ইসরাইলকে বন্ধুর তালিকায় রাখছেন না ট্রাম্প!
- আপডেট সময় ০৩:৫১:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
- / ২০ বার পড়া হয়েছে
ইসরাইলের অনেকের কাছেই এখন অবশ্যম্ভাবী মনে হচ্ছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেল আবিবের সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে যাচ্ছেন। ১৯৪৮ সালে বিভিন্ন ইহুদিবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমন্বয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনী গঠনের পর থেকেই এই মার্কিন জোট তাদের টিকিয়ে রাখতে মূল ভূমিকা পালন করে আসছে।
বর্তমানে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক বিপজ্জনক খেলায় মেতেছেন। চলমান দুর্নীতি মামলার কারণে তার সম্ভাব্য কারাদণ্ড হতে পারে, আবার চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে।
লেবাননসহ ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এখন ওয়াশিংটনের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ইসরাইলি জনগণ চায় এই যুদ্ধ চলুক। এ দুইয়ের টানাপোড়েনে পড়ে নেতানিয়াহু তার চার দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির সময় মার্কিন-ইরান বিরোধের খবর পাওয়া গিয়েছিল। এর এক বছর পর তেহরানের সাথে কীভাবে পথ চলা যায় তা নিয়ে মতভেদের কারণে আমেরিকার সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে।
আমেরিকার সঙ্গে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির আলোচনায় ইরান একটি প্রধান শর্ত জুড়ে দিয়েছে—দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। এই শর্তই মূলত আমেরিকা ও ইসরাইলকে বড় ধরনের সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
গত মাসে একটি ফোনালাপ ফাঁসের খবর পাওয়া যায়, যা হোয়াইট হাউস অস্বীকার করেনি। সেখানে দেখা যায়, ইরানের সাথে যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া ট্রাম্প লেবাননে হামলা বন্ধ না করায় নেতানিয়াহুকে তীব্র ভাষায় তিরস্কার করছেন।
খবর অনুযায়ী, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে অভিহিত করেন এবং তার প্রতি অকৃতজ্ঞতার অভিযোগ এনে বলেন, প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপ না থাকলে তিনি এতদিনে জেলেই থাকতেন। ট্রাম্প নাকি নেতানিয়াহুকে বলেন, ‘এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। এসবের কারণে সবাই এখন ইসরাইলকে ঘৃণা করছে।’
গত সপ্তাহে অ্যাক্সিওস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন আসল বস কে’—যা দুই নেতার মধ্যকার উত্তপ্ত সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ।
জুন মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে জেডি ভ্যান্স ট্রাম্পকে এই মুহূর্তে ইসরাইলের প্রতি সহানুভূতিশীল একমাত্র বিশ্বনেতা হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সাথে তিনি ইসরাইলি মন্ত্রীদের সতর্ক করে বলেন, ‘আপনাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র মার্কিনীদের হাতে তৈরি এবং মার্কিন করদাতাদের টাকায় কেনা।’
সাম্প্রতিক জরিপগুলো দেখাচ্ছে, কেবল সাধারণ মার্কিন জনগণই ইসরাইলের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে না, বরং ট্রাম্পের ডানপন্থী পপুলিস্ট ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (ম্যাগা) আন্দোলনের একটি বড় অংশের মধ্যেও ইসরাইলকে নিয়ে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।
ম্যাগা শিবিরের সাবেক কট্টর সমর্থক মার্জোরি টেইলর গ্রিনের মতো নেতারা এখন ইসরাইলকে মার্কিন সহায়তার বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করছেন। ডানপন্থী রাজনীতিতে অন্যতম সোচ্চার কণ্ঠস্বর, সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক টাকার কার্লসন জুনের শেষের দিকে বলেন, ট্রাম্প অবশেষে বুঝতে পেরেছেন যে ইসরাইলই তার প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
কার্লসন তার পডকাস্টের শুরুতে অভিযোগ করেন, ইসরাইল ট্রাম্পকে ফুসলিয়ে, বুঝিয়ে ও হুমকি দিয়ে ইরানে হামলা করিয়েছে, যাতে প্রতিবেশী লেবাননের বিরুদ্ধে আরেকটি যুদ্ধ শুরু করার উছিলা পাওয়া যায়।
ওয়াশিংটনের ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর গবেষক ও জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড্যানিয়েল বাইম্যান আলজাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প মার্কিন এস্টাবলিশমেন্টের ঐতিহ্যগতভাবে সবচেয়ে ইসরাইলপন্থী দল ‘রিপাবলিকান’-এর প্রধান হলেও, ইসরাইলের সাথে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে তার হাতে বেশ কিছু বিকল্প রয়েছে।
বাইম্যান বলেন, ‘আমি মনে করি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যথেষ্ট নমনীয়তা রয়েছে। অনেক রিপাবলিকান কট্টর ইসরাইলপন্থী হলেও প্রেসিডেন্টের একটি অত্যন্ত অনুগত কর্মী বাহিনী রয়েছে এবং তিনি দেখিয়েছেন যে দলের বিশাল অংশকে তিনি নিজের মতে আনতে পারেন। এ বিষয়ে তিনি অনেক ডেমোক্র্যাটকেও পাশে পাবেন, কারণ ডেমোক্র্যাট দলটির ভেতরেও ইসরাইলের প্রতি সমালোচনা দিন দিন বাড়ছে।’
ইতিহাসজুড়ে আমেরিকার কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন ইসরাইলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ইসরাইলের খুব কম মানুষই না বোঝার ভান করতে পারেন। ২০১৬ সাল থেকে ইসরাইল একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ১০ বছরে ৩৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা পাচ্ছে, যা আমেরিকার ইতিহাসে অন্য কোনো দেশকে দেওয়া সবচেয়ে বড় অনুদান।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া ইসরাইলের নৃশংস যুদ্ধে মার্কিন কূটনৈতিক সমর্থন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে এ পর্যন্ত অন্তত ৭২,০০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই ইস্যুতে জাতিসংঘে ইসরাইলের পক্ষে ওয়াশিংটন কম করে হলেও ছয়বার তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে।
ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্বে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা আমেরিকার সাথে দেশের দূরত্ব এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি সামনে এনেছেন। অথচ, এই কূটনৈতিক সংকটের পেছনে দায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধগুলোকে তাদের অধিকাংশই সমর্থন করেছিলেন।
জুনের মাঝামাঝিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ ইসরাইলের প্রধান মিত্রকে ধরে রাখতে নেতানিয়াহুর ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, ‘আমরা যদি দ্রুত এই সরকারকে পরিবর্তন করতে না পারি, তবে ইসরাইলের বৈদেশিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।’
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সাবেক চিফ অব স্টাফ গাদি আইজেনকোট, যিনি এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার সবচেয়ে বড় দাবিদার, তিনিও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করেছেন।
আইজেনকোট সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহু পরিস্থিতি এতটাই খারাপ করেছেন যে ট্রাম্পকে বাধ্য হয়ে ইসরাইলকে ছাড়াই একলা চলার নীতি নিতে হয়েছে এবং ইরানের সাথে চুক্তি করতে হচ্ছে, যা ইসরাইলকে তার এক নম্বর মিত্রের কাছ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।
ইসরাইলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিম্রোদ ফ্লাশেনবার্গ বলেন, ‘বিশ্বের বুকে ইসরাইলের অবস্থানের মূল চাবিকাঠি হলো আমেরিকা। আমেরিকার অবদানই ইসরাইলের জন্য সবকিছু; তারা ইসরাইলকে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কূটনৈতিক মর্যাদা—সবকিছু দেয়।’
আমেরিকান লেখক ও সাবেক কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার উল্লেখ করেন, ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন, যিনি ইসরাইলের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন, তবে খুব কম নেতাই এটি এত জনসমক্ষে করেছেন।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট বর্তমান প্রশাসনের মতো ভাষায় কথা বলেননি, কিংবা ইসরাইলি সমকক্ষদের সাথে আলোচনা এভাবে ফাঁস করেননি, যেখানে তাদের খাটো ও হেয় করা হয়েছে। কংগ্রেস বা সাধারণ জনগণ—রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট ভোটারদের কাছে ইসরাইল এর আগে কখনো এতখানি অজনপ্রিয় ছিল না।’
তবে এই উত্তেজনার পরও এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন করার কথা ভাবছে।
মিলার বলেন, ‘ট্রাম্প যদি ইসরাইলের ওপর বড় কোনো চাপ সৃষ্টি করতে চান, তবে তা হতে হবে এমন কোনো বড় সাফল্যের উদ্দেশ্যে, যা তাকে বিশ্বমঞ্চে বীর হিসেবে জাহির করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘লেবানন, গাজা কিংবা ইসরাইল-সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ—কোনো ইস্যুরই এই মুহূর্তে এমন কোনো বড় সাফল্যের সম্ভাবনা নেই, যা ইসরাইলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও জোরালো চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্পকে প্ররোচিত করবে।’
























