তুরাগ নদীতে ৭ লাশ উদ্ধারের বিষয়টি গুজব, যা ঘটেছিলো সেদিন!
- আপডেট সময় ০৯:৪৭:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
- / ২৬ বার পড়া হয়েছে
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং দলটির প্রতি অনুগত অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা গতকাল রাত থেকে ফেসবুকে দাবি করছেন, গত ২২ জুন ঢাকার তুরাগ নদী থেকে ৪ জন ছাত্রলীগ কর্মীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আরও ৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তারা দাবি করেছেন, এসব ছাত্রলীগ কর্মীকে নাকি ‘কিছুদিন আগে দলীয় কর্মসূচি শেষ করে ফেরার পথে নৌ পুলিশ এবং বিএনপির নেতাকর্মীরা মিলে মব করে’ ৭ জনকে নদীতে ফেলে দেন। কথিত এই ঘটনাকে ‘তুরাগ হত্যাকাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে চালানো হচ্ছে অনলাইন ক্যাম্পেইন। ভিন্ন ঘটনার একাধিক ভিডিওকে ‘তুরাগ হত্যাকাণ্ডের ভিডিও’ বলেও প্রচার করা হচ্ছে। এই উপলক্ষে আবেগী ভাষায় কবিতা/ছড়া/গানও তৈরি করে ছাড়া হয়েছে।
তুরাগে কী ঘটেছিল সেদিন?
দ্য ডিসেন্ট জানার চেষ্টা করেছে ‘তুরাগ হত্যাকাণ্ড’ বলে আওয়ামী লীগের প্রচার চালানো ঘটনাটি আসলে কী? আদৌ কি তুরাগ নদীতে বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলার কোনো ঘটনা ঘটেছিল? এবং সেখান থেকে ৭ জন নিখোঁজ ও ‘৩/৪ জনের’ লাশ উদ্ধারের যে দাবি করা হয়েছে সেগুলো কি সঠিক?
এ সম্পর্কে জানতে দ্য ডিসেন্ট তুরাগ, আশুলিয়া থানার পুলিশ, আশুলিয়া অঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিক, স্থানীয় বাসিন্দা, আওয়ামী লীগের অনলাইন ক্যাম্পেইনে অংশ নেওয়া অ্যাক্টিভিস্ট, শেখ হাসিনা সরকারে দায়িত্ব পালন করা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, এবং আলোচ্য ঘটনা সম্পর্কে অবগত জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া একজন অ্যাক্টিভিস্টসহ বেশ কিছু ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে এবং অনলাইনে পাওয়া বেশ কিছু ফুটেজ বিশ্লেষণ করেছে।
প্রথমত, আশুলিয়া ও তুরাগ থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২২ জুন তুরাগ নদীতে পুলিশ এবং বিএনপির যৌথ হামলার পর আওয়ামী লীগের কয়েকজনকে নদীতে ফেলে দেওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনারা কি ওই এলাকায় নদীতে আওয়ামী লীগের কারও ডুবে যাওয়ার বা পানিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনা জানেন কি না? কিংবা কোনো লাশ উদ্ধার করেছেন কি না?”
