ঢাকা ০৬:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজে নতুন একটি ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ তৈরির ঘোষণা ইরানের

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০১:১৪:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২২ বার পড়া হয়েছে

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নতুন ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে। প্রণালির কাছে নতুন একটি ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ তৈরির ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। ওই এলাকায় ঢুকলেই জাহাজকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় তোলার হুমকি দিয়েছে দেশটি।

এর মধ্যেই হরমুজে দুই দেশের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের মুখে ইরান জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে আরো কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। ফলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি করিডর ঘিরে সংঘাত আরো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ পরিস্থিতিকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে দেখছেন।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নতুন নিষিদ্ধ অঞ্চলের ঘোষণা দেওয়া হবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, অঞ্চলটি শুরু হবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের সীমারেখা থেকে। এরপর তা হরমুজ প্রণালির দিকে এবং সেখান থেকে পারস্য উপসাগরের কিছু অংশে বিস্তৃত হবে।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নতুন এই অঞ্চলে ঢুকলেই সংশ্লিষ্ট জাহাজকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখা হবে। তবে অঞ্চলটির সুনির্দিষ্ট সীমানা কী হবে, নিষেধাজ্ঞার অর্থ কী এবং তা কীভাবে কার্যকর করা হবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানায়নি তেহরান।

নিষিদ্ধ অঞ্চলের ঘোষণার সঙ্গে হরমুজ প্রণালি নিয়েও কঠোর বার্তা দিয়েছেন রেজায়ি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘নাশকতা, হুমকি ও হামলা’ বন্ধ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার নিশ্চয়তা দেবে না ইরান।

একই সঙ্গে ওমানের সঙ্গে মিলে হরমুজের জন্য নতুন একটি আন্তর্জাতিক নৌপথের মানচিত্র তৈরির কথা জানিয়েছেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান ও ওমানের সমুদ্রসীমার মধ্য দিয়ে যাওয়া এই করিডরে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকবে ইরানের। এ বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চুক্তিতে সই হওয়ার কথা।

এর আগে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছিলেন, হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য ওমানের সঙ্গে একটি সাময়িক নৌপথে সমঝোতা হয়েছে। ওই পথের প্রবেশ এবং বের হওয়ার একটি অংশ ইরানের সমুদ্রসীমার মধ্য দিয়ে যাবে।

হরমুজ ঘিরে উত্তেজনা এরই মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতে গড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। জবাবে ইরান ট্যাংকারে হামলা করেছে। হরমুজের কাছে টহলরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ছুড়েছে তেহরান।

ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাহাজ তেহরানের নির্ধারিত নিষিদ্ধ এলাকায় ঢোকার চেষ্টা করেছিল এবং সেটিতে হামলা চালানো হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এ দাবি ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

হরমুজে জাহাজ চলাচলের পথ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ নতুন নয়। এপ্রিলেই ইরান নিজেদের অনুমোদিত নৌপথের মানচিত্র প্রকাশ করেছিল। ওই পথ আগের তুলনায় ইরানের উপকূলের অনেক কাছ দিয়ে গেছে।

কিন্তু ইরানের এই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পাল্টা উদ্যোগ নেয় ওমান। জুনে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) সঙ্গে কাজ করে ওমান হরমুজের দক্ষিণ অংশে একটি বিকল্প নৌকরিডর নির্ধারণ করে। উদ্দেশ্য ছিল প্রণালিতে নিরাপদে জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনা।

লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ট্যাংকার ‘স্টোয়িক ওয়ারিয়র’ ওই বিকল্প পথে চলাচল করে। জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের উপকূল ঘেঁষে মুসান্দাম উপদ্বীপের পাশ দিয়ে যায়।

এতে ক্ষুব্ধ হয় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) । তাদের ঘোষণা ছিল, ইরানের অনুমোদিত পথই হরমুজের ‘একমাত্র অনুমোদিত নৌপথ’। অনুমতি ছাড়া অন্য পথে যাওয়া জাহাজকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও অত্যন্ত বিপজ্জনক’ পরিণতির মুখে পড়তে হবে বলে সতর্ক করে তারা।

