ঢাকা ০৬:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
দুর্যোগে ভোগান্তি

এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত না করায় তোপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ০৩:৫৫:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
  • / ১৯ বার পড়া হয়েছে

ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার (১৩ জুলাই) সারাদেশে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলায় এদিন পরীক্ষা নেওয়া হয়নি।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কোথাও কোমরসমান পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকা ও ভ্যানে চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের।

এমন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। নেটিজেনদের অনেকে আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সারাদেশে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিতের দাবি তুলেছেন।

সোমবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড (চট্টগ্রাম বোর্ড ছাড়া) এবং মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। সময়সূচি অনুযায়ী- পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্র, হিসাববিজ্ঞান প্রথমপত্র ও যুক্তিবিদ্যা প্রথমপত্র পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।

এদিন সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রে বৃষ্টি উপেক্ষা করে পরীক্ষার্থীরা উপস্থিত হতে থাকেন। কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার কেন্দ্রে হাঁটু ও কোমরসমান পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করেন পরীক্ষার্থীরা। বিভিন্ন কেন্দ্রের এমন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যায়, কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তায় কোমরসমান পানি। ভেতরে বারান্দায়ও পানি উঠেছে। তাছাড়া কেন্দ্রের প্রায় দুই-তিন কিলোমিটার এলাকার রাস্তায়ও ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কোমরসমান পানি পেরোতে শিক্ষার্থীদের পোশাক ভিজে গেছে। ভেজা পোশাক নিয়েই তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিয়েছেন তারা। আর উদ্বেগ নিয়ে বাইরে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে অভিভাবকরা।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, ভাষাসৈনিক অজিত গুহ কলেজসহ জেলা শহরের অধিকাংশ কেন্দ্রের চিত্রই এমন। পাশাপাশি নোয়াখালীর হাতিয়ার কয়েকটি কেন্দ্রেও পানি জমে যায়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শত শত পরিবার জলাবদ্ধতায় আটকা পড়েছে। সেখানেও রয়েছেন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা।

ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থী-অভিভাবক
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়া এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক গণমাধ্যমকে বলেন, ‌মেয়েটা কেন্দ্রে ঢুকেছে পুরো শরীর ভেজা। পোশাক ভিজেছে, পায়ের জুতা-মোজা ভিজে একাকার। এমন পোশাক পরে কোনো শিক্ষার্থী তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিতে পারে? এগুলো কি সরকার, মন্ত্রীদের চোখে পড়ে না? তারা কি ভিন্নগ্রহের মানুষ?

আরেক অভিভাবক বলেন, ‌ট্রমার মধ্যদিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে ওরা। গত দুইটি পরীক্ষায় বৃষ্টিতে ভিজে, পানিতে অনেকটা সাঁতরে কেন্দ্রে যাচ্ছে। অথচ কারও কোনো কথা নেই। মনে হচ্ছে দেশে কোনো সরকার নেই। জনগণের প্রতি, পরীক্ষার্থীদের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই।

শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনায় সরব নেটিজেনরা
দুযোর্গপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা স্থগিত না করায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন নেটিজেনরা। পাশাপাশি ট্রল করে এবং মিমস বানিয়ে মন্ত্রীর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন তারা।

সাদিকুর রহমান সাদাব নামে একজন চিকিৎসক ও অ্যাক্টিভিস্ট লিখেছেন, আজকের পর আর ১ মিনিটও শিক্ষামন্ত্রী থাকার অধিকার নাই মিলন সাহেবের। ওনার মতো জুলুমবাজ লোক শিক্ষামন্ত্রী থাকলে উনি একাই বিএনপির পতন ডেকে আনবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ওনার চেয়ে বাজে শিক্ষামন্ত্রী আর একজনও আসে নাই। দিপু মনি-নাহিদরাও বেটার ছিল এই লোকের চেয়ে।

তিনি লেখেন, বারবার সবাই অনুরোধ জানাচ্ছিলাম এইচএসসি এক্সাম পেছাতে। এই আবহাওয়াতে ঢাবি-বুয়েটের ক্লাস, এক্সাম অফ বা অনলাইনে। মিলন সাহেব কাল রাত ৫টায় বললো সে আবহাওয়া দেখে জানাবে এক্সামের বিষয়ে, ৭টায় নোটিশ দিলো এক্সাম হবে, আবহাওয়া নাকি ভালো। সারারাত এবং সারা সকাল বৃষ্টি হচ্ছে। হাঁটুপানিতে ভিজতে ভিজতে বাচ্চারা এক্সাম দিতে গেছে, আজ অনেক বাচ্চার এক্সাম মিস হবে। অনেকে পানিতে পড়ে যাচ্ছে, ভিজে যাচ্ছে ড্রেস, অ্যাডমিট কার্ড। বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে আজ এক্সাম দিচ্ছে বাচ্চারা। অমানবিকতার চূড়ান্ত লেভেল দেখলো বাচ্চারা। ১০ লাখ পরীক্ষার্থী ও অভিভাবক গালি দিতে দিতে আজ এক্সাম দিতে যাচ্ছে, গালি দিতে দিতে বের হবে। ফিজিক্স পরীক্ষা খারাপ হয়ে বাচ্চারা চলে যাবে ডিপ্রেশনে। অনেকের স্বপ্ন শেষ করে দিলো আজকে নিজের গোঁয়ারতুমির জন্য।

সাদমান আব্দুল্লাহ নামের একজন লেখেন, এই বৈরী আবহাওয়ায় কোনোভাবেই এইচএসসি পরীক্ষা হতে পারে না। শিক্ষামন্ত্রীর এরকম একরোখা মনোভাব এতগুলো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে ক্ষতির মুখে ফেলছে। দ্রুত এইচএসসি পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।

জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার লেখেন, আজকের এইচএসসি পরীক্ষাটি চাইলেই অন্য কোনো ছুটির দিনে স্থানান্তর করা যেত; কিন্তু তারেক রহমান সরকার জনবিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নিল। জনবিচ্ছিন্ন লোকজন বিদেশ থেকে এসে দেশের মানুষের সুবিধা-অসুবিধা বুঝবেন না এটাই স্বাভাবিক। তাদের এই অদক্ষতার জন্য এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বড় ধরনের ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম, ছাত্রদল নেতা শেখ তানভীর বারী হামিম, জাহিন এশাসহ অসংখ্য ছাত্রনেতা এবং নেটিজেন এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত না করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে পোস্ট দিয়েছেন। অনেকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করছেন।

শিক্ষাবিদরাও ক্ষুব্ধ-বিস্মিত
পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের এমন পরিস্থিতির জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক শিক্ষাবিদরাও। তারা সরকারের এমন সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, কোমর বা হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হওয়া কোনোভাবেই ন্যায্য নয়। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়া হলে সব পরীক্ষার্থীর জন্য সমান পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় না। বৈরী আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিবেচনায় নিয়ে আগেই পরীক্ষার সূচি পুনর্নির্ধারণ করা উচিত ছিল।

তিনি বলেন, ‘একই প্রশ্নপত্রে দেশের কোথাও পরীক্ষা হচ্ছে, আবার কোথাও স্থগিত থাকছে। এতে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নানা প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। যারা দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা দিচ্ছে, তারা স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এতে পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস কয়েক দিন আগ থেকেই ছিল। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় থাকলে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ধীরে ধীরে পাবলিক পরীক্ষাগুলোকে অনুকূল আবহাওয়ার সময়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন। পাশাপাশি দুর্যোগকালে শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে চলবে, সে বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনাও থাকা উচিত।

দায় নিচ্ছে না শিক্ষা বোর্ড
দুর্যোগে এমন ভোগান্তিতেও পরীক্ষা গ্রহণ ও তা নিয়ে সমালোচনা হলেও দায় নিচ্ছে না শিক্ষা বোর্ডগুলো। তারা বলছেন, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত স্থানীয় জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। ডিসি ও ইউএনওরা যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে পরীক্ষা স্থগিতের পরামর্শ বা সুপারিশ করা হয়নি।

আন্তঃশিক্ষা শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, জেলা প্রশাসক বা স্থানীয় প্রশাসনের সুপারিশ বা পরামর্শে আমরা সিদ্ধান্ত নিই। চট্টগ্রাম বাদে সবগুলো জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তবে রাতের বৃষ্টিতে কয়েকটি এলাকায় নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগের বিষয়টি শিক্ষা বোর্ডের নজরে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রয়োজন হলে বৃহত্তর পরিসরে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং শিক্ষা সচিব আবদুল খালেকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি। একাধিকবার তাদের মোবাইলে কল দিয়ে তা রিসিভ হয়নি।

নিউজটি শেয়ার করুন

দুর্যোগে ভোগান্তি

এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত না করায় তোপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী

আপডেট সময় ০৩:৫৫:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার (১৩ জুলাই) সারাদেশে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলায় এদিন পরীক্ষা নেওয়া হয়নি।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কোথাও কোমরসমান পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকা ও ভ্যানে চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের।

এমন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। নেটিজেনদের অনেকে আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সারাদেশে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিতের দাবি তুলেছেন।

সোমবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড (চট্টগ্রাম বোর্ড ছাড়া) এবং মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। সময়সূচি অনুযায়ী- পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্র, হিসাববিজ্ঞান প্রথমপত্র ও যুক্তিবিদ্যা প্রথমপত্র পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।

এদিন সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রে বৃষ্টি উপেক্ষা করে পরীক্ষার্থীরা উপস্থিত হতে থাকেন। কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার কেন্দ্রে হাঁটু ও কোমরসমান পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করেন পরীক্ষার্থীরা। বিভিন্ন কেন্দ্রের এমন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যায়, কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তায় কোমরসমান পানি। ভেতরে বারান্দায়ও পানি উঠেছে। তাছাড়া কেন্দ্রের প্রায় দুই-তিন কিলোমিটার এলাকার রাস্তায়ও ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কোমরসমান পানি পেরোতে শিক্ষার্থীদের পোশাক ভিজে গেছে। ভেজা পোশাক নিয়েই তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিয়েছেন তারা। আর উদ্বেগ নিয়ে বাইরে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে অভিভাবকরা।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, ভাষাসৈনিক অজিত গুহ কলেজসহ জেলা শহরের অধিকাংশ কেন্দ্রের চিত্রই এমন। পাশাপাশি নোয়াখালীর হাতিয়ার কয়েকটি কেন্দ্রেও পানি জমে যায়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শত শত পরিবার জলাবদ্ধতায় আটকা পড়েছে। সেখানেও রয়েছেন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা।

ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থী-অভিভাবক
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়া এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক গণমাধ্যমকে বলেন, ‌মেয়েটা কেন্দ্রে ঢুকেছে পুরো শরীর ভেজা। পোশাক ভিজেছে, পায়ের জুতা-মোজা ভিজে একাকার। এমন পোশাক পরে কোনো শিক্ষার্থী তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিতে পারে? এগুলো কি সরকার, মন্ত্রীদের চোখে পড়ে না? তারা কি ভিন্নগ্রহের মানুষ?

আরেক অভিভাবক বলেন, ‌ট্রমার মধ্যদিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে ওরা। গত দুইটি পরীক্ষায় বৃষ্টিতে ভিজে, পানিতে অনেকটা সাঁতরে কেন্দ্রে যাচ্ছে। অথচ কারও কোনো কথা নেই। মনে হচ্ছে দেশে কোনো সরকার নেই। জনগণের প্রতি, পরীক্ষার্থীদের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই।

শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনায় সরব নেটিজেনরা
দুযোর্গপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা স্থগিত না করায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন নেটিজেনরা। পাশাপাশি ট্রল করে এবং মিমস বানিয়ে মন্ত্রীর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন তারা।

সাদিকুর রহমান সাদাব নামে একজন চিকিৎসক ও অ্যাক্টিভিস্ট লিখেছেন, আজকের পর আর ১ মিনিটও শিক্ষামন্ত্রী থাকার অধিকার নাই মিলন সাহেবের। ওনার মতো জুলুমবাজ লোক শিক্ষামন্ত্রী থাকলে উনি একাই বিএনপির পতন ডেকে আনবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ওনার চেয়ে বাজে শিক্ষামন্ত্রী আর একজনও আসে নাই। দিপু মনি-নাহিদরাও বেটার ছিল এই লোকের চেয়ে।

