হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় স্বজনপ্রীতি
- আপডেট সময় ০৭:২৭:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
- / ২২ বার পড়া হয়েছে
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় অতিবৃষ্টি ও অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি প্রণোদনা ও মানবিক সহায়তার তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, বর্গাচাষি ও প্রান্তিক চাষিদের বাদ দিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। ইতোমধ্যে অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এনে নিকলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে অতিবৃষ্টিজনিত অকাল বন্যায় নিকলী উপজেলার হাওরাঞ্চলের হাজার হাজার একর পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টি ও রোদের অভাবে অনেক জমির ধান পচে নষ্ট হয়ে যায়। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকরা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার লক্ষ্যে সরকার মানবিক সহায়তা ও প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করে।
ঘোষণার পর উপজেলা কৃষি বিভাগ মাইকিং করে কৃষকদের কাছ থেকে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করে। উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে ৩ হাজার ১৮০ জনের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২ হাজার ১৮০ জনের নাম অনুমোদন দেয়।
সোমবার সিংপুর ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে ত্রাণ বিতরণকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নতুন করে সামনে আসে। সিংপুর ইউনিয়নের কৃষক মো. রুকন আহমেদ বলেন, “আমি চাষাবাদ করে প্রায় সাত লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছি। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় আমার নাম নেই। অথচ এমন অনেকের নাম রয়েছে যারা কোনো ধরনের চাষাবাদই করেননি।”
এদিকে সিংপুর ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রাজিব আহম্মেদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশ করে তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম করা হয়েছে। এ অভিযোগে সিংপুর ইউনিয়নের ভাটিবরাটিয়া গ্রামের মো. খাইরুজ্জামান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রাজিব আহম্মেদ। তিনি বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যাচাই-বাছাইয়ের সময় জনপ্রতিনিধি ও গ্রামপুলিশ উপস্থিত ছিলেন। তাদের সহায়তায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিহ্নিত করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
জারইতলা ইউনিয়নের সাজনপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের কৃষক ইসমাইল হোসেন বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে। যারা চাষাবাদ করেননি তারাও প্রণোদনা পাচ্ছেন, আর প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন।”
একই অভিযোগ করেছেন ছাতিরচর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য মো. জলিল মিয়া। তিনি বলেন, “প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তালিকা করা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবী, কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন— এমন ব্যক্তিদের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. রেহানা মজুমদার মুক্তি বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে কোনো ধরনের অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির সুযোগ নেই। তবে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করে তাদের প্রাপ্য সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা আরও দুর্ভোগের মুখে পড়বেন।
























