ঢাকা ১২:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিএনপির ওপর আর আস্থা রাখতে পারছি না: সংসদে নাহিদ ইসলাম

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৭:২৬:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১০১২ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বিএনপির ওপর আর আস্থা রাখতে পারছেন না। এর কারণ হিসেবে তিনি আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে রাজনৈতিক নিয়োগ, সংস্কার ও গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করাসহ নানা বিষয়ের উল্লেখ করেন।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে নাহিদ ইসলাম এ কথা বলেন। তিনি সংবিধান, রাষ্ট্রপতি, জুলাই জাতীয় সনদ, পররাষ্ট্রনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তৃত বক্তব্য দেন।

এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুঁজিবাজার ও বিমাসংক্রান্ত দুটি বিল পাসের সময় বিএনপির শাসনামলে কোনো আর্থিক বিশৃঙ্খলা নেই বলে উল্লেখ করে বক্তব্য দেন। তাঁর জবাব দিয়ে নাহিদ ইসলাম বক্তব্য শুরু করেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আর্থিক খাত নিয়ে মাননীয় অর্থমন্ত্রী একবাক্যে বারবার বলেন, বিএনপির সময়ে আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলার কোনো রেকর্ড নেই। নাহিদ বলেন, ‘উনি কিছুক্ষণ আগে অস্বীকার করেছেন যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর একটা রাজনৈতিক নিয়োগ, তাদের দলের নির্বাচন কমিটির সদস্য। তিনি অস্বীকার করলেন।’

টিআইবির প্রতিবেদন উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া সরকারদলীয় প্রার্থীদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশের ঋণ রয়েছে। সংসদে সদস্যদের ১১ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে, যার অধিকাংশই সরকার দলের। যাদের অধিকাংশই ঋণখেলাপি ছিলেন, নির্বাচনের আগে কিছু টাকা দিয়ে ঋণ পুনঃ তফসিল করে নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিশেষত্ব হচ্ছে ঋণ পুনঃ তফসিল করা। এটাতে তিনি অভিজ্ঞ, ফলে তাঁকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কেন করা হয়েছে, তা পরিষ্কার। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ যাতে তিনি পুনঃ তফসিল করতে পারেন, সেই সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়ার জন্যই দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করা হয়েছে। ফলে আর্থিক খাতের আরও নিয়োগ তারা কী বিবেচনায় দেবেন, তাদের ওপর আর আস্থা রাখতে পারছি না।’

রাষ্ট্রপতির অতীত ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তাঁকে তিনটি লক্ষ্য দিয়ে দুদকের কমিশনার করা হয়। এর এক নম্বর হচ্ছে, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের নিশ্চিত করা। দুই নম্বর হচ্ছে, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগকে ক্লিনচিট দেওয়া। তিন নম্বর হচ্ছে, ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিন সরকারের সময় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া দুর্নীতির মামলা বাতিল করা।’

নাহিদ আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এস আলমের হাতে ইসলামী ব্যাংককে তুলে দেওয়ার কারিগর। এস আলম দুই কোটি আমানতকারীকে পথে বসিয়েছিল। জুলাই গণহত্যার সময় তাঁর (রাষ্ট্রপতি) ভূমিকা, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা সবকিছু আমরা জানি। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, একজন দুর্নীতিবাজ, অপদার্থ, মিথ্যুক, গণহত্যার দোসর এখনো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।’

রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে শপথ নেওয়ার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘তখনকার সময় আর বর্তমান সময় এক নয়। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পরে আমাদের সামনে দুইটা অপশন ছিল। আমরা বলেছিলাম জাতীয় সরকার করতে হবে। সেই প্রস্তাব বিএনপি নাকচ করে দিয়েছে। আরেকটা অপশন ছিল ক্ষমতা আর্মির হাতে তুলে দেওয়া। যদি আমরা সেই দিকে এগোতাম আজকে তারা (সরকারি দল) এখানে বসতে পারতাম কি না, সেটা সন্দেহ আছে।’

তিনি জানান, দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে তাঁরা তখন সরকারে গিয়েছিলেন।

নাহিদ বলেন, ‘এখন নির্বাচিত সরকার। চাইলে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারে। বিএনপিতে সে ধরনের যোগ্য ও আস্থাভাজন লোক রয়েছেন। গাধাকে দিয়ে হাল চাষ করিয়ে কোনো “বাহাদুরি নেই”—এটা সরকারের দেউলিয়াত্ব।’

’৭২-এর সংবিধান প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, “’৭২-এর সংবিধানকে ’৭১-এর সঙ্গে বিএনপি কোন বিবেচনায় মেলাচ্ছে?” তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানকে একাত্তরের সঙ্গে মিলিয়েছিল তো আওয়ামী লীগ। আমরা এর বিরোধিতা করেছি, বিএনপির বহু নেতাও বিরোধিতা করেছিল। মাওলানা ভাসানী, বদরুদ্দিন উমরসহ আরও অনেকে বিরোধিতা করেছিলেন।’

নাহিদ বলেন, ’৭২-এর সংবিধান স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রচনা করেননি। ’৭২-এর সংবিধান রচনা করেছিল ’৭০-এর নির্বাচনে আইয়ুব খানের এলএফওয়ের অধীনে যারা নির্বাচিত হয়েছিল তারা।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাহাত্তারের সংবিধান উত্তরাধিকারসূত্রে অগণতান্ত্রিক… স্বৈরতন্ত্রের বীজ বাংলাদেশে বাহাত্তরের সংবিধানে বপন করা হয়েছিল। এ সংবিধান মুজিববাদী আদর্শে রচিত।’

জিয়াউর রহমান প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, “সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ’৭২-এর সংবিধান বাতিলের সুযোগ এসেছিল…সম্মান রেখেই বলছি, জিয়াউর রহমান সে ঐতিহাসিক ভুলটি করেছিলেন।”

জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদে “নোট অব ডিসেন্ট” দিয়ে সেটাকে কলুষিত করে ফেলা হয়েছে… গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর পাশেই নোট লেখা হয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘বল প্রয়োগ করে ঐকমত্য কমিশনকে চাপ দিয়ে জুলাই সনদে “নোট অব ডিসেন্ট” লেখানো হয়েছে।’

গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সবার সম্মতির ভিত্তিতেই সবাই মিলে গণভোটে অংশগ্রহণ করেছি…নির্বাচনের পর বিএনপি ভিন্ন অবস্থান নেয়…নির্বাচনের আগে পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল যে গণভোট আপনারা মানেন না।’

তিনি দাবি করেন, ‘গণভোট অনুসারে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্থার পরিষদ গঠন করা উচিত।’

নাহিদ বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নির্দলীয় হতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নিয়োগকৃত অনেক বিচারক এখনো রয়ে গিয়েছেন… তারপরও তো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।’

মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিলের প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, ‘ভালো আইন যতক্ষণ পর্যন্ত আনতে পারছে না… আপনাদের সমালোচনাটা সহ্য করতে হবে।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকে আমরা শ্রদ্ধা করি… জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের নতুন রূপ তৈরি হয়েছে… মুক্তিযুদ্ধের সাথে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কেউ বলি নাই যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের থেকে বড়… জুলাই গণ–অভ্যুত্থান এক বিশেষ ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন। এটার ব্যাপারে আমরা আনকমপ্রমাইজ, এটা নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ নাই।’

নাহিদ বলেন, ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সকলের অংশগ্রহণ ছিল… আমরা আন্দোলনের সময় থেকে এখন পর্যন্ত কখনো অস্বীকার করি নাই… গণ–অভ্যুত্থানের পরে আমাদের রাস্তা রাজনৈতিকভাবে আলাদা হয়ে গেছে।’

ভারত প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, ‘ভারতের সাথে সম্পর্ক আমরা উন্নয়ন করতে চাই…কিন্তু এই সম্পর্ক উন্নয়ন হতে হবে মর্যাদার ভিত্তিতে, সাম্যের ভিত্তিতে…ভারত শুধু আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে এই দেশকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে, সেই দিনকে কবর দিতে হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘দুই মাসে বিএনপির হাতে খুন হয়েছে ৩১ জন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৪টি, বিএনপির চাঁদাবাজির খবর এসেছে ৮৩টি…কিন্তু সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘শাহবাগ থানার সামনে…সাংবাদিকদের মারধর করেছে ছাত্রদলের নেতা-কর্মী…এখনো কোনো মামলা নেয়নি…থানার ভেতর প্রবেশ করে ওসি রুমে…হামলা করা হয়েছে।’

জঙ্গিবাদ নিয়ে সরকারের ভিন্নমুখী বক্তব্যের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন জঙ্গিবাদ নেই, আবার প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলছেন জঙ্গিবাদ আছে… আপনারা একটু সমন্বয় করে বক্তব্য দিন।’ তিনি বলেন, ‘জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের সিকিউরিটি প্রশ্ন…এতে জাতীয় ঐক্য লাগবে…তবে বিগত আমলের মতো জঙ্গিবাদকে ওয়ার অন টেরর প্রজেক্ট হিসেবে যাতে না দেখা হয়।’

শেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সংসদে সরকারি দলের সদস্যরা যেভাবে স্তুতি করেছে…সংবিধান সংস্কার পরিষদকে বাতিল…গণভোটকে অস্বীকার…তাতে আমি অনেক হতাশ হয়েছি। আশা করি, আমাদের এই হতাশা অতি দ্রুতই শেষ হবে এবং আমরা যেই কমিটমেন্ট জনগণের কাছে করেছি সেই সকল প্রতিশ্রুতি আমরা রক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।’

নিউজটি শেয়ার করুন

বিএনপির ওপর আর আস্থা রাখতে পারছি না: সংসদে নাহিদ ইসলাম

আপডেট সময় ০৭:২৬:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বিএনপির ওপর আর আস্থা রাখতে পারছেন না। এর কারণ হিসেবে তিনি আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে রাজনৈতিক নিয়োগ, সংস্কার ও গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করাসহ নানা বিষয়ের উল্লেখ করেন।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে নাহিদ ইসলাম এ কথা বলেন। তিনি সংবিধান, রাষ্ট্রপতি, জুলাই জাতীয় সনদ, পররাষ্ট্রনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তৃত বক্তব্য দেন।

এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুঁজিবাজার ও বিমাসংক্রান্ত দুটি বিল পাসের সময় বিএনপির শাসনামলে কোনো আর্থিক বিশৃঙ্খলা নেই বলে উল্লেখ করে বক্তব্য দেন। তাঁর জবাব দিয়ে নাহিদ ইসলাম বক্তব্য শুরু করেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আর্থিক খাত নিয়ে মাননীয় অর্থমন্ত্রী একবাক্যে বারবার বলেন, বিএনপির সময়ে আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলার কোনো রেকর্ড নেই। নাহিদ বলেন, ‘উনি কিছুক্ষণ আগে অস্বীকার করেছেন যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর একটা রাজনৈতিক নিয়োগ, তাদের দলের নির্বাচন কমিটির সদস্য। তিনি অস্বীকার করলেন।’

টিআইবির প্রতিবেদন উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া সরকারদলীয় প্রার্থীদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশের ঋণ রয়েছে। সংসদে সদস্যদের ১১ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে, যার অধিকাংশই সরকার দলের। যাদের অধিকাংশই ঋণখেলাপি ছিলেন, নির্বাচনের আগে কিছু টাকা দিয়ে ঋণ পুনঃ তফসিল করে নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিশেষত্ব হচ্ছে ঋণ পুনঃ তফসিল করা। এটাতে তিনি অভিজ্ঞ, ফলে তাঁকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কেন করা হয়েছে, তা পরিষ্কার। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ যাতে তিনি পুনঃ তফসিল করতে পারেন, সেই সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়ার জন্যই দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করা হয়েছে। ফলে আর্থিক খাতের আরও নিয়োগ তারা কী বিবেচনায় দেবেন, তাদের ওপর আর আস্থা রাখতে পারছি না।’

রাষ্ট্রপতির অতীত ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তাঁকে তিনটি লক্ষ্য দিয়ে দুদকের কমিশনার করা হয়। এর এক নম্বর হচ্ছে, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের নিশ্চিত করা। দুই নম্বর হচ্ছে, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগকে ক্লিনচিট দেওয়া। তিন নম্বর হচ্ছে, ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিন সরকারের সময় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া দুর্নীতির মামলা বাতিল করা।’

নাহিদ আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এস আলমের হাতে ইসলামী ব্যাংককে তুলে দেওয়ার কারিগর। এস আলম দুই কোটি আমানতকারীকে পথে বসিয়েছিল। জুলাই গণহত্যার সময় তাঁর (রাষ্ট্রপতি) ভূমিকা, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা সবকিছু আমরা জানি। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, একজন দুর্নীতিবাজ, অপদার্থ, মিথ্যুক, গণহত্যার দোসর এখনো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।’

রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে শপথ নেওয়ার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘তখনকার সময় আর বর্তমান সময় এক নয়। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পরে আমাদের সামনে দুইটা অপশন ছিল। আমরা বলেছিলাম জাতীয় সরকার করতে হবে। সেই প্রস্তাব বিএনপি নাকচ করে দিয়েছে। আরেকটা অপশন ছিল ক্ষমতা আর্মির হাতে তুলে দেওয়া। যদি আমরা সেই দিকে এগোতাম আজকে তারা (সরকারি দল) এখানে বসতে পারতাম কি না, সেটা সন্দেহ আছে।’

তিনি জানান, দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে তাঁরা তখন সরকারে গিয়েছিলেন।

নাহিদ বলেন, ‘এখন নির্বাচিত সরকার। চাইলে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারে। বিএনপিতে সে ধরনের যোগ্য ও আস্থাভাজন লোক রয়েছেন। গাধাকে দিয়ে হাল চাষ করিয়ে কোনো “বাহাদুরি নেই”—এটা সরকারের দেউলিয়াত্ব।’

’৭২-এর সংবিধান প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, “’৭২-এর সংবিধানকে ’৭১-এর সঙ্গে বিএনপি কোন বিবেচনায় মেলাচ্ছে?” তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানকে একাত্তরের সঙ্গে মিলিয়েছিল তো আওয়ামী লীগ। আমরা এর বিরোধিতা করেছি, বিএনপির বহু নেতাও বিরোধিতা করেছিল। মাওলানা ভাসানী, বদরুদ্দিন উমরসহ আরও অনেকে বিরোধিতা করেছিলেন।’

নাহিদ বলেন, ’৭২-এর সংবিধান স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রচনা করেননি। ’৭২-এর সংবিধান রচনা করেছিল ’৭০-এর নির্বাচনে আইয়ুব খানের এলএফওয়ের অধীনে যারা নির্বাচিত হয়েছিল তারা।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাহাত্তারের সংবিধান উত্তরাধিকারসূত্রে অগণতান্ত্রিক… স্বৈরতন্ত্রের বীজ বাংলাদেশে বাহাত্তরের সংবিধানে বপন করা হয়েছিল। এ সংবিধান মুজিববাদী আদর্শে রচিত।’

জিয়াউর রহমান প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, “সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ’৭২-এর সংবিধান বাতিলের সুযোগ এসেছিল…সম্মান রেখেই বলছি, জিয়াউর রহমান সে ঐতিহাসিক ভুলটি করেছিলেন।”

জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদে “নোট অব ডিসেন্ট” দিয়ে সেটাকে কলুষিত করে ফেলা হয়েছে… গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর পাশেই নোট লেখা হয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘বল প্রয়োগ করে ঐকমত্য কমিশনকে চাপ দিয়ে জুলাই সনদে “নোট অব ডিসেন্ট” লেখানো হয়েছে।’

গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সবার সম্মতির ভিত্তিতেই সবাই মিলে গণভোটে অংশগ্রহণ করেছি…নির্বাচনের পর বিএনপি ভিন্ন অবস্থান নেয়…নির্বাচনের আগে পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল যে গণভোট আপনারা মানেন না।’

তিনি দাবি করেন, ‘গণভোট অনুসারে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্থার পরিষদ গঠন করা উচিত।’

নাহিদ বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নির্দলীয় হতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নিয়োগকৃত অনেক বিচারক এখনো রয়ে গিয়েছেন… তারপরও তো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।’

মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিলের প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, ‘ভালো আইন যতক্ষণ পর্যন্ত আনতে পারছে না… আপনাদের সমালোচনাটা সহ্য করতে হবে।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকে আমরা শ্রদ্ধা করি… জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের নতুন রূপ তৈরি হয়েছে… মুক্তিযুদ্ধের সাথে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কেউ বলি নাই যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের থেকে বড়… জুলাই গণ–অভ্যুত্থান এক বিশেষ ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন। এটার ব্যাপারে আমরা আনকমপ্রমাইজ, এটা নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ নাই।’

নাহিদ বলেন, ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সকলের অংশগ্রহণ ছিল… আমরা আন্দোলনের সময় থেকে এখন পর্যন্ত কখনো অস্বীকার করি নাই… গণ–অভ্যুত্থানের পরে আমাদের রাস্তা রাজনৈতিকভাবে আলাদা হয়ে গেছে।’

ভারত প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, ‘ভারতের সাথে সম্পর্ক আমরা উন্নয়ন করতে চাই…কিন্তু এই সম্পর্ক উন্নয়ন হতে হবে মর্যাদার ভিত্তিতে, সাম্যের ভিত্তিতে…ভারত শুধু আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে এই দেশকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে, সেই দিনকে কবর দিতে হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘দুই মাসে বিএনপির হাতে খুন হয়েছে ৩১ জন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৪টি, বিএনপির চাঁদাবাজির খবর এসেছে ৮৩টি…কিন্তু সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘শাহবাগ থানার সামনে…সাংবাদিকদের মারধর করেছে ছাত্রদলের নেতা-কর্মী…এখনো কোনো মামলা নেয়নি…থানার ভেতর প্রবেশ করে ওসি রুমে…হামলা করা হয়েছে।’

জঙ্গিবাদ নিয়ে সরকারের ভিন্নমুখী বক্তব্যের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন জঙ্গিবাদ নেই, আবার প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলছেন জঙ্গিবাদ আছে… আপনারা একটু সমন্বয় করে বক্তব্য দিন।’ তিনি বলেন, ‘জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের সিকিউরিটি প্রশ্ন…এতে জাতীয় ঐক্য লাগবে…তবে বিগত আমলের মতো জঙ্গিবাদকে ওয়ার অন টেরর প্রজেক্ট হিসেবে যাতে না দেখা হয়।’

শেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সংসদে সরকারি দলের সদস্যরা যেভাবে স্তুতি করেছে…সংবিধান সংস্কার পরিষদকে বাতিল…গণভোটকে অস্বীকার…তাতে আমি অনেক হতাশ হয়েছি। আশা করি, আমাদের এই হতাশা অতি দ্রুতই শেষ হবে এবং আমরা যেই কমিটমেন্ট জনগণের কাছে করেছি সেই সকল প্রতিশ্রুতি আমরা রক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।’