ঢাকা ১০:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অন্তরঙ্গ ভিডিও ফাঁসের শঙ্কায় হত্যা করা হয় জবি ছাত্রদল নেতা জোবায়েদকে

নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৮:৩৬:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
  • / ২১ বার পড়া হয়েছে

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জোবায়েদ হোসেন হত্যা মামলায় তিনজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ।

চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হল জোবায়েদের ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা, বর্ষার প্রেমিক মো. মাহির রহমান এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লান। তিনজনই হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

বুধবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর বংশাল থানার আদালতের সাধারণ নিবন্ধন শাখার কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক কামাল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, গত ৩০ জুন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বংশাল থানার উপ-পরিদর্শক আশরাফ হোসেন এ চার্জশিট দাখিল করেন। আগামী ১২ আগস্ট চার্জশিট গ্রহণের বিষয়ে শুনানি হবে।

চার্জশিটে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ভিকটিম মো. জোবায়েদ হোসেন (২৫) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষের ১৫তম ব্যাচের ছাত্র। তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য টিউশনি করতেন।

জোবায়েদ দীর্ঘদিন আসামি বর্ষার বাসায় গৃহশিক্ষক হিসেবে পড়াতেন। এই সূত্রে ভিকটিম ও আসামির মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।

তদন্তে আরও প্রকাশ পায় যে, বর্ষার সঙ্গে অপর আসামি মাহিরের দীর্ঘদিনের প্রেমঘটিত সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে বাসায় টিউশন পড়ানোর শিক্ষক জোবায়েদ হোসেনের সঙ্গেও বর্ষার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দু’জনের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে মাহির চরম ক্ষুব্ধ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে।

আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ভিকটিমের কাছে নিজের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণের অভিযোগ তুলে তাকে হত্যা করতে মাহিরকে প্ররোচিত করে বর্ষা। মাহির তার বন্ধু আয়লানকে বিষয়টি অবহিত করে। পরে তার সহায়তায় ভিকটিমকে হত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এর অংশ হিসেবে একটি সুইচ গিয়ার চাকু সংগ্রহ করে এবং ঘটনাস্থল সম্পর্কে বেশ কিছুদিন রেকি করে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিটে আরও উল্লেখ করেন, তদন্তে উদ্ধারকৃত ডিজিটাল আলামত, বিশেষত আসামি বর্ষার মোবাইল ফোন এবং ভিকটিমের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘটনার দিন এবং আগেও উভয়ের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ঘটনার দিন বিকাল ৪টা ২৭ মিনিটে উভয়ের মধ্যে লাইভ লোকেশনও শেয়ার হয়। একই সময়ে বর্ষা ও মাহিরের মধ্যেও একাধিকবার যোগাযোগ হয়। এতে প্রতীয়মান হয়, বর্ষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভিকটিমের অবস্থান ও চলাফেরার তথ্য মাহিরকে সরবরাহ করছিলেন।

ঘটনার দিন পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বর্ষার বাসায় জোবায়েদ পড়াতে গেলে মাহির ও আয়লান ঘটনাস্থলে ওঁত পেতে থাকে। ভিকটিম বাসার নিচতলায় প্রবেশ করলে মাহির তাকে কথোপকথনের নামে থামিয়ে তার সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়ায়। এক পর্যায়ে মাহির তার নিকট থাকা সুইচ গিয়ার চাকু দিয়ে ভিকটিমের গলার সজোরে আঘাত করে। এতে ভিকটিম গুরুতর আহত অবস্থায় আত্মরক্ষার্থে সিঁড়ির উপরের দিকে দৌড়ে উঠতে গেলে তৃতীয় তলার সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়ে। পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সেখানেই মারা যান।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, জোবায়েদ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতেন। ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বংশাল থানাধীন ৩১নং ওয়ার্ডে নুর বক্স লেনের ১৫ নং হোল্ডিং রৌশন ভিলায় পড়ানোর জন্য যান। সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটের সময় ওই ছাত্রী জোবায়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই সৈকতকে ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে জানায় যে, স্যার খুন হয়েছেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিষয়টি ভুক্তভোগীর ভাই এনায়েত হোসেনকে মোবাইলে জানান জবির আরেক শিক্ষার্থী মো. কামরুল হাসান।

