ঢাকা ০৮:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণে নজর বাংলাদেশ ব্যাংকের

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ০৩:৪৫:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২১ বার পড়া হয়েছে

খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি—এমন প্রায় ৪২টি ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ঋণের মধ্যে যেগুলোর অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করে অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রোববার (৯ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে যারা খেলাপি হয়েছেন, তাদের মধ্যে কিছু ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। আবার কিছু ঋণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক বা ঋণগ্রহীতাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ধরনের ঋণের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আরিফ হোসেন খান বলেন, এসব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন ৮টি আইনি প্রতিষ্ঠান বা লিগ্যাল ফার্মের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যে দেশগুলোতে অর্থ পাচার হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সেসব দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে অর্থ পাচার ও খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়টি দুটি আলাদা প্রক্রিয়া। ব্যাংকের হিসাবে ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ না করলে সেটি খেলাপি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। ব্যাংক প্রচলিত নিয়মে ওই ঋণ আদায়ের চেষ্টা করবে। আর যদি দেখা যায়, ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, তাহলে সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। তিনি বলেন, দুটি প্রক্রিয়া আলাদা হলেও শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য একই—খেলাপি ঋণের অর্থ আদায় করা এবং বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব ঋণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অথবা ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মুখপাত্র বলেন, সাধারণভাবে কোনো ব্যবসা লোকসানে পড়লে বা ব্যবসায়িক কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণখেলাপি হতে পারে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসার নামে ঋণ নেওয়া হলেও বাস্তবে সেই ব্যবসার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। আবার ঋণের অর্থ দেশের বাইরে চলে গেছে—এমন ঘটনাও রয়েছে।

এ ধরনের ঘটনাকে সাধারণ খেলাপি ঋণের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই বলে তিনি জানান।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সফলতার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের সঙ্গে কাজ করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজের শুরুতে কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হবে না। তারা যদি পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়, তাহলে তাদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে উদ্ধার হওয়া অর্থের একটি অংশ আনুপাতিক হারে পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, একই ধরনের প্রক্রিয়া বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে, সেসব অর্থ উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি ব্যবস্থার আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম দফায় ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করেছে, যাদের মাধ্যমে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক ও আইনি—দুই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সহজ কোনো প্রক্রিয়া নয়। যে দেশে অর্থ গেছে, সেই দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন ও অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে যদি ঋণের অর্থ বিদেশে পাচারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে শুধু ব্যাংকের প্রচলিত ঋণ আদায় প্রক্রিয়ায় আটকে না থেকে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াতেও যেতে হবে। এর মাধ্যমে একদিকে ব্যাংকের পাওনা আদায় এবং অন্যদিকে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার সুযোগ তৈরি হবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণে নজর বাংলাদেশ ব্যাংকের

আপডেট সময় ০৩:৪৫:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি—এমন প্রায় ৪২টি ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ঋণের মধ্যে যেগুলোর অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করে অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রোববার (৯ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে যারা খেলাপি হয়েছেন, তাদের মধ্যে কিছু ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। আবার কিছু ঋণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক বা ঋণগ্রহীতাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ ধরনের ঋণের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আরিফ হোসেন খান বলেন, এসব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন ৮টি আইনি প্রতিষ্ঠান বা লিগ্যাল ফার্মের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যে দেশগুলোতে অর্থ পাচার হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সেসব দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে অর্থ পাচার ও খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়টি দুটি আলাদা প্রক্রিয়া। ব্যাংকের হিসাবে ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ না করলে সেটি খেলাপি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। ব্যাংক প্রচলিত নিয়মে ওই ঋণ আদায়ের চেষ্টা করবে। আর যদি দেখা যায়, ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, তাহলে সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। তিনি বলেন, দুটি প্রক্রিয়া আলাদা হলেও শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য একই—খেলাপি ঋণের অর্থ আদায় করা এবং বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব ঋণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অথবা ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মুখপাত্র বলেন, সাধারণভাবে কোনো ব্যবসা লোকসানে পড়লে বা ব্যবসায়িক কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণখেলাপি হতে পারে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসার নামে ঋণ নেওয়া হলেও বাস্তবে সেই ব্যবসার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। আবার ঋণের অর্থ দেশের বাইরে চলে গেছে—এমন ঘটনাও রয়েছে।

এ ধরনের ঘটনাকে সাধারণ খেলাপি ঋণের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই বলে তিনি জানান।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সফলতার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের সঙ্গে কাজ করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজের শুরুতে কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হবে না। তারা যদি পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়, তাহলে তাদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে উদ্ধার হওয়া অর্থের একটি অংশ আনুপাতিক হারে পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, একই ধরনের প্রক্রিয়া বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে, সেসব অর্থ উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি ব্যবস্থার আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম দফায় ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করেছে, যাদের মাধ্যমে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক ও আইনি—দুই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সহজ কোনো প্রক্রিয়া নয়। যে দেশে অর্থ গেছে, সেই দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন ও অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে যদি ঋণের অর্থ বিদেশে পাচারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে শুধু ব্যাংকের প্রচলিত ঋণ আদায় প্রক্রিয়ায় আটকে না থেকে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াতেও যেতে হবে। এর মাধ্যমে একদিকে ব্যাংকের পাওনা আদায় এবং অন্যদিকে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার সুযোগ তৈরি হবে।