১৭ জুন জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছিল। এর পর হরমুজে জাহাজ চলাচল বাড়ে।

সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা ছিল। আর ইরানের দায়িত্ব ছিল হরমুজ থেকে মাইন সরানো এবং ৬০ দিন কোনো মাশুল ছাড়াই জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়া।

কিন্তু ৬০ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে আবার হামলা শুরু হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে কমে যায়।

হরমুজ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। জাহাজ চলাচল অব্যাহত আছে। কিন্তু যুদ্ধের আগের তুলনায় তা অনেক কম।

সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ দিয়ে যেত। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৯০ লাখের বেশি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যাচ্ছে। বিকল্প পাইপলাইনসহ মোট প্রবাহ যুদ্ধের আগের তুলনায় দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি বলে তার দাবি।

যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, রোববার শেষ হওয়া ৪৮ ঘণ্টায় ৫৯টি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে।

কিন্তু সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী অন্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য আরো সংকটের চিত্র দেখাচ্ছে। গত বুধবার মাত্র ছয়টি, মঙ্গলবার ১১টি এবং সোমবার পাঁচটি জাহাজ প্রণালিটি পার হয়েছে। ১০ দিনের হিসাবে প্রতিদিন গড়ে চলাচল করেছে ১৩টি জাহাজ।

সামুদ্রিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, গত ১০ দিনে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ পার হয়েছে। মে মাসের পর এটিই সর্বনিম্ন।

যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ১৩০টির বেশি জাহাজ হরমুজ দিয়ে চলাচল করত। এখন সেই পথ কার্যত যুদ্ধের অন্যতম প্রধান চাপের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। হরমুজকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলার সক্ষমতা ইরান ইতোমধ্যে দেখিয়েছে। মার্চ থেকে সেখানে অসংখ্য জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। নিহত হয়েছেন অন্তত ১৯ জন নাবিক।

কিন্তু আরো বিস্তৃত একটি নিষিদ্ধ অঞ্চল সামরিকভাবে কার্যকর করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বিশেষ করে ওই অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর সুরক্ষায় থাকা জাহাজ প্রবেশ করলে ইরান কতটা প্রতিরোধ গড়তে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান স্টিফেন জুনস মনে করেন, ইরানের পক্ষে এ ধরনের অঞ্চল কার্যকর করা কঠিন হবে।

তার মতে, অঞ্চলটি কার্যকর করতে ইরানের যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানকে মাঠে নামতে হবে। কিন্তু সেগুলো মার্কিন হামলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।

তবে জুনস মনে করেন, এটি হয়তো ইরানের একটি সতর্কবার্তাও হতে পারে। জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোঝানো হচ্ছে—তেহরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ দিয়ে গেলে পার হতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়তে হবে।

জুনসের মতে, ইরান হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে আরো বড় সামরিক প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। এতে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার যুক্তি তৈরি হতে পারে।

এর রাজনৈতিক সুবিধাও পেতে পারে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে জনমত রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের ভেতরে বাড়ছে অর্থনৈতিক সংকট। এমন পরিস্থিতিতে বাইরের সামরিক চাপ জনগণকে সরকারের পক্ষে আরো ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।

তবে হরমুজের নতুন নিষিদ্ধ অঞ্চল শুধু সামরিক হুমকি কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ওমানের সঙ্গে ইরানের নৌপথ নিয়ে চলমান আলোচনার সঙ্গেও এর যোগ থাকতে পারে বলে মনে করেন জুনস।

ওমানের সঙ্গে সমঝোতা কার্যকর হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেয়, তাহলে ইরান নিষিদ্ধ অঞ্চল কার্যকর করা থেকে পিছিয়ে আসতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি ওই সমঝোতা মেনে না নেয়, তাহলে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য তেহরানের হাতে থাকবে নতুন একটি হাতিয়ার।

ফলে হরমুজ এখন শুধু তেল পরিবহনের পথ নয়। এটি হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সামরিক সংঘাতের অন্যতম প্রধান মঞ্চ। আর ইরানের নতুন নিষিদ্ধ অঞ্চল বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তার ওপর নির্ভর করতে পারে এই সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ।

