ঢাকা ১২:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে দলীয় সুপারিশে ছাত্রদল নেতা ও তার বান্ধবীর নাম

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ০৯:০০:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২৬ বার পড়া হয়েছে

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের কথা বলা হলেও চূড়ান্ত তালিকায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, তাদের স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের একাধিক নাম থাকায় প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারীরা। এদিকে জেলা ছাত্রদলের সদস্য শাফিউল ইসলাম শিমুল ও তার বান্ধবী হিসেবে পরিচিত ফাহমিদা আক্তার মীমের নির্বাচিত হওয়া নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

গত ১০ আগস্ট রাতে ঘোষিত ফলাফলে দুর্গাপুর ইউনিয়নের তথ্য সংগ্রহকারী পদে রংপুর জেলা ছাত্রদলের সদস্য শাফিউল ইসলাম শিমুল ও তার বান্ধবী হিসেবে পরিচিত ফাহমিদা আক্তার মীমের নাম পাওয়া যায়। একই ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর ভাতিজা মেহেদী হাসান ফুয়াদ ও ভাতিজি ফাহিমা আক্তার লিমারও নির্বাচিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে ওই ইউনিয়নের চিথলি দক্ষিণপাড়া গ্রাম থেকেই তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে ৯ জন নির্বাচিত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

মিঠাপুকুর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ জুলাই ‘মিঠাপুকুর উপজেলা ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬’-এর তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নে সুপারভাইজার পদে ৬৭০ জন এবং তথ্য সংগ্রহকারী পদে প্রায় ৩ হাজার ২৪৩ জন আবেদন করেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহারিক দক্ষতা, জিপিএ, আচরণ ও মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচনের কথা ছিল।

ছাত্রদলের কয়েকজন স্থানীয় নেতাকর্মীর দাবি, উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর নিজ বাসস্থান দুর্গাপুর ইউনিয়নের চিথলি দক্ষিণপাড়ায় হওয়ায় ওই এলাকা থেকে তুলনামূলক বেশি প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় ছাত্রদলের এক নেতা জানান, ছাত্রদল নেতা শিমুল তার দলীয় প্রভাব ও একই গ্রামের বাসিন্দা উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর ক্ষমতাবলে তার গ্রামের ৯ জনকে সুপারিশ করেছেন। ৯ জনের মধ্যে তার বান্ধবী ফাহমিদা আক্তার মিমও রয়েছেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাণীপুকুর ইউনিয়নে সুপারভাইজার হয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাহিদুল ইসলামের স্ত্রী তাজমুন নাহার। বড় হযরতপুর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর খালাতো ভাই মো. মিরাজ আহমেদ, পায়রাবন্দ ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুর রউফ সরকারের মেয়ে রেজওয়ানা শারমিন প্রাপ্তি নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া ভাংনী ইউনিয়নে ছাত্রলীগের রংপুর মহানগর শাখার সাবেক সহসভাপতি মোজাহিদুল হককেও সুপারভাইজার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে শাফিউল ইসলাম শিমুল বলেন, “আমি মেধার জোরে টিকেছি। ফাহমিদা আক্তার মীম আমার এলাকার পরিচিত। সে আমার বান্ধবী নয়। এগুলো ভিত্তিহীন কথা।” তিনি দলীয় সুপারিশের অভিযোগও অস্বীকার করেন।

দলীয় সুপারিশের অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানী বলেন, তাঁর কোনো আত্মীয়স্বজন বা ভাতিজি সুযোগ পাননি। তাঁর দাবি, চিথলি দক্ষিণপাড়া বড় ও ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম হওয়ায় সেখান থেকে বেশি প্রার্থী নির্বাচিত হওয়া স্বাভাবিক।

ফ্যামিলি কার্ড তথ্য সংগ্রহ কমিটির সদস্য সচিব ও মিঠাপুকুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল হাকিম বলেন, “রেজাল্ট শতভাগ মেধার ভিত্তিতে হয়েছে। ১৭টি বোর্ডে ৩৪ জন কর্মকর্তার মাধ্যমে ভাইভা নিয়ে সর্বোচ্চ মেধাবীদের বেছে নেওয়া হয়েছে।”

রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী বলেন, ইউএনও তাকে শতভাগ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে একটি গ্রাম থেকেই একাধিক প্রার্থী নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে কী ঘটেছে, তা নিয়ে তিনি সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. পারভেজের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। ফলে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগে দলীয় প্রভাব, সুপারিশ কিংবা স্বজনপ্রীতির অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে দলীয় সুপারিশে ছাত্রদল নেতা ও তার বান্ধবীর নাম