তিনি লেখেন, বারবার সবাই অনুরোধ জানাচ্ছিলাম এইচএসসি এক্সাম পেছাতে। এই আবহাওয়াতে ঢাবি-বুয়েটের ক্লাস, এক্সাম অফ বা অনলাইনে। মিলন সাহেব কাল রাত ৫টায় বললো সে আবহাওয়া দেখে জানাবে এক্সামের বিষয়ে, ৭টায় নোটিশ দিলো এক্সাম হবে, আবহাওয়া নাকি ভালো। সারারাত এবং সারা সকাল বৃষ্টি হচ্ছে। হাঁটুপানিতে ভিজতে ভিজতে বাচ্চারা এক্সাম দিতে গেছে, আজ অনেক বাচ্চার এক্সাম মিস হবে। অনেকে পানিতে পড়ে যাচ্ছে, ভিজে যাচ্ছে ড্রেস, অ্যাডমিট কার্ড। বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে আজ এক্সাম দিচ্ছে বাচ্চারা। অমানবিকতার চূড়ান্ত লেভেল দেখলো বাচ্চারা। ১০ লাখ পরীক্ষার্থী ও অভিভাবক গালি দিতে দিতে আজ এক্সাম দিতে যাচ্ছে, গালি দিতে দিতে বের হবে। ফিজিক্স পরীক্ষা খারাপ হয়ে বাচ্চারা চলে যাবে ডিপ্রেশনে। অনেকের স্বপ্ন শেষ করে দিলো আজকে নিজের গোঁয়ারতুমির জন্য।

সাদমান আব্দুল্লাহ নামের একজন লেখেন, এই বৈরী আবহাওয়ায় কোনোভাবেই এইচএসসি পরীক্ষা হতে পারে না। শিক্ষামন্ত্রীর এরকম একরোখা মনোভাব এতগুলো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে ক্ষতির মুখে ফেলছে। দ্রুত এইচএসসি পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।

জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার লেখেন, আজকের এইচএসসি পরীক্ষাটি চাইলেই অন্য কোনো ছুটির দিনে স্থানান্তর করা যেত; কিন্তু তারেক রহমান সরকার জনবিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নিল। জনবিচ্ছিন্ন লোকজন বিদেশ থেকে এসে দেশের মানুষের সুবিধা-অসুবিধা বুঝবেন না এটাই স্বাভাবিক। তাদের এই অদক্ষতার জন্য এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বড় ধরনের ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম, ছাত্রদল নেতা শেখ তানভীর বারী হামিম, জাহিন এশাসহ অসংখ্য ছাত্রনেতা এবং নেটিজেন এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত না করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে পোস্ট দিয়েছেন। অনেকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করছেন।

শিক্ষাবিদরাও ক্ষুব্ধ-বিস্মিত
পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের এমন পরিস্থিতির জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক শিক্ষাবিদরাও। তারা সরকারের এমন সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, কোমর বা হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হওয়া কোনোভাবেই ন্যায্য নয়। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়া হলে সব পরীক্ষার্থীর জন্য সমান পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় না। বৈরী আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিবেচনায় নিয়ে আগেই পরীক্ষার সূচি পুনর্নির্ধারণ করা উচিত ছিল।

তিনি বলেন, ‘একই প্রশ্নপত্রে দেশের কোথাও পরীক্ষা হচ্ছে, আবার কোথাও স্থগিত থাকছে। এতে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নানা প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। যারা দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা দিচ্ছে, তারা স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এতে পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস কয়েক দিন আগ থেকেই ছিল। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় থাকলে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ধীরে ধীরে পাবলিক পরীক্ষাগুলোকে অনুকূল আবহাওয়ার সময়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন। পাশাপাশি দুর্যোগকালে শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে চলবে, সে বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনাও থাকা উচিত।

দায় নিচ্ছে না শিক্ষা বোর্ড
দুর্যোগে এমন ভোগান্তিতেও পরীক্ষা গ্রহণ ও তা নিয়ে সমালোচনা হলেও দায় নিচ্ছে না শিক্ষা বোর্ডগুলো। তারা বলছেন, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত স্থানীয় জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। ডিসি ও ইউএনওরা যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে পরীক্ষা স্থগিতের পরামর্শ বা সুপারিশ করা হয়নি।

আন্তঃশিক্ষা শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, জেলা প্রশাসক বা স্থানীয় প্রশাসনের সুপারিশ বা পরামর্শে আমরা সিদ্ধান্ত নিই। চট্টগ্রাম বাদে সবগুলো জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তবে রাতের বৃষ্টিতে কয়েকটি এলাকায় নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগের বিষয়টি শিক্ষা বোর্ডের নজরে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রয়োজন হলে বৃহত্তর পরিসরে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং শিক্ষা সচিব আবদুল খালেকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি। একাধিকবার তাদের মোবাইলে কল দিয়ে তা রিসিভ হয়নি।