তিনি বলেছেন, এ রকম কোনো ঘটনা তাদের জানা নেই। সুমন নামে একজন তরুণের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে যিনি ‘বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে গিয়ে ট্রলার থেকে পড়ে মারা গিয়ে থাকতে পারেন’ বলেও জানান ওসি।
তবে তিনি জানান, মিছিল করার চেষ্টার সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাতজনকে ২২ জুন বিকাল ৩টার দিকে আশুলিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান।
এ সংক্রান্ত একটি খবরও অনলাইনে পাওয়া গেছে বাংলাদেশ প্রতিদিনে। ২৩ জুন দুপুরে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাভার ও আশুলিয়া থেকে ৭ জন করে মোট চৌদ্দজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময়টি অবশ্য স্পষ্ট করা হয়নি প্রতিবেদনে।
তবে দ্য ডিসেন্টকে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং জুলাইপন্থী একটি প্ল্যাটফর্মের নেতা একজন তরুণ অ্যাক্টিভিস্ট জানিয়েছেন কিছুটা ভিন্ন তথ্য।
তিনি এবং তার সংগঠন জুলাই আন্দোলনে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মীরা অস্ত্রসহ সক্রিয় ছিলেন ও ছাত্রদের ওপর গুলি করেছেন তাদের অনেকের পরিচয় সংগ্রহ করে রেখেছেন। নতুন করে কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগের কেউ গ্রেপ্তার হলে সেসব পরিচয় যাচাই করে অভিযুক্ত কাউকে পেলে তাদেরকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টিতে আনার চেষ্টা করেন।
আশুলিয়া ও সাভার থেকে আওয়ামী লীগের ১৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছে খবর শুনে ওইদিনই তিনি ওই এলাকাগুলো দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন একজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার কাছ থেকেই ২২ জুন দুপুরের দিকে আশুলিয়ার বাসস্ট্যান্ড এলাকার নতুন গরুর হাটের পাশের ট্রলার ঘাট থেকে গ্রেপ্তার করা ৭ জনের ঘটনা শুনতে পান।
ওই পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে দ্য ডিসেন্ট কথা বলতে চাইলেও তিনি রাজি হননি।
জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ঐ তরুণের ভাষ্য মতে, ওই কর্মকর্তা তাকে জানিয়েছিলেন, ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কর্মসূচি পালনের শপথমূলক বিভিন্ন ভিডিও ২১ জুন থেকে অনলাইনে ছড়ানো শুরু হলে দেশের অন্যান্য জায়গার মতো আশুলিয়া ও তুরাগ থানা পুলিশও টহল শুরু করে। ২২ জুন এমন টহলরত অবস্থায় পুলিশ দেখতে পায়, আশুলিয়ার বাসস্ট্যান্ড এলাকার নতুন গরুর হাটের পাশের ট্রলার ঘাটে একটি ট্রলার থেকে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী নেমে মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তখন পুলিশের একটি টিম তাদের ধরতে উদ্যত হলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা দৌড়ে আবার ট্রলারে ওঠার চেষ্টা করেন। পুলিশ দেখে ট্রলার নিয়ে পালাচ্ছিলেন মিছিল করতে আসা আ.লীগ নেতাকর্মীরা। তখন অনেকে দৌড়ে ট্রলারে ওঠতে সক্ষম হন এবং নৌযানটি চালু করে ঘাট থেকে বের হয়ে যান। তবে কেউ কেউ লাফিয়ে ট্রলারে উঠতে গিয়ে নদীতে পড়ে যান। তাদের কয়েকজন ট্রলার ধরতে ব্যর্থ হয়ে পাড়ে ফিরে আসতে চাইলে পুলিশ তাদেরকে সহায়তা করে এবং ওঠার পর গ্রেপ্তার করে। তবে নদীতে যারা নেমেছিলেন তাদের সবাই কি তীরে ফিরে এসেছিলেন বা ট্রলারে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন সে বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত হতে পারেনি। এরপর পুলিশ গ্রেপ্তার করা ৭ জনকে নিয়ে থানায় যায়।
এই বর্ণনায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের হামলার কোন বিবরণ পাওয়া যায়নি।
আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুলকে এই বর্ণনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ২২ জুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা (ট্রলার ঘাটের নিকটবর্তী) থেকে সাতজনকে গ্রেফতার করার সময় পানিতে পড়ে কারো মারা যাওয়ার ঘটনা তার জানা নেই।
