদেশ রহিতকরণে ৯ এপ্রিল তৃতীয় দফা এবং বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিলে সংশোধনী আনায় চতুর্থ দফায় তারা ওয়াকআউট করে। অবশ্য ওয়াকআউট করলেও পরে তারা অধিবেশনে যোগ দেন।

এবারের সংসদে আলোচিত ভূমিকায় দেখা যায় এনসিপির সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহকে। প্রশ্নোত্তর, জনগুরুত্বপূর্ণ-সম্পর্কিত ৭১ বিধি, এলাকার সমস্যা এবং সাম্প্রতিক ইস্যুতে পয়েন্ট অব অর্ডারসহ প্রায় প্রতিদিনই সংসদে সক্রিয় দেখা যায় জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির এ যোদ্ধাকে। সংসদ সদস্যদের গাড়ি ইস্যুতেও তিনি ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দিয়েছেন। বিল পাস, জুলাই সনদসহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে বিরোধী দলের পক্ষে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানান। সক্রিয় ভূমিকার জন্য খোদ সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তার প্রশংসা করেন।

এদিকে, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এনসিপির সদস্য ও দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম চিফ হুইপ হিসেবে সক্রিয়তা না দেখালেও অধিবেশনের শেষ দিন রাষ্ট্রপতির ভাষণে আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বাজিমাত করেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর তিনি ৩৪ মিনিটের বক্তব্যে সবার নজর কাড়েন। তিনি তার বক্তব্যে রাষ্ট্রপতিকে ফ্যাসিস্টের দোসর, দুর্নীতিবাজ ও বেঈমান আখ্যায়িত করে গ্রেপ্তারের দাবি তোলেন। জুলাই আন্দোলন, জুলাই জাতীয় সনদ, নির্বাচন, সংস্কার পরিষদসহ দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে গোছালো ও অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় যথাযথ যুক্তি তুলে ধরেন। তার এ বক্তব্য গণমাধ্যমগুলোয় গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশিত হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। বক্তব্যের জন্য তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র প্রশংসায় ভাসেন। পরে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারি দলের সিনিয়র সংসদ সদস্যদের তার বক্তব্য খণ্ডন করে জবাব দিতে দেখা যায়।

সংসদের ভেতরে ও বাইরে দুপক্ষের ভিন্ন অবস্থান দেখা গেলেও সরকারপ্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যে এক ধরনের সহনশীলতার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। সংসদ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে কেউ কাউকে আক্রমণ করে কথা বলেননি। বরং বিরোধীদলীয় নেতা যেসব সমস্যার কথা তুলে ধরেন, সংসদ নেতা তা মেনে নিয়েই সমাস্যার আশ্বাস দেন। বিরোধীদলীয় নেতার নির্বাচনি এলাকার সমস্যা সমাধানেরও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

এ অধিবেশন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রাণবন্ত ছিল উল্লেখ করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক আমার দেশকে বলেন, দেশের চলমান প্রায় সব ইস্যু নিয়েই সরকারি ও বিরোধী দল আলোচনায় অংশ নেয়। এ অধিবেশন ঘিরে সাধারণ মানুষেরও যথেষ্ট আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। তবে জুলাই সনদ, গণভোট এবং সংস্কারকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু অধ্যাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

তিনি আরো বলেন, এ অধিবেশন দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে, মাত্র ২০ মাস আগে দেশে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার মতো প্রবল ক্ষমতাধর এক শাসককে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। কারণ, এ অধিবেশনে সবচেয়ে কম ব্যবহৃত শব্দ ছিল ‘শেখ হাসিনা’ ও ‘আওয়ামী লীগ’ আর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘বাহাত্তরের সংবিধান’। আবার এ সংসদ অধিবেশনেই মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের জন্য শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়। একই সঙ্গে দেখা যায়, বিএনপির সংসদ সদস্যরা মাত্র কয়েক গজ দূরে অবস্থানরত বিরোধী দল জামায়াতের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে ‘রাজাকার’, ‘আলবদর’, ‘আলশামস’, ‘বেঈমান’ ও ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ শব্দ ব্যবহার করেন।

