কুষ্টিয়ায় লাশ ফেলার নির্দেশ দেন হানিফ: ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর বর্ণনা
- আপডেট সময় ০৩:২২:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৪৬ বার পড়া হয়েছে
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ছাত্র-জনতার ওপর চালানো নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পেছনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের সরাসরি নির্দেশ ছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। জবানবন্দিতে সাক্ষী জানান, আন্দোলন দমাতে প্রয়োজনে ‘লাশ ফেলার’ নির্দেশ দিয়েছিলেন হানিফ। গতকাল ট্রাইব্যুনাল-২-এ কুষ্টিয়ার ছয় হত্যা মামলার পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে দেয়া জবানবন্দিতে এক সমন্বয়ক এসব তথ্য তুলে ধরেন।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে রেকর্ড করা ওই জবানবন্দিতে সাক্ষী দাবি করেন, ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই আওয়ামী লীগের এক সমাবেশ থেকে কুষ্টিয়ায় আন্দোলন প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়, আন্দোলন দমাতে প্রয়োজনে দু-একটি লাশ ফেলতেও তাদের কোনো আপত্তি নেই।
এ মামলায় মোট আসামি চারজন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। এই চার আসামির বিরুদ্ধে পাঁচ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ৩১ বছর বয়সী এক সমন্বয়ক। নিরাপত্তার স্বার্থে সাক্ষীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, ২০২৪ সালের ১২ জুলাই রাতে আমাদের ১২ জনের একটি বৈঠক হয়। এরপর রাতেই কোটা সংস্কার আন্দোলনের ব্যানারে ছোট একটি মিছিল করি। পরবর্তী সময়ে ১৮ জুলাই ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে দিনের বেলায় একটি মিছিল হয়। মিছিলটি সাদ্দাম বাজার থেকে শুরু হয়ে চৌড়হাস মোড় পর্যন্ত যায়। পথে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। এতে আন্দোলকারী কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
তিনি বলেন, কুষ্টিয়ায় কোনোভাবেই আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের রাজপথে নামতে দিতো না আওয়ামী লীগ। ১০-১২ জন একত্রিত হলেই তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালাতো তারা। ফলে কুষ্টিয়া জেলায় আর সেভাবে আন্দোলনটি গড়ে ওঠেনি। ২৭ জুলাই বঙ্গবন্ধু সুপার মার্কেটে অবস্থিত দলীয় কার্যালয়ে সমাবেশ করেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সমাবেশে আজগর আলী, আতাউর রহমান আতা ও সদর উদ্দিন খানও ছিলেন। মাহবুব-উল-আলম হানিফের নির্দেশনায় সমাবেশটি করেন তারা। কুষ্টিয়া জেলায় কোনোভাবেই আন্দোলন হতে দেয়া হবে না বলে বক্তারা উল্লেখ করেন। প্রয়োজনে যদি দু-একটি লাশ ফেলতে হয়, তাদের কোনো আপত্তি নেই; এমন হুমকিও দেয়া হয়।
এই সাক্ষী বলেন, সারা দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় আন্দোলন বেগবান করতে আমরা রাতের আঁধারে বিভিন্ন জায়গায় বৈঠক করি। একই সাথে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়। এখানে ৮৬ জন সদস্য যুক্ত হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩ আগস্ট কুষ্টিয়া জেলায় মিছিলের আহ্বান জানাই। ওই দিন বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের সামনে আমরা আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেই। সেখান থেকে সাদ্দাম বাজার অভিমুখে মিছিল বের করি। সাদ্দাম বাজারে পৌঁছাতেই আমাদের সাথে যুক্ত হন কয়েক হাজার মানুষ। চৌড়হাস মোড় পর্যন্ত গিয়ে মজমপুরে এসে মিছিলটি শেষ করি আমরা।
এরই ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্ট মিছিল ডাকা হয়। বিভিন্ন উপজেলা থেকে লোকজনকে কুষ্টিয়া জেলা শহরে আসতে বলা হয়। শুধু কুমারখালী উপজেলার আন্দোলনকারীরা নিজেরা আন্দোলন করেন। আমি নিজেও কুমারখালী উপজেলা পরিষদের সামনে যাই। সেখান থেকে বেলা ২টা নাগাদ আমরা মিছিলসহ কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা হই। কুষ্টিয়ায় যাওয়ার পর চৌড়হাস মোড় থেকে বড় বাজার মোড় পর্যন্ত লাখও মানুষ অবস্থান নেন। এর মধ্যে বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার দিকে মজমপুর গেট থেকে পাঁচ রাস্তার মোড় (বর্তমানে শহীদ চত্বর) পর্যন্ত এলাকায় এপিসি থেকে টিয়ারশেল ছুড়তে থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান আন্দোলনকারীরা। আমি নিজেও ছিলাম। পরে পেছনের সড়ক দিয়ে রাস্তার মোড়ের দিকে যাই। কিন্তু গড়াই নদীর দিক থেকে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী আমাদের ওপর হামলা চালায়। এতে ১০-১৫ জন গুরুতর আহত হন।
৫ আগস্ট বেলা ২টার দিকে চারদিক থেকে মাহবুব-উল আলম হানিফের নির্দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালাতে থাকে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী ও পুলিশ। তাদের ছোড়া গুলিতে শহীদ হন ছয়জন। আহত হন শত শত আন্দোলনকারী। নিহতদের মধ্যে ১৪-১৫ বছরের আব্দুল্লাহও ছিলেন।
সাক্ষী আরো বলেন, হানিফের নির্দেশে এসব হত্যাকাণ্ডে সর্বাত্মক ভূমিকা পালন করেন এ মামলার আসামি আতাউর রহমান আতা, সদর উদ্দিন ও আজগর আলী। কুষ্টিয়া শহরে নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও শত শত মানুষকে আহত করার জন্য চার আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাকে জেরা করেন পলাতক আসামিদের পক্ষে সরকারি খরচে নিয়োগ পাওয়া স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী মো: আমির হোসেন। প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২১ জানুয়ারি দিন নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
সজীব ওয়াজেদ জয়ের আইনজীবী মনজুর আলম : জুলাই অভ্যুত্থানে ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহত্যায় উসকানির দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে মনজুর আলমকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
গতকাল বুধবার ট্রাইব্যুনাল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। গত ১৭ ডিসেম্বর পলাতক থাকা জয়ের পক্ষে এই আইনজীবীকে নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল অভিযোগ গঠনের শুনানি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের চিঠি ইস্যু না হওয়ায় শুনানির জন্য ১১ জানুয়ারি দিন নির্ধারণ করা হয়।
এদিকে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন এ মামলার অন্যতম আসামি সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক। তাকে গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তার হয়ে লড়ছেন আইনজীবী লিটন আহমেদ। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, সহিদুল ইসলামসহ অন্যরা।



