স্থানীয় ট্রলার ঘাটে ২২ জুনের ঘটনার কোন প্রত্যক্ষদর্শীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঘাট থেকে একটু ভেতরের বেশ কয়েকজন দোকানির সাথে কথা বললে তারা বলেছেন, ঘাট থেকে তাদের দোকান একটু দূরে হওয়ায় ওখানে কী ঘটেছে তা তাদের জানার সুযোগ হয়নি।
এর পরদিন থানা থেকে তোলা একটি ছবি ফেসবুকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওয়ালে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায় সাতজন ব্যক্তিকে হাতকড়া পরা অবস্থায় ছবি তুলছেন পুলিশ সদস্যরা।

এই সাতজনের মধ্যে অন্তত ৩ জনকে দ্য ডিসেন্ট চিহ্নিত করেছে যাদেরকে অনলাইনে ছড়ানো আওয়ামী লীগের শপথ গ্রহণের একটি ভিডিওতে (২১ জুন দিনে অথবা ২২ জুন দুপুরের আগে ধারণ করা) দেখা গিয়েছিল। ওই ভিডিওটি একটি ট্রলারে ধারণ করা।
ছবির ওই সাতজনের মধ্যে দুইজনকে দ্য ডিসেন্টের সঙ্গে কথা বলা জুলাইপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময়ের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেন, যাদেরকে ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান।
ওসি তরিকুলকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেছেন, তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা থাকলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লাশ উদ্ধার হওয়া সুমনকে ট্রলারে শপথ গ্রহণের ওই ভিডিওতে দেখা গেছে
এদিকে ২৬ জুন রাতে পুলিশ আশুলিয়ার তুরাগ নদী থেকে একটি লাশ উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত ব্যক্তির নাম মো. সুমন এবং বয়স ১৭ বলে জানায় পুলিশ।
পুলিশ জানায়, লাশটি আশুলিয়া বাজার এলাকায় গরুর হাটের ট্রলার ঘাট এলাকার তুরাগ নদে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
উল্লেখ্য, এই ঘাটেই ২২ জুন ট্রলার থেকে নেমে মিছিলের চেষ্টার করার সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ট্রলার নিয়ে পালিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ কর্মীরা।
পুলিশ জানিয়েছে, মৃত সুমন ঢাকার তুরাগ থানাধীন রানাভোলা এলাকার শাহ আলমের ছেলে। তিনি স্থানীয় একটি আড়তে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমন সাঁতার জানতেন না। তিনি বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিক করতে ট্রলারে করে তুরাগ নদে গিয়েছিলেন। সে সময় ট্রলার থেকে নদীতে নামার সময় পড়ে গিয়ে তলিয়ে যান। এরপর থেকেই তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে স্থানীয়রা নদীতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে ৯৯৯-এ ফোন করেন। পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের পকেট থেকে একটি মুঠোফোন পাওয়া যায়। ওই ফোনের সিম ব্যবহার করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা সুমনের মরদেহ শনাক্ত করেন।
আওয়ামী লীগ অনলাইন ক্যাম্পেইনে সুমনকে তাদের কর্মী বলে দাবি করেছে এবং দ্য ডিসেন্ট সুমনের ফেসবুক প্রোফাইল ঘেঁটে দেখেছে তিনি নিয়মিত আওয়ামী লীগের পক্ষে অনলাইনে লেখালেখি করতেন। এবং তার প্রোফাইলে নিজের পোস্ট করা একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে তিনি সম্প্রতি আওয়ামী লীগ/ছাত্রলীগের ব্যানারে মিছিলে অংশ নিয়েছেন। এসব মিছিলে অংশ নেয়া তার একাধিক সহযোগীকে ট্রলারে দাঁড়িয়ে শপথ নেয়ার ভিডিওতেও দেখা গেছে। এই শপথের ভিডিওতে– যেটি ২১ জুন দিনে বা ২২ জুন দুপুরের আগে ধারণ করা– সুমনকে হাত তুলে শপথে অংশ নিতে দেখা গেছে।

সুমন তার প্রোফাইলে ১৯ জুন একটি ভিডিও পোস্ট করেন যেখানে দেখা যায় নদীর (যথাসম্ভব তুরাগ নদী) ঘাটে একটি ট্রলার ভেড়ানো এবং ট্রলারের ওপর এবং ঘাটে ১৫/২০ জন তরুণ হাঁটাহাটি করছেন। ট্রলারের ছাদে তখন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে তুরাগ থানা শ্রমিক লীগ সভাপতি মামুন সরকারকে, যিনি ২২ জুনের ঘটনার পর ‘নিখোঁজ’ আছেন বলে আওয়ামী লীগের অনলাইন ক্যাম্পেইনে দাবি করা হয়েছে।
অর্থাৎ ১৯ জুন থেকে ২২ জুন পর্যন্ত সময়ে একাধিকবার সুমনের ট্রলারে অবস্থানের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এরপর ২২ জুন আশুলিয়া বাসস্ট্যান্ডের কাছের ঘাটে ট্রলার ভেড়ানোর পর পুলিশের ভয়ে সেখান থেকে পালানো এবং কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মী নদীতে লাফিয়ে পড়ার (যাদের সাতজনই পরে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার হোন) ৪ দিন পর ওই ঘাট এলাকা থেকেই সুমনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
৩/৪টি লাশ উদ্ধারের কোনো প্রমাণ নেই, ছড়ানো হচ্ছে ভুয়া ভিডিও
এই ঘটনায় ফেসবুকে আওয়ামীপন্থী অ্যাকাউন্ট এবং পেজগুলো থেকে ভিন্ন ভিন্ন দাবি করা হচ্ছে। কোথাও তিনজন নিহত, কোথাও ৪ জন আবার কোথাওবা ৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল পেইজ থেকে ছাত্রলীগের নামে ২৬ জুন রাতে পোস্ট করা একটি বিবৃতির শিরোনাম ছিল, “তুরাগ ও মেহেন্দিগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলকে কেন্দ্র করে বর্বর হত্যাযজ্ঞ ও গুমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের হুঁশিয়ারি।”
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই বাংলাদেশে আজ উৎসবের মিছিলে হাঁটাও অপরাধ, আর সেই অপরাধের শাস্তি মৃত্যু। এর চেয়ে ভয়াবহ সত্য, এর চেয়ে নগ্ন বর্বরতা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ইতিহাসে বিরল। গত ২২ ও ২৩ জুন মাত্র দুটি দিনে, দেশের দুই প্রান্তে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিল থেকে সাতজন তরুণ আর ঘরে ফেরেননি এবং তাঁদের মধ্যে তিনজনের অর্ধগলিত মরদেহ তুলে আনতে হয়েছে নদীর তলদেশ থেকে, বাকি চারজন এখনো নিখোঁজ। এটি সংঘর্ষ নয়, দাঙ্গা নয়, এটি পরিকল্পিত, ঠান্ডা মাথার গণহত্যা, যার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের নির্লজ্জ সম্মতি ও প্রশ্রয়।”
অর্থাৎ, ২২ ও ২৩ জুন দুই দিনে তুরাগ ও বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে দুটি ঘটনায় ছাত্রলীগের ৭ জন নিহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে এখানে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের একই পেইজ থেকে সাবেক এমপি মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের একটি পোস্ট শেয়ার করা হয়েছে যেখানে নওফেল শুধু তুরাগে হামলায় তিনজন নিহত এবং ৪ জন নিখোঁজের দাবি করেছেন।
আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট পেজগুলোতে নিহত হিসেবে তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন—সুমন আহমেদ, আরিফুল ইসলাম আরিফ এবং বিপ্লব। পোস্টগুলোতে সুমন ও আরিফুলকে ছাত্রলীগ কর্মী এবং বিপ্লবকে কখনো ছাত্রলীগ কর্মী, কখনো ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরেকটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে দুজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন—মো. মামুন সরকার, বয়স ৩০, সভাপতি, তুরাগ থানা শ্রমিক লীগ, বাসা নলভোগ, ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড; এবং ইমরান, বাঞ্ছারামপুর উপজেলা।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের অ্যাক্টিভিস্ট NahidRains এক ভিডিওতে দাবি করেন তুরাগ নদীতে ৭ জনকে মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের আরেক এক্টিভিস্ট অমি রহমান পিয়ালও তুরাগ নদীতে ৭টি লাশ ভেসে থাকার কথা বলেছেন।
ঢাকা জেলা দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি গিয়াসুদ্দিন সোহাগ এক পোস্টে দাবি করেছেন, “ছাত্রলীগের রক্তে রঞ্জিত তুরাগ নদী, ৪ জনের লাশ উদ্ধার ৩ জন এখনো নিখোঁজ।”
আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা আউটলেট আজকের কণ্ঠ ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়েছে, “তুরাগ নদী থেকে ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং বাকি ৩ জনের সন্ধানে তল্লাশি চলছে।”
তবে তাদের কেউই সুমন ছাড়া অন্য কারো লাশ উদ্ধার হওয়ার তথ্য দিতে পারেন নি।
এ বিষয়ে পতিত শেখ হাসিনা সরকারের একজন উর্ধ্বতন কর্মকতা যিনি এই ইস্যুতে ৭জন নিহতের একাধিক পোস্ট করেছেন, জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, সুমন ছাড়া অন্য কারো উদ্ধার করা লাশের বিস্তারিত তথ্য আছে কিনা?
