ঢাকা ০৪:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে ৫৪তম হয়েও বাদ পড়লেন রাবির সাবেক শিক্ষার্থী, মায়ের কান্না থামছেই না

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৩:২৮:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২৫ বার পড়া হয়েছে

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ৮৩ জনের মধ্যে মেধাক্রমে ৫৪তম হয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মো. জাহিদ হাসান। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কোটায় আবেদন করে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও পুলিশ ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ভেরিফিকেশনের পর নিয়োগপত্রের তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন তিনি।

জাহিদের দাবি, তাঁর বা পরিবারের কারও কোনো মামলা কিংবা রাজনৈতিক পদ-পদবি না থাকলেও ভেরিফিকেশনের নামে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে সরকারি চাকরিতে নির্বাচিত হওয়ার খবরে আনন্দিত বাবা-মা এখন ভেঙে পড়েছেন; মায়ের কান্না থামছেই না।

জাহিদ হাসান পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নের বাসিন্দা। ২৮ বছর বয়সী জাহিদের বাবা আবু জাফর হাওলাদার কৃষক এবং মা জাহানারা বেগম গৃহিণী। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলেও পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি।

উপজেলার সাপলেজা মডেল হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ডক্টর রুস্তম আলী ফরাজী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত সুপারিশের ফল প্রকাশ করা হয়। সেখানে পিরোজপুর জেলা থেকে নির্বাচিত ৮৩ জনের তালিকায় মেধাক্রমে ৫৪তম ছিলেন জাহিদ। তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কোটাতেও আবেদন করেছিলেন। চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর নিয়োগপত্র পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।

জাহিদ ঢাকা ডায়েরিকে বলেন,‍“গত ৮ ফেব্রুয়ারি যখন রেজাল্ট দেয়, তখন আব্বু হাসপাতালে ছিলেন। তাঁকে যখন জানাই, আব্বু অনেক খুশি হয়েছিলেন এবং অনেকটা সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। আমার খুশিতে আমার বাবা-মা যে এত খুশি হয়েছিলেন, সেটা বলে বোঝাতে পারব না।”

তিনি বলেন,“পরবর্তী সময়ে প্রথম দফায় পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং দ্বিতীয় দফায় জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়। কিন্তু সম্প্রতি চূড়ান্ত নিয়োগপত্রের তালিকা প্রকাশের পর দেখি সেখানে আমার নাম নেই। এই খবর শোনানোর পর থেকে আব্বা পুরোপুরি স্তব্ধ। আর মায়ের কান্না থামছেই না। বারবার শুধু জিজ্ঞেস করছে তোর নিয়োগটা হবে?”

ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার কারণ নিয়ে জাহিদ বলেন,“আমার নিজের বা পরিবারের, বিশেষ করে বাবার, সরাসরি কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবি নেই। কোনো মামলাও নেই। পরিবারের সবাই সাধারণ জীবনযাপন করেন। অথচ ভেরিফিকেশনের অজুহাতে অহেতুক আমাকে বাদ দেওয়া হলো। আমি কোন কারণে বাদ পড়েছি, এটা জানার অধিকার তো আমার আছে।”

আক্ষেপ করে তিনি বলেন,“জীবনে ২৬-২৭ বছর পড়াশোনা করে, সর্বোচ্চ মেধা ও প্রচেষ্টা দিয়ে এ পর্যন্ত আসার পর যদি এভাবে বাদ পড়তে হয়, তাহলে আমাদের শিক্ষার মূল্যটা থাকল কোথায়?”

এ ঘটনায় ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ নামে একটি গ্রুপে আক্ষেপ করে নিজের ফেসবুক পোস্টে জাহিদ লেখেন,“প্রাইমারি পরীক্ষা চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও পুলিশ এবং এনএসআই ভেরিফিকেশনে বাদ। আমার নামে কোনো মামলা নাই, কোনো রাজনৈতিক পদ নেই। তারপরও আমি বাদ।”

পোস্টে নিজের পরিবারের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি লেখেন,“এই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি যখন রেজাল্ট দেয়, তখন আব্বু হাসপাতালে। আব্বুকে জানিয়েছিলাম, আব্বু অনেক খুশি হয়েছিল এবং অনেকটা সুস্থ হয়ে গেছিল। কিন্তু এই খবর শোনানোর পর আব্বা দেখছি ভেঙে পড়ছে, মা অনেক কান্না করছে। তাদের এই চাপা কষ্ট দেখে নিজের কাছে অনেক খারাপ লাগতেছে।”

জাহিদের পোস্টে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তাঁর পরিচিতজনদের কয়েকজনও প্রতিক্রিয়া জানান। মুহায়মিন আহমেদ সাকিব মন্তব্য করেন, “জাহিদ আমাদের বন্ধু। ওর মতো ছেলেদের ভেরিফিকেশন থেকে বাদ দিলে আর কিছু বলার নাই। রাজনৈতিক কোনো কিছুতে কখনো ছিল না।”

আবির মুশাররফ হোসেন মন্তব্য করেন,“জাহিদ ভাইয়ের মতো মানুষকে বাদ দেওয়া হলে এই ভেরিফিকেশন নিয়ে বিরাট প্রশ্ন থেকে যায়। ওনার প্রতি অবিচার হয়েছে।পুনর্বিবেচনার দাবি জানাই।”

এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গ্রুপে আরও কয়েকজন প্রার্থীর ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার খবর ও অভিযোগ তুলে ধরেছেন শিক্ষার্থীরা।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে ৫৪তম হয়েও বাদ পড়লেন রাবির সাবেক শিক্ষার্থী, মায়ের কান্না থামছেই না

আপডেট সময় ০৩:২৮:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ৮৩ জনের মধ্যে মেধাক্রমে ৫৪তম হয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মো. জাহিদ হাসান। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কোটায় আবেদন করে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও পুলিশ ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ভেরিফিকেশনের পর নিয়োগপত্রের তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন তিনি।

জাহিদের দাবি, তাঁর বা পরিবারের কারও কোনো মামলা কিংবা রাজনৈতিক পদ-পদবি না থাকলেও ভেরিফিকেশনের নামে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে সরকারি চাকরিতে নির্বাচিত হওয়ার খবরে আনন্দিত বাবা-মা এখন ভেঙে পড়েছেন; মায়ের কান্না থামছেই না।

জাহিদ হাসান পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নের বাসিন্দা। ২৮ বছর বয়সী জাহিদের বাবা আবু জাফর হাওলাদার কৃষক এবং মা জাহানারা বেগম গৃহিণী। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলেও পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি।

উপজেলার সাপলেজা মডেল হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ডক্টর রুস্তম আলী ফরাজী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত সুপারিশের ফল প্রকাশ করা হয়। সেখানে পিরোজপুর জেলা থেকে নির্বাচিত ৮৩ জনের তালিকায় মেধাক্রমে ৫৪তম ছিলেন জাহিদ। তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কোটাতেও আবেদন করেছিলেন। চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর নিয়োগপত্র পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।

জাহিদ ঢাকা ডায়েরিকে বলেন,‍“গত ৮ ফেব্রুয়ারি যখন রেজাল্ট দেয়, তখন আব্বু হাসপাতালে ছিলেন। তাঁকে যখন জানাই, আব্বু অনেক খুশি হয়েছিলেন এবং অনেকটা সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। আমার খুশিতে আমার বাবা-মা যে এত খুশি হয়েছিলেন, সেটা বলে বোঝাতে পারব না।”

তিনি বলেন,“পরবর্তী সময়ে প্রথম দফায় পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং দ্বিতীয় দফায় জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়। কিন্তু সম্প্রতি চূড়ান্ত নিয়োগপত্রের তালিকা প্রকাশের পর দেখি সেখানে আমার নাম নেই। এই খবর শোনানোর পর থেকে আব্বা পুরোপুরি স্তব্ধ। আর মায়ের কান্না থামছেই না। বারবার শুধু জিজ্ঞেস করছে তোর নিয়োগটা হবে?”

ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার কারণ নিয়ে জাহিদ বলেন,“আমার নিজের বা পরিবারের, বিশেষ করে বাবার, সরাসরি কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবি নেই। কোনো মামলাও নেই। পরিবারের সবাই সাধারণ জীবনযাপন করেন। অথচ ভেরিফিকেশনের অজুহাতে অহেতুক আমাকে বাদ দেওয়া হলো। আমি কোন কারণে বাদ পড়েছি, এটা জানার অধিকার তো আমার আছে।”

আক্ষেপ করে তিনি বলেন,“জীবনে ২৬-২৭ বছর পড়াশোনা করে, সর্বোচ্চ মেধা ও প্রচেষ্টা দিয়ে এ পর্যন্ত আসার পর যদি এভাবে বাদ পড়তে হয়, তাহলে আমাদের শিক্ষার মূল্যটা থাকল কোথায়?”

এ ঘটনায় ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ নামে একটি গ্রুপে আক্ষেপ করে নিজের ফেসবুক পোস্টে জাহিদ লেখেন,“প্রাইমারি পরীক্ষা চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও পুলিশ এবং এনএসআই ভেরিফিকেশনে বাদ। আমার নামে কোনো মামলা নাই, কোনো রাজনৈতিক পদ নেই। তারপরও আমি বাদ।”

পোস্টে নিজের পরিবারের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি লেখেন,“এই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি যখন রেজাল্ট দেয়, তখন আব্বু হাসপাতালে। আব্বুকে জানিয়েছিলাম, আব্বু অনেক খুশি হয়েছিল এবং অনেকটা সুস্থ হয়ে গেছিল। কিন্তু এই খবর শোনানোর পর আব্বা দেখছি ভেঙে পড়ছে, মা অনেক কান্না করছে। তাদের এই চাপা কষ্ট দেখে নিজের কাছে অনেক খারাপ লাগতেছে।”

জাহিদের পোস্টে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তাঁর পরিচিতজনদের কয়েকজনও প্রতিক্রিয়া জানান। মুহায়মিন আহমেদ সাকিব মন্তব্য করেন, “জাহিদ আমাদের বন্ধু। ওর মতো ছেলেদের ভেরিফিকেশন থেকে বাদ দিলে আর কিছু বলার নাই। রাজনৈতিক কোনো কিছুতে কখনো ছিল না।”

আবির মুশাররফ হোসেন মন্তব্য করেন,“জাহিদ ভাইয়ের মতো মানুষকে বাদ দেওয়া হলে এই ভেরিফিকেশন নিয়ে বিরাট প্রশ্ন থেকে যায়। ওনার প্রতি অবিচার হয়েছে।পুনর্বিবেচনার দাবি জানাই।”

এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গ্রুপে আরও কয়েকজন প্রার্থীর ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার খবর ও অভিযোগ তুলে ধরেছেন শিক্ষার্থীরা।