অসুস্থ হয়েও ছুটি পাননি, কাজের টেবিলেই নিভল সুমির জীবন
- আপডেট সময় ১০:২৪:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
- / ২৫ বার পড়া হয়েছে
ঢাকার আশুলিয়ার একটি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত অবস্থায় এক নারী পোশাক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় প্রকাশিত কারখানার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, মেশিনে কাজ করার সময় এক পুরুষ কর্মকর্তা ওই শ্রমিকের দিকে বারবার তেড়ে যাচ্ছেন এবং তার মেশিনে আঘাত করছেন। একপর্যায়ে ওই শ্রমিক মেশিনে বসা অবস্থায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। পরে কারখানার মেডিক্যাল সেন্টারে তার মৃত্যু হয়। অভিযোগ ছিল, অসুস্থবোধ করায় সুমি কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটি চেয়েছিলেন। তবে তাকে ছুটি দেওয়া হয়নি।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে তৈরি পোশাকশিল্প গ্রুপ ডেকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত শ্রমিকের নাম মিশু আক্তার (২৬)। তার গ্রামের বাড়ি নীলফামারী জেলার ডিমলা থানায়। স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি আশুলিয়ার কাঠগড়া নয়াপাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। তিনি ডেকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে সুইং অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
প্রকাশিত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, কারখানার অন্য শ্রমিকদের মতো মিশু আক্তারও সুইং মেশিনে কাজ করছিলেন। একপর্যায়ে তার পাশে আসেন এক ব্যক্তি। এ সময় আরেক ব্যক্তি মিশুর দিকে তেড়ে আসেন। তিনি সুইং মেশিন চাপড়াতে শুরু করেন এবং কয়েক দফায় উদ্ধত অঙ্গভঙ্গি করেন। মিশু যে কাপড়টি নিয়ে কাজ করছিলেন, সেটি ছিনিয়ে নিয়ে নিচে ফেলে দেন ওই ব্যক্তি। তার এমন দুর্ব্যবহারের একপর্যায়ে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েন মিশু।
ফুটেজে আরও দেখা যায়, বিকেল ৫টা ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে সুইং মেশিনে কাজ করা অবস্থায় মিশু ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় মেশিন চাপড়ানো ও উদ্ধত অঙ্গভঙ্গি করা ওই ব্যক্তি কিছুটা দূরে সরে যান। তিনি কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
একজন নারী শ্রমিক এসে মিশুকে তোলার চেষ্টা করেন। আশপাশের আরও কয়েকজন নারী শ্রমিক এগিয়ে আসেন। ওই ব্যক্তি মিশুর মাথার কাছ থেকে কিছু একটা দূরে ছুড়ে ফেলে ঘটনাটি দেখতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি সেখান থেকে চলে যান। নারী শ্রমিকেরা মিশুকে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যান। বিকেল ৫টা ৩ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে একটি স্ট্রেচার নিয়ে ফিরে আসেন তারা। পরে মিশুকে স্ট্রেচারে করে ফ্লোর থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নারী ও শিশু হাসপাতালের সিনিয়র ম্যানেজার (অপারেশন) হারুন-অর-রশীদ জানান, আগামী অ্যাপারেলস থেকে সুমি আক্তার মিশু নামের ওই নারী শ্রমিককে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় তার স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও কারখানা কর্তৃপক্ষ হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন। স্বামী কোনও অভিযোগ নেই বলে জানিয়েছিলেন এবং মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। পরে মৃত্যু সনদ দিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও স্বামীর কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
মরদেহ যখন তারা হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে বের করছিলেন, ঠিক ওই মুহূর্তে কারখানার কিছু শ্রমিক এসে বাধা দেন। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নিহতের স্বামী ও স্বজনেরা নেমে পড়েন। এর মধ্যেই কারখানা কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যান। পরে আশুলিয়া থানার ওসি ফোন করে মরদেহ থানায় নিয়ে যেতে বলেন। তখন অ্যাম্বুলেন্সের চালককে ফোন করে মরদেহ আশুলিয়া থানায় নিয়ে যেতে বলা হয়, বলেন হারুন।
মিশুর স্বামী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘গতকাল (শুক্রবার) দুপুরে বিরতির সময় মিশু বাসায় খেতে আসে। খাওয়া শেষে আবার অফিসে যায়। আমি এ সময় বাসায়ই ছিলাম। সে অসুস্থ ছিল না। অসুস্থ বললে তো অফিসেই যাইতে দিতাম না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমি কোনো কাজ করি না। ঠিক করছিলাম মোবাইলের সার্ভিসিংয়ের দোকান দিবো। এর আগেই এই ঘটনা ঘটলো। ফুটেজে যা দেখা গেছে, এইটা একধরনের নির্যাতন। শরীরে হাত তোলা ব্যতীত যা বলার, করার সব করছে। ৫টা ১০-১২ মিনিটের দিকে খবর পেয়ে ফ্যাক্টরিতে গেছিলাম। পরে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালে নিলে ডাক্তার বলে মারা গেছে। আমি বিচার চাই।’
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু সিসিটিভি ফুটেজ, নিহতের স্বজন ও সহকর্মীদের বরাত দিয়ে জানান, শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও কারখানায় উৎপাদন চলছিল। সুমি অসুস্থ শরীর নিয়েই কাজে যোগ দিয়েছিলেন। দুপুরে বাসায় খেতে গিয়ে তিনি ছেলেকে নিজের অসুস্থতা ও কারখানায় কাজের চাপের কথা জানিয়েছিলেন।
মিন্টু বলেন, গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে কারখানা কর্তৃপক্ষ কারখানায় উৎপাদন চালাচ্ছিলেন। সুমি আক্তার অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থতা নিয়েই তিনি কারখানায় কাজ করছিলেন। দুপুরে বাসায় খাবার খেতে এসে ছেলেকে বলেছেন, শরীর খারাপ লাগছে। কারখানায় প্রচুর কাজের চাপ, ছুটি চাইলাম, ছুটি দিল না। এই বলে তিনি খাবার খেয়ে আবার কারখানায় চলে যান।
মিন্টু বলেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিন সুমির বাসায় থাকার কথা। কিন্তু তাকে কারখানায় কাজ করতে হচ্ছিল। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বোঝা যাচ্ছে, অসুস্থ সুমি কারখানায় উৎপাদন ঠিকমতো করতে পারছিলেন না। তার ৫টায় কারখানা ছুটি হলেও তাকে ৫টা বাজার পরও কাজ করতে হচ্ছিল। মেশিনে কর্মরত অবস্থায় ৫টা ১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে তার দিকে এক কর্মকর্তা তেড়ে আসেন। তার সঙ্গে দফায় দফায় খারাপ আচরণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকেন। এর মধ্যেই তিনি মেশিনে বসা অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন। পরে তিনি কারখানার মেডিকেল সেন্টারে মারা যান। মৃতদেহ নারী ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঘটনার পর সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ফ্লোরের লাইন সুপারভাইজারকে অব্যাহতি দেওয়ার লক্ষ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।
ডেকো গ্রুপের জিএম (অ্যাডমিন, এইচআর অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স) মো. সালাউদ্দিন বলেন, ‘ইতিমধ্যে ওই সুপারভাইজারকে শোকজ ও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মিশুর পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে তার সব পাওনা দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মিশুর সহকর্মীরা জানিয়েছেন, স্বামী-সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত ছিলেন মিশু। স্বামী কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই হয়তো চিন্তিত ছিলেন। শুনেছি মৃত্যুর ঘটনায় মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মিশুর পরিবারকে যৌক্তিক সব বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।’
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে নারী ও শিশু হাসপাতাল থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে রাতেই ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় মিশুর স্বামী লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।



