জবাবে তিনি বলেন, “ঘটনা সত্য। এখনো ৪জন নিখোঁজ। কোথায় আছে কেউ জানে না। তবে যাদের লাশ পাওয়া গেছে। তাদের বাড়িতে বাড়িতে সরকারের লোকজন গেছে। মুখ না খোলার জন্য হুমকি দিয়ে আসছে। এইসব কথা স্থানীয় (সূত্র) থেকে আমার শোনা। সত্য কিনা আমি নিজেও জানি না।’
শুধু নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তিকর দাবি নয়, তুরাগে হত্যাকাণ্ড দেখাতে একের পর এক এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে।
ডাকসু ভিপি প্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি একটি এআই জেনারেটেড ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, “লাশের মিছিল আরও লম্বা হওয়ার আগেই আমাদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।”
এছাড়াও, তুরাগ নদীতে ছাত্রলীগ নেতা সুমনের লাশ ভেসে যাচ্ছে দাবিতে ছড়িয়েছে সিলেটের গোলাপগঞ্জে সুরমা নদীতে ‘অজ্ঞাত ব্যক্তির’ লা’শের ভিডিও।
নদী থেকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের লাশ উদ্ধারের প্রমাণ হিসেবে আরেকটি ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে যেখানে দেখা যাচ্ছে অন্তত ৮ অথবা ৯ জনের নিথর দেহ একটি জলাশয়ের (নদী অথবা বিল) পাড়ে পড়ে আছে। পাশে ইউনিফর্ম পরা একজন ব্যক্তিকেও দেখা যাচ্ছে।
দ্য ডিসেন্ট এখনো ভিডিওটির মূল উৎস শনাক্ত করতে পারেনি। তবে, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে তিন বা চারজনের ‘অর্ধগলিত লাশ’ এর যে বিবরণ প্রচার করা হচ্ছে সেটির সঙ্গে আলোচ্য ভিডিওর মিল নেই।
ফলে, ভিডিওটি ভিন্ন ঘটনার বলে প্রতীয়মান হয়।
গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট যা বলছে
এদিকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ একটি তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়েছে দ্য ডিসেন্ট। তাতে দেখা যাচ্ছে, সুমন ও আরিফ নামে দুইজন আওয়ামী লীগ কর্মীর ওই দিন পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে লেখা হয়েছে, “গত ২২/০৬/২০২৬ খ্রিঃ তারিখ আনুমানিক ১৪:৩০ হতে ১৫:০০ ঘটিকার মধ্যে তুরাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিক-এর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৫-৩০ জন নেতাকর্মী নৌকাযোগে আশুলিয়ার রুস্তমপুর ঘাট হতে আশুলিয়া বাজার ঘাটে মিছিল করার উদ্দেশ্যে আসে। এ কার্যক্রমে তুরাগের নলভোগ এলাকার আওয়ামীলীগ নেতা কফিল উদ্দিন মেম্বার এবং রানাভোলা এলাকার মামুন সার্বিক সহযোগিতা ও মদদ প্রদান করেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়।
উক্ত নেতাকর্মীরা রস্তুমপুর ঘাট থেকে একটি নৌকায় করে আশুলিয়া বাজার ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তারা ঘাটে পৌঁছে নৌকা থেকে নামার চেষ্টা করলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ধাওয়া করে। এ সময় তারা দ্রুত পুনরায় নৌকায় উঠে পালানোর চেষ্টা করে। তবে তাড়াহুড়োর কারণে নৌকার নোঙর তুলতে ব্যর্থ হয়।
পুলিশ নৌকার নোঙর ধরে ফেললে নৌকায় থাকা নেতাকর্মীরা আতঙ্কিত হয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয়। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মোট ০৭ (সাত) জনকে আটক করে। অপররা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় ০২ (দুই) জন পানিতে তলিয়ে যায় যা তাৎক্ষণিকভাবে কেউই জানতে পারে নাই । পরদিন ২৩/০৬/২০২৬ খ্রিঃ তারিখে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।পানিতে তলিয়ে থাকার কারণে মরদেহগুলো বিকৃত হয়ে যায়। উদ্ধারকৃত মৃত ব্যক্তিদের পরিচয় নিম্নরূপঃ
১। সুমন – ঠিকানা: তুরাগ, ঢাকা।
২। মোঃ আরিফুল ইসলাম, পিতা- আব্দুল হাই, গ্রাম- আরিজর হরিশ্বর, পোস্ট/থানা- কাউনিয়া, জেলা- রংপুর।
এছাড়াও প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ঘটনার পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আরও কয়েকজনের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার দাবি করে প্রচার করা হচ্ছে। তবে স্বশরীরে তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কথা বলে অতিরিক্ত কোনো মরদেহ উদ্ধার কিংবা অধিকসংখ্যক ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।



