নিউজটি শেয়ার করুন

হরমুজে নতুন একটি ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ তৈরির ঘোষণা ইরানের

আপডেট সময় ০১:১৪:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নতুন ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে। প্রণালির কাছে নতুন একটি ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ তৈরির ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। ওই এলাকায় ঢুকলেই জাহাজকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় তোলার হুমকি দিয়েছে দেশটি।

এর মধ্যেই হরমুজে দুই দেশের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের মুখে ইরান জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে আরো কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। ফলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি করিডর ঘিরে সংঘাত আরো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ পরিস্থিতিকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে দেখছেন।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নতুন নিষিদ্ধ অঞ্চলের ঘোষণা দেওয়া হবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, অঞ্চলটি শুরু হবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের সীমারেখা থেকে। এরপর তা হরমুজ প্রণালির দিকে এবং সেখান থেকে পারস্য উপসাগরের কিছু অংশে বিস্তৃত হবে।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নতুন এই অঞ্চলে ঢুকলেই সংশ্লিষ্ট জাহাজকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখা হবে। তবে অঞ্চলটির সুনির্দিষ্ট সীমানা কী হবে, নিষেধাজ্ঞার অর্থ কী এবং তা কীভাবে কার্যকর করা হবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানায়নি তেহরান।

নিষিদ্ধ অঞ্চলের ঘোষণার সঙ্গে হরমুজ প্রণালি নিয়েও কঠোর বার্তা দিয়েছেন রেজায়ি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘নাশকতা, হুমকি ও হামলা’ বন্ধ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার নিশ্চয়তা দেবে না ইরান।

একই সঙ্গে ওমানের সঙ্গে মিলে হরমুজের জন্য নতুন একটি আন্তর্জাতিক নৌপথের মানচিত্র তৈরির কথা জানিয়েছেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান ও ওমানের সমুদ্রসীমার মধ্য দিয়ে যাওয়া এই করিডরে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকবে ইরানের। এ বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চুক্তিতে সই হওয়ার কথা।

এর আগে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছিলেন, হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য ওমানের সঙ্গে একটি সাময়িক নৌপথে সমঝোতা হয়েছে। ওই পথের প্রবেশ এবং বের হওয়ার একটি অংশ ইরানের সমুদ্রসীমার মধ্য দিয়ে যাবে।

হরমুজ ঘিরে উত্তেজনা এরই মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতে গড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। জবাবে ইরান ট্যাংকারে হামলা করেছে। হরমুজের কাছে টহলরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ছুড়েছে তেহরান।

ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাহাজ তেহরানের নির্ধারিত নিষিদ্ধ এলাকায় ঢোকার চেষ্টা করেছিল এবং সেটিতে হামলা চালানো হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এ দাবি ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

হরমুজে জাহাজ চলাচলের পথ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ নতুন নয়। এপ্রিলেই ইরান নিজেদের অনুমোদিত নৌপথের মানচিত্র প্রকাশ করেছিল। ওই পথ আগের তুলনায় ইরানের উপকূলের অনেক কাছ দিয়ে গেছে।

কিন্তু ইরানের এই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পাল্টা উদ্যোগ নেয় ওমান। জুনে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) সঙ্গে কাজ করে ওমান হরমুজের দক্ষিণ অংশে একটি বিকল্প নৌকরিডর নির্ধারণ করে। উদ্দেশ্য ছিল প্রণালিতে নিরাপদে জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনা।

লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ট্যাংকার ‘স্টোয়িক ওয়ারিয়র’ ওই বিকল্প পথে চলাচল করে। জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের উপকূল ঘেঁষে মুসান্দাম উপদ্বীপের পাশ দিয়ে যায়।

এতে ক্ষুব্ধ হয় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) । তাদের ঘোষণা ছিল, ইরানের অনুমোদিত পথই হরমুজের ‘একমাত্র অনুমোদিত নৌপথ’। অনুমতি ছাড়া অন্য পথে যাওয়া জাহাজকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও অত্যন্ত বিপজ্জনক’ পরিণতির মুখে পড়তে হবে বলে সতর্ক করে তারা।

