নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ
ইরানে আরেকটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ ঝুঁকিতে ট্রাম্প
- আপডেট সময় ০৪:৪৮:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
- / ১৫ বার পড়া হয়েছে
কোনো দেশই যুদ্ধ শুরু করার সময় মনে করে না যে যুদ্ধ চিরদিন চলবে। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রেসিডেন্ট এমন সব যুদ্ধে জড়িয়েছেন, যা বছরের পর বছর ধরে চলেছে। শেষ পর্যন্ত পরবর্তী কোনো প্রেসিডেন্ট খরচ ও রাজনৈতিক চাপ সহ্য করার মতো না হওয়ায় বিজয় ঘোষণা করে সেনা ফিরিয়ে এনেছেন।
সমালোচকদের মতে, ইরানের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন।
ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় বলেছিলেন, তিনি নতুন যুদ্ধ শুরু করবেন না, বরং যুদ্ধ শেষ করবেন। বিশেষ করে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াতে চান না। কিন্তু এখন তার নীতিই তাকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী হামলা চালিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। পরবর্তীতে কখনো আলোচনা অথবা আবার হামলা পর্যায়ক্রমনে চলছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য—ইরানের সরকার পরিবর্তন বা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ—কোনোটিই অর্জন করতে পারেনি। বরং যুদ্ধের ফলে নতুন একটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। আর তা হলো হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে গেছে।
কূটনৈতিক আলোচনা আপাতত ব্যর্থ হওয়ায় ট্রাম্প নিজেকে পুনরায় যুদ্ধের ময়দানে দেখতে পাচ্ছেন। যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেছে, হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ, আর যে সমঝোতা স্মারককে সফল বলেছিলেন, সেটিও এক মাসের মধ্যেই ভেঙে পড়েছে।
বিশ্লেষক আলি ভাইজ বলেন, দুই পক্ষই এই সমঝোতাকে শান্তির সেতু হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আরেকটি উপায় হিসেবে দেখেছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পরিকল্পনা না থাকলে এই যুদ্ধও ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ হয়ে যেতে পারে।
‘ফরএভার ওয়ার’ চিরস্থায়ী যুদ্ধের ধারণাটি মূলত ৯/১১-এর পর শুরু হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালায়। শুরুতে সেদেশের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলেও পরে বিদ্রোহ দমন ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় বহু বছর কেটে যায়। শেষ পর্যন্ত বিপুল অর্থ ও প্রাণহানির পরও স্পষ্ট সাফল্য আসেনি।
যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ লরেন্স ডি. ফ্রিডম্যান বলেন, শক্তিশালী দেশগুলো প্রায়ই মনে করে তারা খুব দ্রুত যুদ্ধ জিতে যাবে। কিন্তু তারা সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারে না। ফলে যুদ্ধ অনেক দীর্ঘ হয়।
তিনি বলেন, ট্রাম্প যেমন ইরানে, তেমনি ইউক্রেনের ক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজেদের সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন। তাই তারা এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করেন যা দ্রুত অর্জন করা সম্ভব ছিল না।
শুধু শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকলেই যুদ্ধ জেতা যায় না। যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যকে স্থায়ী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্যে রূপ দিতে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দরকার। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সমস্যা আরো বেশি, কারণ তিনি স্থলবাহিনী পাঠাতে চান না; শুধু বিমান ও নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করছেন।
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশের লক্ষ্য ছিল সীমিত—কুয়েত থেকে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনীকে বের করে দেওয়া। তাই সেই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়। কিন্তু তার ছেলে জর্জ ডব্লিউ. বুশ পরে ইরাকে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করেন, যা শেষ পর্যন্ত ইরানের প্রভাবই বাড়িয়ে দেয়। আফগানিস্তানেও তালেবানকে সরানোর পর নতুন সমাজ গড়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে।
কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্প মনে করেন তিনি ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব ও মার্কিন জিম্মি সংকটের পর থেকে চলে আসা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধের অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন।
জনস হপকিন্স স্কুল অফ অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক ভ্যালি নাসর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের এই ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ হলো এমন একটি সংঘাতেরই আরেকটি পর্যায়, যা কখনো উত্তপ্ত হয়েছে, আবার কখনো ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির মতো সমঝোতাও হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প ২০১৮ সালে সেই চুক্তি বাতিল করেন।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ইসরাইলের প্ররোচনায় ট্রাম্প আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছেন। এই সংঘাত লেবানন, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনে ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমেও চলছে।
ট্রাম্প চাইলে এখনো তাঁর সমর্থকদের কাছে এই যুদ্ধকে একটি বিজয় হিসেবে তুলে ধরে সরে আসতে পারেন। কিন্তু তিনি বরং আরো বেশি জড়িয়ে পড়ছেন, অথচ শান্তি প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। আর হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার মার্কিন প্রতিশ্রুতি এবং এই জলপথের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অবস্থান—দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তবে এই যুদ্ধ আফগানিস্তান বা ইরাকের যুদ্ধের মতো নয়। সেখানে বহু বছর ধরে হাজার হাজার মার্কিন সেনা দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করেছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মদতপুষ্ট নতুন সরকারগুলোর বিরোধী মিলিশিয়া ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে মার্কিন সেনারা। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র মূলত একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়ছে।
এছাড়া ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম। এর মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই ইরান সহজে এর নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বৈদেশিক নীতি বিষয়ক পরিচালক সুজান মালোনি বলেন, যুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতে আর ফেরা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ইরাকের মতোই, মার্কিনিদের অনুমান ও ভুল ধারণা এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাধামুক্ত যান চলাচলের দিন সম্ভবত শেষ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, এখন হয়তো একটি ‘নতুন স্বাভাবিক’ পরিস্থিতি তৈরি হবে, যেখানে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে আরো বেশি সামরিক উপস্থিতি রাখতে হবে।
ভ্যালি নাসরের মতে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ইরানের তুলনায় কম। তাই সময়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কমে যেতে পারে, কিন্তু ইরান একই মাত্রার লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকবে।
সবশেষে আলি ভাইজ বলেন, আপাতত আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ দুই পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারকও ধরে রাখতে পারেনি। যদি এমনই চলতে থাকে, তাহলে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের বদলে এটি সত্যিই একটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ পরিণত হতে পারে।
