আপডেট সময় ০৯:০০:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের কথা বলা হলেও চূড়ান্ত তালিকায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, তাদের স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের একাধিক নাম থাকায় প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারীরা। এদিকে জেলা ছাত্রদলের সদস্য শাফিউল ইসলাম শিমুল ও তার বান্ধবী হিসেবে পরিচিত ফাহমিদা আক্তার মীমের নির্বাচিত হওয়া নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

গত ১০ আগস্ট রাতে ঘোষিত ফলাফলে দুর্গাপুর ইউনিয়নের তথ্য সংগ্রহকারী পদে রংপুর জেলা ছাত্রদলের সদস্য শাফিউল ইসলাম শিমুল ও তার বান্ধবী হিসেবে পরিচিত ফাহমিদা আক্তার মীমের নাম পাওয়া যায়। একই ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর ভাতিজা মেহেদী হাসান ফুয়াদ ও ভাতিজি ফাহিমা আক্তার লিমারও নির্বাচিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে ওই ইউনিয়নের চিথলি দক্ষিণপাড়া গ্রাম থেকেই তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে ৯ জন নির্বাচিত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

মিঠাপুকুর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ জুলাই ‘মিঠাপুকুর উপজেলা ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬’-এর তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নে সুপারভাইজার পদে ৬৭০ জন এবং তথ্য সংগ্রহকারী পদে প্রায় ৩ হাজার ২৪৩ জন আবেদন করেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহারিক দক্ষতা, জিপিএ, আচরণ ও মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচনের কথা ছিল।

ছাত্রদলের কয়েকজন স্থানীয় নেতাকর্মীর দাবি, উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর নিজ বাসস্থান দুর্গাপুর ইউনিয়নের চিথলি দক্ষিণপাড়ায় হওয়ায় ওই এলাকা থেকে তুলনামূলক বেশি প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় ছাত্রদলের এক নেতা জানান, ছাত্রদল নেতা শিমুল তার দলীয় প্রভাব ও একই গ্রামের বাসিন্দা উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর ক্ষমতাবলে তার গ্রামের ৯ জনকে সুপারিশ করেছেন। ৯ জনের মধ্যে তার বান্ধবী ফাহমিদা আক্তার মিমও রয়েছেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাণীপুকুর ইউনিয়নে সুপারভাইজার হয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাহিদুল ইসলামের স্ত্রী তাজমুন নাহার। বড় হযরতপুর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর খালাতো ভাই মো. মিরাজ আহমেদ, পায়রাবন্দ ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুর রউফ সরকারের মেয়ে রেজওয়ানা শারমিন প্রাপ্তি নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া ভাংনী ইউনিয়নে ছাত্রলীগের রংপুর মহানগর শাখার সাবেক সহসভাপতি মোজাহিদুল হককেও সুপারভাইজার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে শাফিউল ইসলাম শিমুল বলেন, “আমি মেধার জোরে টিকেছি। ফাহমিদা আক্তার মীম আমার এলাকার পরিচিত। সে আমার বান্ধবী নয়। এগুলো ভিত্তিহীন কথা।” তিনি দলীয় সুপারিশের অভিযোগও অস্বীকার করেন।

দলীয় সুপারিশের অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানী বলেন, তাঁর কোনো আত্মীয়স্বজন বা ভাতিজি সুযোগ পাননি। তাঁর দাবি, চিথলি দক্ষিণপাড়া বড় ও ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম হওয়ায় সেখান থেকে বেশি প্রার্থী নির্বাচিত হওয়া স্বাভাবিক।

ফ্যামিলি কার্ড তথ্য সংগ্রহ কমিটির সদস্য সচিব ও মিঠাপুকুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল হাকিম বলেন, “রেজাল্ট শতভাগ মেধার ভিত্তিতে হয়েছে। ১৭টি বোর্ডে ৩৪ জন কর্মকর্তার মাধ্যমে ভাইভা নিয়ে সর্বোচ্চ মেধাবীদের বেছে নেওয়া হয়েছে।”

রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী বলেন, ইউএনও তাকে শতভাগ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে একটি গ্রাম থেকেই একাধিক প্রার্থী নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে কী ঘটেছে, তা নিয়ে তিনি সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. পারভেজের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। ফলে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগে দলীয় প্রভাব, সুপারিশ কিংবা স্বজনপ্রীতির অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি।