ঢাকা ১০:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুবিতে ৩৩ লাখ টাকা অনিয়মের অভিযোগে বরখাস্ত রেজিস্ট্রার মজিবুর রহমানের প্রত্যাবর্তন

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ০৮:৪২:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
  • / ১৭ বার পড়া হয়েছে

আর্থিক অনিয়ম, বিধিবহির্ভূত পদোন্নতি ও শিক্ষা ছুটির শর্ত লঙ্ঘনের মাধ্যমে প্রায় ৩৩ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সাবেক সাবেক রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার আবার রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেছেন। অভিযোগের তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে হাইকোর্টের সর্বশেষ স্থগিতাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে পুনরায় দায়িত্ব পালনের অনুমতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

সোমবার (৬ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. দলিলুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠি থেকে এ তথ্য জানা যায়।

চিঠিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে রেজিস্ট্রার (সাময়িক বরখাস্ত) মো. মজিবুর রহমান মজুমদারের আবেদন এবং মহামান্য হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে রেজিস্ট্রার পদে যোগদানের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে।

তবে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া একজন কর্মকর্তাকে আবার একই পদে যোগদানের অনুমতি দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাকে প্রশাসনিক দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন মো. মজিবুর রহমান মজুমদার। চেয়ারে বসে তিনি অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষক হেনস্তাসহ নানা বির্তকে জড়িয়েছেন। এ ছাড়া তথ্য জালিয়াতি, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, উপাচার্যের অনুমতি ব্যতীত চিঠিপত্র আদান-প্রদান এবং নথির মূল নোট পরিবর্তন করে বিভিন্নজনকে অন্যায্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। নানা অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা একাধিক আন্দোলনও করেছেন। নানা অভিযোগের কারণে ২০১৮ সালে রেজিস্ট্রার পদ থেকে সরিয়ে তাকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে বদলি করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রাম ও জাতীয় বেতন স্কেল-২০০৯ অনুযায়ী রেজিস্ট্রার পদটি তৃতীয় গ্রেডভুক্ত হলেও অর্গানোগ্রাম সংশোধন ছাড়াই তিনি দ্বিতীয় গ্রেডে পদোন্নতি গ্রহণ করেন। এ প্রক্রিয়ায় নিজের পদোন্নতির ফাইলেই নিজে স্বাক্ষর করেন। একই সঙ্গে পদোন্নতিসংক্রান্ত রিভিউ কমিটির সদস্যসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। অথচ প্রশাসনিক বিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি নিজের নিয়োগ, পদোন্নতি বা তদন্ত-সংক্রান্ত কমিটির সদস্য হতে পারেন না।

এ ছাড়া শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে দুটি বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। অডিট মেমো-১০ অনুযায়ী, তৃতীয় গ্রেডের পরিবর্তে দ্বিতীয় গ্রেডের বেতন-ভাতা গ্রহণের মাধ্যমে ২০১৪ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ লাখ ২৭ হাজার ৯৮০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা ফেরতযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে অডিট মেমো-১১-এ শিক্ষা ছুটির চুক্তিপত্র ও নীতিমালা লঙ্ঘন করে পিএইচডি সম্পন্ন না করেই চাকরিতে যোগদান এবং ছুটিকালীন বেতন-ভাতা গ্রহণের মাধ্যমে আরও ২০ লাখ ১৪ হাজার ১৪০ টাকার আর্থিক ক্ষতির তথ্য উঠে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ছুটি নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষা ছুটি অসম্পূর্ণ রেখে যোগদান করলে ছুটিকালীন বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার বিধান থাকলেও তা পরিশোধ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দুই অডিট মেমো মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শ্রীলঙ্কার কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় নিবন্ধিত থাকলেও তিনি ডিগ্রি সম্পন্নের আগেই কর্মস্থলে ফিরে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির সংশ্লিষ্ট সমন্বয়ক জানান, তিনি গবেষণার প্রথম অগ্রগতি প্রতিবেদন সম্পন্ন করেছিলেন এবং গবেষণার বিষয় বাংলাদেশভিত্তিক হওয়ায় দেশে থেকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রকৃত ডিগ্রি অর্জনের আগেই কর্মস্থলে ফেরার প্রক্রিয়া তড়িঘড়ি সম্পন্ন করা হয়েছে।

এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ৩ মার্চ তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়ে অভিযোগ তদন্তে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়। পরে ১০৫তম বিশেষ সিন্ডিকেট সভায় ওই কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন ১০৮তম সিন্ডিকেট সভায় উপস্থাপন করলে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার ভিত্তিতে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু হয়।

জানা যায়, বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর অফিস আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করেন মজিবুর রহমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত বাধ্যতামূলক ছুটির আদেশের ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ দেন। পরে আদালত তার পক্ষে রায় দিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন না বলে জানা যায়। পরে তিনি আবার উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি হাইকোর্ট থেকে রায় নিয়ে এলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আবার আপিল করতে পারে। বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তবে ফের আপিল না করা এবং কোন বিবেচনায় তাকে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ নূরুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘তিনি (মজিবুর রহমান) কোর্টের রায় নিয়ে এসেছেন, এতটুকুই জানি। কোন কোন বিবেচনায় তাকে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য বলতে পারবেন। আমার পদ ঠুনকো। এ বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবেন।’

এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, ‘তার বিষয়ে মামলা চলমান রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে তার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে।’

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল বলেন, ‘মো. মজিবুর রহমান এর আগেও দুই দফা হাইকোর্টের রায় নিয়ে এসেছেন। সর্বশেষ হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’

যোগদান করার পর তার বিরুদ্ধে তদন্ত কীভাবে পরিচালিত হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। কমিটিতে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা জজ আদালতের একজন আইনজীবী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন।’

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জুনিয়র কর্মকর্তা কীভাবে একজন সিনিয়র কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করবেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ‘এখানে একটি গ্যাপ থেকে যাবে। বিষয়টি ঠিক করার প্রয়োজন রয়েছে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

কুবিতে ৩৩ লাখ টাকা অনিয়মের অভিযোগে বরখাস্ত রেজিস্ট্রার মজিবুর রহমানের প্রত্যাবর্তন

আপডেট সময় ০৮:৪২:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

আর্থিক অনিয়ম, বিধিবহির্ভূত পদোন্নতি ও শিক্ষা ছুটির শর্ত লঙ্ঘনের মাধ্যমে প্রায় ৩৩ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সাবেক সাবেক রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার আবার রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেছেন। অভিযোগের তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে হাইকোর্টের সর্বশেষ স্থগিতাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে পুনরায় দায়িত্ব পালনের অনুমতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

সোমবার (৬ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. দলিলুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠি থেকে এ তথ্য জানা যায়।

চিঠিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে রেজিস্ট্রার (সাময়িক বরখাস্ত) মো. মজিবুর রহমান মজুমদারের আবেদন এবং মহামান্য হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে রেজিস্ট্রার পদে যোগদানের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে।

তবে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া একজন কর্মকর্তাকে আবার একই পদে যোগদানের অনুমতি দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাকে প্রশাসনিক দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন মো. মজিবুর রহমান মজুমদার। চেয়ারে বসে তিনি অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষক হেনস্তাসহ নানা বির্তকে জড়িয়েছেন। এ ছাড়া তথ্য জালিয়াতি, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, উপাচার্যের অনুমতি ব্যতীত চিঠিপত্র আদান-প্রদান এবং নথির মূল নোট পরিবর্তন করে বিভিন্নজনকে অন্যায্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। নানা অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা একাধিক আন্দোলনও করেছেন। নানা অভিযোগের কারণে ২০১৮ সালে রেজিস্ট্রার পদ থেকে সরিয়ে তাকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে বদলি করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রাম ও জাতীয় বেতন স্কেল-২০০৯ অনুযায়ী রেজিস্ট্রার পদটি তৃতীয় গ্রেডভুক্ত হলেও অর্গানোগ্রাম সংশোধন ছাড়াই তিনি দ্বিতীয় গ্রেডে পদোন্নতি গ্রহণ করেন। এ প্রক্রিয়ায় নিজের পদোন্নতির ফাইলেই নিজে স্বাক্ষর করেন। একই সঙ্গে পদোন্নতিসংক্রান্ত রিভিউ কমিটির সদস্যসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। অথচ প্রশাসনিক বিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি নিজের নিয়োগ, পদোন্নতি বা তদন্ত-সংক্রান্ত কমিটির সদস্য হতে পারেন না।

এ ছাড়া শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে দুটি বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। অডিট মেমো-১০ অনুযায়ী, তৃতীয় গ্রেডের পরিবর্তে দ্বিতীয় গ্রেডের বেতন-ভাতা গ্রহণের মাধ্যমে ২০১৪ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ লাখ ২৭ হাজার ৯৮০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা ফেরতযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে অডিট মেমো-১১-এ শিক্ষা ছুটির চুক্তিপত্র ও নীতিমালা লঙ্ঘন করে পিএইচডি সম্পন্ন না করেই চাকরিতে যোগদান এবং ছুটিকালীন বেতন-ভাতা গ্রহণের মাধ্যমে আরও ২০ লাখ ১৪ হাজার ১৪০ টাকার আর্থিক ক্ষতির তথ্য উঠে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ছুটি নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষা ছুটি অসম্পূর্ণ রেখে যোগদান করলে ছুটিকালীন বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার বিধান থাকলেও তা পরিশোধ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দুই অডিট মেমো মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শ্রীলঙ্কার কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় নিবন্ধিত থাকলেও তিনি ডিগ্রি সম্পন্নের আগেই কর্মস্থলে ফিরে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির সংশ্লিষ্ট সমন্বয়ক জানান, তিনি গবেষণার প্রথম অগ্রগতি প্রতিবেদন সম্পন্ন করেছিলেন এবং গবেষণার বিষয় বাংলাদেশভিত্তিক হওয়ায় দেশে থেকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রকৃত ডিগ্রি অর্জনের আগেই কর্মস্থলে ফেরার প্রক্রিয়া তড়িঘড়ি সম্পন্ন করা হয়েছে।

এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ৩ মার্চ তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়ে অভিযোগ তদন্তে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়। পরে ১০৫তম বিশেষ সিন্ডিকেট সভায় ওই কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন ১০৮তম সিন্ডিকেট সভায় উপস্থাপন করলে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার ভিত্তিতে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু হয়।

জানা যায়, বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর অফিস আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করেন মজিবুর রহমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত বাধ্যতামূলক ছুটির আদেশের ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ দেন। পরে আদালত তার পক্ষে রায় দিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন না বলে জানা যায়। পরে তিনি আবার উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি হাইকোর্ট থেকে রায় নিয়ে এলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আবার আপিল করতে পারে। বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তবে ফের আপিল না করা এবং কোন বিবেচনায় তাকে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ নূরুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘তিনি (মজিবুর রহমান) কোর্টের রায় নিয়ে এসেছেন, এতটুকুই জানি। কোন কোন বিবেচনায় তাকে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য বলতে পারবেন। আমার পদ ঠুনকো। এ বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবেন।’

এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, ‘তার বিষয়ে মামলা চলমান রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে তার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে।’

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল বলেন, ‘মো. মজিবুর রহমান এর আগেও দুই দফা হাইকোর্টের রায় নিয়ে এসেছেন। সর্বশেষ হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’

যোগদান করার পর তার বিরুদ্ধে তদন্ত কীভাবে পরিচালিত হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। কমিটিতে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা জজ আদালতের একজন আইনজীবী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন।’

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জুনিয়র কর্মকর্তা কীভাবে একজন সিনিয়র কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করবেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ‘এখানে একটি গ্যাপ থেকে যাবে। বিষয়টি ঠিক করার প্রয়োজন রয়েছে।’