এনায়েত তার শ্যালক শরীফকে নিয়ে মোটরসাইকেলে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থল রৌশন ভিলায় পৌঁছান। উপরে ওঠার সময় ওই ভবনের নিচতলা থেকে সিঁড়ি এবং দেয়ালে রক্তের দাগ দেখতে পান। সেসময় ভবনটির তৃতীয় তলার রুমের পূর্ব পার্শ্বের সিঁড়িতে জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ উপুড় অবস্থায় পড়ে ছিল। পরে ময়নাতদন্ত শেষে গত ২০ অক্টোবর জোবায়েদকে কুমিল্লার কৃষ্ণপুর গ্রামে দাফন করা হয়।

এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে রাজধানীর বংশাল থানায় হত্যা মামলা করেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বংশাল থানার উপ-পরিদর্শক আশরাফ হোসেন বলেন, ত্রিমুখী প্রেমের কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন জোবায়েদ হোসেন। মামলায় জোবায়েদের ছাত্রী বর্ষাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ৫০ জনকে।

মামলার বাদী এনায়েত হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘জোবায়েদকে ঘিরে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। আমাদের আদরের ভাইটা পরিবারের বাতিঘর ছিল। তাকে হারানোর পর থেকে বাবা-মায়ের চোখের পানি এক মুহূর্তের জন্যও থামছে না। সারাটা ঘর শূন্য হয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, আমার ভাইটাকে যারা নির্মমভাবে খুন করেছে, সেই নৃশংস খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। ওদের এমন শাস্তি হোক, যাতে আর কোনো মা-বাবার বুক খালি না হয়, আর কোনো ভাইকে এভাবে ভাই হারাতে না হয়।’

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

অন্তরঙ্গ ভিডিও ফাঁসের শঙ্কায় হত্যা করা হয় জবি ছাত্রদল নেতা জোবায়েদকে

আপডেট সময় ০৮:৩৬:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জোবায়েদ হোসেন হত্যা মামলায় তিনজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ।

চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হল জোবায়েদের ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা, বর্ষার প্রেমিক মো. মাহির রহমান এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লান। তিনজনই হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

বুধবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর বংশাল থানার আদালতের সাধারণ নিবন্ধন শাখার কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক কামাল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, গত ৩০ জুন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বংশাল থানার উপ-পরিদর্শক আশরাফ হোসেন এ চার্জশিট দাখিল করেন। আগামী ১২ আগস্ট চার্জশিট গ্রহণের বিষয়ে শুনানি হবে।

চার্জশিটে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ভিকটিম মো. জোবায়েদ হোসেন (২৫) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষের ১৫তম ব্যাচের ছাত্র। তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য টিউশনি করতেন।

জোবায়েদ দীর্ঘদিন আসামি বর্ষার বাসায় গৃহশিক্ষক হিসেবে পড়াতেন। এই সূত্রে ভিকটিম ও আসামির মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।

তদন্তে আরও প্রকাশ পায় যে, বর্ষার সঙ্গে অপর আসামি মাহিরের দীর্ঘদিনের প্রেমঘটিত সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে বাসায় টিউশন পড়ানোর শিক্ষক জোবায়েদ হোসেনের সঙ্গেও বর্ষার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দু’জনের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে মাহির চরম ক্ষুব্ধ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে।

আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ভিকটিমের কাছে নিজের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণের অভিযোগ তুলে তাকে হত্যা করতে মাহিরকে প্ররোচিত করে বর্ষা। মাহির তার বন্ধু আয়লানকে বিষয়টি অবহিত করে। পরে তার সহায়তায় ভিকটিমকে হত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এর অংশ হিসেবে একটি সুইচ গিয়ার চাকু সংগ্রহ করে এবং ঘটনাস্থল সম্পর্কে বেশ কিছুদিন রেকি করে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিটে আরও উল্লেখ করেন, তদন্তে উদ্ধারকৃত ডিজিটাল আলামত, বিশেষত আসামি বর্ষার মোবাইল ফোন এবং ভিকটিমের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘটনার দিন এবং আগেও উভয়ের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ঘটনার দিন বিকাল ৪টা ২৭ মিনিটে উভয়ের মধ্যে লাইভ লোকেশনও শেয়ার হয়। একই সময়ে বর্ষা ও মাহিরের মধ্যেও একাধিকবার যোগাযোগ হয়। এতে প্রতীয়মান হয়, বর্ষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভিকটিমের অবস্থান ও চলাফেরার তথ্য মাহিরকে সরবরাহ করছিলেন।

ঘটনার দিন পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বর্ষার বাসায় জোবায়েদ পড়াতে গেলে মাহির ও আয়লান ঘটনাস্থলে ওঁত পেতে থাকে। ভিকটিম বাসার নিচতলায় প্রবেশ করলে মাহির তাকে কথোপকথনের নামে থামিয়ে তার সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়ায়। এক পর্যায়ে মাহির তার নিকট থাকা সুইচ গিয়ার চাকু দিয়ে ভিকটিমের গলার সজোরে আঘাত করে। এতে ভিকটিম গুরুতর আহত অবস্থায় আত্মরক্ষার্থে সিঁড়ির উপরের দিকে দৌড়ে উঠতে গেলে তৃতীয় তলার সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়ে। পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সেখানেই মারা যান।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, জোবায়েদ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতেন। ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বংশাল থানাধীন ৩১নং ওয়ার্ডে নুর বক্স লেনের ১৫ নং হোল্ডিং রৌশন ভিলায় পড়ানোর জন্য যান। সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটের সময় ওই ছাত্রী জোবায়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই সৈকতকে ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে জানায় যে, স্যার খুন হয়েছেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিষয়টি ভুক্তভোগীর ভাই এনায়েত হোসেনকে মোবাইলে জানান জবির আরেক শিক্ষার্থী মো. কামরুল হাসান।

এনায়েত তার শ্যালক শরীফকে নিয়ে মোটরসাইকেলে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থল রৌশন ভিলায় পৌঁছান। উপরে ওঠার সময় ওই ভবনের নিচতলা থেকে সিঁড়ি এবং দেয়ালে রক্তের দাগ দেখতে পান। সেসময় ভবনটির তৃতীয় তলার রুমের পূর্ব পার্শ্বের সিঁড়িতে জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ উপুড় অবস্থায় পড়ে ছিল। পরে ময়নাতদন্ত শেষে গত ২০ অক্টোবর জোবায়েদকে কুমিল্লার কৃষ্ণপুর গ্রামে দাফন করা হয়।

এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে রাজধানীর বংশাল থানায় হত্যা মামলা করেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বংশাল থানার উপ-পরিদর্শক আশরাফ হোসেন বলেন, ত্রিমুখী প্রেমের কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন জোবায়েদ হোসেন। মামলায় জোবায়েদের ছাত্রী বর্ষাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ৫০ জনকে।

মামলার বাদী এনায়েত হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘জোবায়েদকে ঘিরে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। আমাদের আদরের ভাইটা পরিবারের বাতিঘর ছিল। তাকে হারানোর পর থেকে বাবা-মায়ের চোখের পানি এক মুহূর্তের জন্যও থামছে না। সারাটা ঘর শূন্য হয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, আমার ভাইটাকে যারা নির্মমভাবে খুন করেছে, সেই নৃশংস খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। ওদের এমন শাস্তি হোক, যাতে আর কোনো মা-বাবার বুক খালি না হয়, আর কোনো ভাইকে এভাবে ভাই হারাতে না হয়।’