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে চেতনার ব্যবসা করেছে এবং জামায়াতকে মোকাবিলার ক্ষেত্রে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ শব্দযুগল অধিক মাত্রায় ব্যবহার করেছে। ওই সরকার এক্ষেত্রে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপিকেও জড়িয়েছে। বর্তমানে সরকারি দল বিএনপিও মুক্তিযুদ্ধকে সামনে রেখে এগোতে চায়Ñতাদের বক্তব্য ও বিবৃতিতে তার প্রতিফলন দেখা যায়। জামায়াত এ ইস্যু কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা তাদের নিজস্ব বিষয়।

এবারের সংসদ অধিবেশন সার্বিকভাবে চমৎকার ছিল বলে মনে করেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। আমার দেশকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘অতীতের অভিজ্ঞতায় আমরা এবার ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ অধিবেশন দেখলাম। আগে দেখা যেত, সরকারি দল ও সংসদ নেতার পক্ষ থেকে অযাচিত হস্তক্ষেপ হতো। এতে স্পিকারের পদটি নিরপেক্ষ হলেও তিনি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। কিন্তু এবার আমরা পদটির প্রকৃত নিরপেক্ষতা দেখতে পেয়েছি। স্পিকার কখনো কখনো সরকারি দলের চেয়ে বিরোধী দলকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এবারের সংসদে সংসদ নেতা তথা প্রধানমন্ত্রীর কোনো হস্তক্ষেপই আমরা দেখিনি। বরং অনেক সময় দেখা গেছে তিনি চুপচাপ বিরোধী দলের সদস্যদের সমালোচনা শুনছেন।’

আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের কার্যকর ভূমিকার ঘাটতি ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজ হচ্ছে আইন প্রণয়ন। তবে, অন্য ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের যে ভূমিকা দেখেছি আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তা দেখা যায়নি। এবারের সদস্যদের বড় অংশ নতুন ও অনভিজ্ঞ হওয়ার কারণে হয়তো এটা হয়েছে। আগামীতে হয়তো এই দুর্বলতা তারা কাটিয়ে উঠবেন। বিষয়টি নিয়ে ওয়ার্কশপ করা যেতে পারে বলেও তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, ‘বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক। তিনি সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের প্রধান ছিলেন। বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে একমাত্র বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার দলের বহু নেতা খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের দল হিসেবে তারা মুক্তিযুদ্ধকে তো লালন করবেই। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর যে অবস্থান ছিল সেটা কারও অজানা নয়। কাজেই রাজনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে বিএনপি এটা নিয়ে রাজনীতি করবে এটা স্বাভাবিক। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ায় এবং নেতৃত্ব দেওয়ায় মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিকভাবে কয়েন করতে পারে এই ধরনের একমাত্র দল বিএনপি। আর আমি মনে করি, সেটাই বিএনপি করেছে।’

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘এই অধিবেশনে মনে হয়েছে আমরা ক্রমান্বয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অতীত অভিজ্ঞতার দিকে যাচ্ছি। জুলাই সনদ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে সরকারি দলের অবস্থান একটি ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী সংসদের আলামত দেখা যাচ্ছে। সংসদে বিএনপির অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে তারা এক সময়কার জোটসঙ্গীর সঙ্গে প্রতারণা করছে।’

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধ ইস্যু প্রশ্নে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় গত ৫৪ বছর দেশকে বিভক্ত করে রাখা হয়েছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে মনে হয়েছিল অতীতের বিভাজন ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ এগিয়ে যাবে। কিন্তু সংসদে দেখা গেলে বিএনপি বিভাজনকেই জিইয়ে রাখতে চায়। ফ্যাসিস্ট আমলের গত সাড়ে ১৫ বছরের সংসদে মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তর ইস্যুতে যেভাবে বিএনপি-জামায়াতকে আক্রমণ করা হতো, এখন দেখছি জামায়াতকে টার্গেট করে বিএনপি উদ্দেশ্যমূলকভাবে একই ধারায় চলছে। এটি কাম্য নয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্তাপ ছড়ায় ‘একাত্তর কার্ড’

আপডেট সময় ০৬:২৩:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬

দফায় দফায় উত্তাপ ছড়িয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। গুরুত্ব পেয়েছে সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক মতাদর্শের বিষয়টিও। এক্ষেত্রে বেশি ব্যবহার হয়েছে ‘একাত্তর কার্ড’। জুলাই সনদ, মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা, জুলাই অভ্যুত্থান, সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠক, রাষ্ট্রপতির ভাষণ, জ্বালানি সংকট এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশসহ নানা ইস্যুতে উত্তপ্ত ছিল পুরো অধিবেশন। বিষয়গুলো নিয়ে দুদল মুখোমুখি অবস্থানে থেকে সংসদে তীব্র বিতর্ক ও বাহাসে জড়িয়েছে। ঘটেছে একাধিক ওয়াকআউটের ঘটনাও। সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত ছিল জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের সংসদের প্রথম অধিবেশন।

ফ্যাসিস্টমুক্ত সংসদে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বয়ানই প্রাধান্য পেয়েছিল জাতীয় সংসদের সদ্যসমাপ্ত অধিবেশনে। আওয়ামী কায়দায় ‘রাজাকার’, ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ শব্দের বেশি ব্যবহার দেখা গেছে। তবে এবার হয়েছে ভিন্নভাবে। গত সাড়ে ১৫ বছর ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যায়িত করে বিএনপি-জামায়াতকে যেভাবে আক্রমণ করা হতো সংসদে, এবার তা হয়েছে কেবল জামায়াতে ইসলামীর ওপর। ইস্যুটি সামনে এনে এবার বিরোধী দল জামায়াতকে জোরালোভাবে ঘায়েল করেছেন সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্যরা। বিষয়টিকে অতীতের বিভাজনের রাজনীতির অংশ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ৫৫ বছরের পুরোনো ইস্যু টেনে আনাকে দুঃখজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন।

গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। বিদায়ী সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সিনিয়র সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। তার সভাপতিত্বে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হয়। পরে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সংসদ পরিচালনা করেন। ২৫ কার্যদিবসের এ অধিবেশন শেষ হয় গত ৩০ এপ্রিল। এ অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯১টি বিল আকারে পাস হয়। কয়েকটি বিল এনে রহিতকরণ এবং অধিকতর যুগোপযোগী করে পরবর্তীতে তোলা হবে উল্লেখ করে বাদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ। এগুলো নিয়ে বিরোধী দল তীব্র বিরোধিতা করে। ওই ৯১টি ছাড়াও সংসদে আরো তিনটি বিল, সব মিলিয়ে ৯৪টি বিল পাস হয়। অবশ্য একাধিক বিল পাসে কার্যপ্রণালি বিধির ব্যত্যয় ঘটেছে। এবারের সংসদে ৬২ বিধিতে দুটি ও ৬৮ বিধিতে একটি বিষয়ের ওপর আলোচনা হয়। এর মধ্যে দুটি ছিল সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার তোলা। অপরটি ছিল সরকারি দলের সদস্যের। অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৪০ ঘণ্টার বেশি আলোচনা হয়। এতে ২৮০ সদস্য অংশ নেন।

বিরোধী দল সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করে ওয়াকআউট করে। এছাড়া বিভিন্ন ইস্যুতে তারা আরো তিনবার ওয়াকআউট করে। বিরোধী দলের বিরোধিতার মুখে সংসদ অধিবেশনের শেষ দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারি এবং বিরোধী দলের মধ্যে যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতা তিনি এ অধিবেশনে দেখেছেন, অতীতের কোনো সংসদে তেমন দৃশ্য দেখেননি।

এবারের সংসদে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে জুলাই জাতীয় সংসদ ও একাত্তর নিয়ে। বিরোধী দলকে ঘায়েলে সরকারি দলের প্রধান অস্ত্রই ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে বর্তমান বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা থেকে শুরু করে প্রতিটি ইস্যুতেই সরকারি দলের এমপিরা বিষয়টি নিয়ে এসেছেন। গত ৯ এপ্রিল সংসদে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিল পাসের দিন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান যুদ্ধাপরাধী দল, রাজাকার, আলবদর, আলশামস বিষয়গুলো সামনে আনেন। পরে রাষ্ট্রপতির ভাষণের আলোচনায়ও তিনি বিষয়টি তোলেন। তিনি বলেন, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিলের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এছাড়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় সরকারি দলের প্রায় সব সদস্যই স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী ও দলটির নেতাদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। এর মধ্যে বেশি আক্রমণাত্মক ছিল সরকারি দলের এমপি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফজলুর রহমানের বক্তব্যটি। তার বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেন জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা। ফজলুর রহমান ছাড়াও সরকারি দলের কয়েকজন সদস্যের এ-সংক্রান্ত বক্তব্য নিয়ে সংসদে হট্টগোল হয়। এসব বক্তব্যের প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও তাদের আলোচনার সময় জবাব দেন।

১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া বিএনপি কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সংগঠন হয়, সে প্রশ্নও তোলা হয়। জামায়াতের একাধিক সদস্য নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন। বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের নিজেকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির এবং বিরোধীদলীয় নেতা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সন্তান দাবি করেন। অবশ্য স্বাধীনতাবিরোধী ও রাজাকার ইস্যুতে বিরোধী দলের শরিক এনসিপি পুরো সময়ই নিশ্চুপ ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী’, ‘রাজাকার’, ‘আলবদর’ প্রভৃতি শব্দ যুক্ত করে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিল পাসের সময় জামায়াতে ইসলামী বিরোধিতা করলেও এনসিপি লিখিতভাবে আইনে তাদের সমর্থনের কথা জানায়।

এদিকে একাত্তর, স্বাধীনতাবিরোধী ইস্যুতে ভিন্নধর্মী বক্তব্য দিতে দেখা যায় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিকে। অধিবেশনের শেষ দিন রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমের সংসদ’ আখ্যায়িত করে চিফ হুইপ বলেন, ‘এই সংসদে বলা হতো জামায়াত-বিএনপি’ এ কথা বলেই আমাদের আক্রমণ করা হতো। শুরুই হতো জামায়াত-বিএনপি দিয়ে। তারপর আমাদের বিরুদ্ধে স্লোগান তৈরি করল ‘৭১-এর রাজাকার, এ মুহূর্তে বাংলা ছাড়’। পত্রিকার হেডলাইন ছিল ‘তুই রাজাকার’, ‘তুই রাজাকার’। আমরা দীর্ঘদিন এরকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছি। তিনি আরো বলেন, আমরা বিএনপি-জামায়াত জাতীয় সংসদে পিঁপড়ার বলের মতো (দলাপাকিয়ে) থাকতে চাই। আমরা সবাই মিলে দেশটাকে নিয়ে বাঁচতে চাই। সে দায়িত্ব নিয়ে এখানে বসেছি।’

এবারের সংসদে বিরোধী দলের চার দফা ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করে সংসদ অধিবেশনের শুরুর দিন ১২ মার্চ প্রথম দফা ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেও আদেশের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা না ডাকাসহ তিন কারণে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। এরপর ওয়াকআউট করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের বিষয়ে কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় ১ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায়; ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কয়েকটি অধ্যাদেশ রহিতকরণে ৯ এপ্রিল তৃতীয় দফা এবং বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিলে সংশোধনী আনায় চতুর্থ দফায় তারা ওয়াকআউট করে। অবশ্য ওয়াকআউট করলেও পরে তারা অধিবেশনে যোগ দেন।

এবারের সংসদে আলোচিত ভূমিকায় দেখা যায় এনসিপির সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহকে। প্রশ্নোত্তর, জনগুরুত্বপূর্ণ-সম্পর্কিত ৭১ বিধি, এলাকার সমস্যা এবং সাম্প্রতিক ইস্যুতে পয়েন্ট অব অর্ডারসহ প্রায় প্রতিদিনই সংসদে সক্রিয় দেখা যায় জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির এ যোদ্ধাকে। সংসদ সদস্যদের গাড়ি ইস্যুতেও তিনি ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দিয়েছেন। বিল পাস, জুলাই সনদসহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে বিরোধী দলের পক্ষে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানান। সক্রিয় ভূমিকার জন্য খোদ সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তার প্রশংসা করেন।

এদিকে, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এনসিপির সদস্য ও দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম চিফ হুইপ হিসেবে সক্রিয়তা না দেখালেও অধিবেশনের শেষ দিন রাষ্ট্রপতির ভাষণে আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বাজিমাত করেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর তিনি ৩৪ মিনিটের বক্তব্যে সবার নজর কাড়েন। তিনি তার বক্তব্যে রাষ্ট্রপতিকে ফ্যাসিস্টের দোসর, দুর্নীতিবাজ ও বেঈমান আখ্যায়িত করে গ্রেপ্তারের দাবি তোলেন। জুলাই আন্দোলন, জুলাই জাতীয় সনদ, নির্বাচন, সংস্কার পরিষদসহ দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে গোছালো ও অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় যথাযথ যুক্তি তুলে ধরেন। তার এ বক্তব্য গণমাধ্যমগুলোয় গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশিত হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। বক্তব্যের জন্য তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র প্রশংসায় ভাসেন। পরে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারি দলের সিনিয়র সংসদ সদস্যদের তার বক্তব্য খণ্ডন করে জবাব দিতে দেখা যায়।

সংসদের ভেতরে ও বাইরে দুপক্ষের ভিন্ন অবস্থান দেখা গেলেও সরকারপ্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যে এক ধরনের সহনশীলতার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। সংসদ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে কেউ কাউকে আক্রমণ করে কথা বলেননি। বরং বিরোধীদলীয় নেতা যেসব সমস্যার কথা তুলে ধরেন, সংসদ নেতা তা মেনে নিয়েই সমাস্যার আশ্বাস দেন। বিরোধীদলীয় নেতার নির্বাচনি এলাকার সমস্যা সমাধানেরও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

এ অধিবেশন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রাণবন্ত ছিল উল্লেখ করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক আমার দেশকে বলেন, দেশের চলমান প্রায় সব ইস্যু নিয়েই সরকারি ও বিরোধী দল আলোচনায় অংশ নেয়। এ অধিবেশন ঘিরে সাধারণ মানুষেরও যথেষ্ট আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। তবে জুলাই সনদ, গণভোট এবং সংস্কারকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু অধ্যাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

তিনি আরো বলেন, এ অধিবেশন দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে, মাত্র ২০ মাস আগে দেশে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার মতো প্রবল ক্ষমতাধর এক শাসককে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। কারণ, এ অধিবেশনে সবচেয়ে কম ব্যবহৃত শব্দ ছিল ‘শেখ হাসিনা’ ও ‘আওয়ামী লীগ’ আর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘বাহাত্তরের সংবিধান’। আবার এ সংসদ অধিবেশনেই মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের জন্য শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়। একই সঙ্গে দেখা যায়, বিএনপির সংসদ সদস্যরা মাত্র কয়েক গজ দূরে অবস্থানরত বিরোধী দল জামায়াতের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে ‘রাজাকার’, ‘আলবদর’, ‘আলশামস’, ‘বেঈমান’ ও ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ শব্দ ব্যবহার করেন।

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে চেতনার ব্যবসা করেছে এবং জামায়াতকে মোকাবিলার ক্ষেত্রে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ শব্দযুগল অধিক মাত্রায় ব্যবহার করেছে। ওই সরকার এক্ষেত্রে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপিকেও জড়িয়েছে। বর্তমানে সরকারি দল বিএনপিও মুক্তিযুদ্ধকে সামনে রেখে এগোতে চায়Ñতাদের বক্তব্য ও বিবৃতিতে তার প্রতিফলন দেখা যায়। জামায়াত এ ইস্যু কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা তাদের নিজস্ব বিষয়।

এবারের সংসদ অধিবেশন সার্বিকভাবে চমৎকার ছিল বলে মনে করেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। আমার দেশকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘অতীতের অভিজ্ঞতায় আমরা এবার ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ অধিবেশন দেখলাম। আগে দেখা যেত, সরকারি দল ও সংসদ নেতার পক্ষ থেকে অযাচিত হস্তক্ষেপ হতো। এতে স্পিকারের পদটি নিরপেক্ষ হলেও তিনি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। কিন্তু এবার আমরা পদটির প্রকৃত নিরপেক্ষতা দেখতে পেয়েছি। স্পিকার কখনো কখনো সরকারি দলের চেয়ে বিরোধী দলকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এবারের সংসদে সংসদ নেতা তথা প্রধানমন্ত্রীর কোনো হস্তক্ষেপই আমরা দেখিনি। বরং অনেক সময় দেখা গেছে তিনি চুপচাপ বিরোধী দলের সদস্যদের সমালোচনা শুনছেন।’

আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের কার্যকর ভূমিকার ঘাটতি ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজ হচ্ছে আইন প্রণয়ন। তবে, অন্য ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের যে ভূমিকা দেখেছি আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তা দেখা যায়নি। এবারের সদস্যদের বড় অংশ নতুন ও অনভিজ্ঞ হওয়ার কারণে হয়তো এটা হয়েছে। আগামীতে হয়তো এই দুর্বলতা তারা কাটিয়ে উঠবেন। বিষয়টি নিয়ে ওয়ার্কশপ করা যেতে পারে বলেও তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, ‘বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক। তিনি সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের প্রধান ছিলেন। বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে একমাত্র বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার দলের বহু নেতা খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের দল হিসেবে তারা মুক্তিযুদ্ধকে তো লালন করবেই। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর যে অবস্থান ছিল সেটা কারও অজানা নয়। কাজেই রাজনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে বিএনপি এটা নিয়ে রাজনীতি করবে এটা স্বাভাবিক। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ায় এবং নেতৃত্ব দেওয়ায় মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিকভাবে কয়েন করতে পারে এই ধরনের একমাত্র দল বিএনপি। আর আমি মনে করি, সেটাই বিএনপি করেছে।’

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘এই অধিবেশনে মনে হয়েছে আমরা ক্রমান্বয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অতীত অভিজ্ঞতার দিকে যাচ্ছি। জুলাই সনদ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে সরকারি দলের অবস্থান একটি ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী সংসদের আলামত দেখা যাচ্ছে। সংসদে বিএনপির অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে তারা এক সময়কার জোটসঙ্গীর সঙ্গে প্রতারণা করছে।’

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধ ইস্যু প্রশ্নে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় গত ৫৪ বছর দেশকে বিভক্ত করে রাখা হয়েছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে মনে হয়েছিল অতীতের বিভাজন ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ এগিয়ে যাবে। কিন্তু সংসদে দেখা গেলে বিএনপি বিভাজনকেই জিইয়ে রাখতে চায়। ফ্যাসিস্ট আমলের গত সাড়ে ১৫ বছরের সংসদে মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তর ইস্যুতে যেভাবে বিএনপি-জামায়াতকে আক্রমণ করা হতো, এখন দেখছি জামায়াতকে টার্গেট করে বিএনপি উদ্দেশ্যমূলকভাবে একই ধারায় চলছে। এটি কাম্য নয়।