১৭ জুন জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছিল। এর পর হরমুজে জাহাজ চলাচল বাড়ে।

সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা ছিল। আর ইরানের দায়িত্ব ছিল হরমুজ থেকে মাইন সরানো এবং ৬০ দিন কোনো মাশুল ছাড়াই জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়া।

কিন্তু ৬০ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে আবার হামলা শুরু হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে কমে যায়।

হরমুজ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। জাহাজ চলাচল অব্যাহত আছে। কিন্তু যুদ্ধের আগের তুলনায় তা অনেক কম।

সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ দিয়ে যেত। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৯০ লাখের বেশি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যাচ্ছে। বিকল্প পাইপলাইনসহ মোট প্রবাহ যুদ্ধের আগের তুলনায় দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি বলে তার দাবি।

যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, রোববার শেষ হওয়া ৪৮ ঘণ্টায় ৫৯টি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে।

কিন্তু সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী অন্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য আরো সংকটের চিত্র দেখাচ্ছে। গত বুধবার মাত্র ছয়টি, মঙ্গলবার ১১টি এবং সোমবার পাঁচটি জাহাজ প্রণালিটি পার হয়েছে। ১০ দিনের হিসাবে প্রতিদিন গড়ে চলাচল করেছে ১৩টি জাহাজ।

সামুদ্রিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, গত ১০ দিনে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ পার হয়েছে। মে মাসের পর এটিই সর্বনিম্ন।

যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ১৩০টির বেশি জাহাজ হরমুজ দিয়ে চলাচল করত। এখন সেই পথ কার্যত যুদ্ধের অন্যতম প্রধান চাপের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। হরমুজকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলার সক্ষমতা ইরান ইতোমধ্যে দেখিয়েছে। মার্চ থেকে সেখানে অসংখ্য জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। নিহত হয়েছেন অন্তত ১৯ জন নাবিক।

কিন্তু আরো বিস্তৃত একটি নিষিদ্ধ অঞ্চল সামরিকভাবে কার্যকর করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বিশেষ করে ওই অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর সুরক্ষায় থাকা জাহাজ প্রবেশ করলে ইরান কতটা প্রতিরোধ গড়তে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান স্টিফেন জুনস মনে করেন, ইরানের পক্ষে এ ধরনের অঞ্চল কার্যকর করা কঠিন হবে।

তার মতে, অঞ্চলটি কার্যকর করতে ইরানের যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানকে মাঠে নামতে হবে। কিন্তু সেগুলো মার্কিন হামলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।

তবে জুনস মনে করেন, এটি হয়তো ইরানের একটি সতর্কবার্তাও হতে পারে। জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোঝানো হচ্ছে—তেহরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ দিয়ে গেলে পার হতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়তে হবে।

জুনসের মতে, ইরান হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে আরো বড় সামরিক প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। এতে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার যুক্তি তৈরি হতে পারে।

এর রাজনৈতিক সুবিধাও পেতে পারে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে জনমত রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের ভেতরে বাড়ছে অর্থনৈতিক সংকট। এমন পরিস্থিতিতে বাইরের সামরিক চাপ জনগণকে সরকারের পক্ষে আরো ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।

তবে হরমুজের নতুন নিষিদ্ধ অঞ্চল শুধু সামরিক হুমকি কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ওমানের সঙ্গে ইরানের নৌপথ নিয়ে চলমান আলোচনার সঙ্গেও এর যোগ থাকতে পারে বলে মনে করেন জুনস।

ওমানের সঙ্গে সমঝোতা কার্যকর হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেয়, তাহলে ইরান নিষিদ্ধ অঞ্চল কার্যকর করা থেকে পিছিয়ে আসতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি ওই সমঝোতা মেনে না নেয়, তাহলে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য তেহরানের হাতে থাকবে নতুন একটি হাতিয়ার।

ফলে হরমুজ এখন শুধু তেল পরিবহনের পথ নয়। এটি হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সামরিক সংঘাতের অন্যতম প্রধান মঞ্চ। আর ইরানের নতুন নিষিদ্ধ অঞ্চল বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তার ওপর নির্ভর করতে পারে এই সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ।