ঢাকা ০৩:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র: টার্গেট কিলিংয়ের ছক আ’লীগের

নয়া দিগন্তের অনুসন্ধান
  • আপডেট সময় ১২:৩৭:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ২৪ বার পড়া হয়েছে

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বানচাল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে তারা নির্বাচন বানচালে হত্যাকাণ্ডসহ নাশকতার কাজে অস্ত্র ব্যবহার করার প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের প্রচারণায় ছদ্মবেশে নাশকতাসহ বিভিন্ন ধরনের হামলা চালাতে পারে বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ধারণা করছে।

গতকাল একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা বাংলাদেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে ভোট চাইছে। এই সুযোগ তারা কাজে লাগাতে বিদেশে পলাতক থাকা নেতাকর্মীদের কাছে ‘ধানমন্ডি ৩২’ টেলিগ্রাম ও ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে পরামর্শ নিচ্ছে। নেতাদের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা কাজ করছে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, পলাতক নেতাকর্মীরা যারা অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছিল তারা কেউ তা ফেরত দেয়নি। আসন্ন নির্বাচনে সেই অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। আবার অনেকেই চায়ের দোকানে বসে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টির একটি পথ খুঁজছে পতিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

অনেকে ছদ্মবেশে ক্যুপরামর্শ দিয়ে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দেয়ার জন্য ভোটকেন্দ্রে না যেতে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে।

এ দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে একদিকে রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে অন্য দিকে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিনিয়ত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। আর এসব ঘটনা মুহর্তের মধ্যে পতিত সরকারের নামে-বেনামে একদল সমর্থকগোষ্ঠী সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে দেশে একটি অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। নির্বাচন বানচালের ছক বাস্তবায়নে চূড়ান্তরূপে মরিয়া হয়ে উঠেছে পতিত আওয়ামী লীগ। যেকোনো মূল্যে নির্বাচন বানচাল করার জন্য টার্গেট কিলিংয়ের মতো মিশনের কথা ভাবছে পতিত দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। আর এই টার্গেটের শিকার হতে পারেন জুলাই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ নেতা, এমপি প্রার্থী ও যুক্তিতর্ক দিয়ে গণমাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন এমন ব্যক্তিরা। সংশ্লিষ্ট সূত্র, রাজনৈতিক সূত্র এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থার একাধিক সূত্র থেকে পতিত আওয়ামী লীগের টার্গেট কিলিংয়ের বিষয় সম্পর্কে জানা গেছে।

কিলিং মিশনে টার্গেট কারা : সূত্রের দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনের এমপি প্রার্থী ছিলেন। তার ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এ দেশে একটি বড় বলয় তৈরি হয়েছিল। তার জনপ্রিয়তা যখন আকাশচুম্বি ঠিক তখনি পরিকল্পিতভাবে খুব কাছ থেকেই হাদিকে গেল মাসে গুলি করে হত্যা করে আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান এবং তাকে সহযোগিতা করে আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী আলমগীর হোসেন শেখ। যদিও এর পেছনের মূল পরিকল্পনায় পতিত দলটির শীর্ষ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, ইলিয়াস মোল্লা এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। হাদিকে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ফেসবুকে বুনো উল্লাস করেন অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনের মতো ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগীরা। শাওনের ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন- ‘ব্রেইনসাফ’। গেল ৮ জানুয়ারি রাতে একইভাবে মোটরবাইকে তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজারে স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান ওরফে মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। নির্বাচন সামনে রেখে জুলাই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ নেতা, এমপি প্রার্থী ও যুক্তিতর্ক দিয়ে নির্বাচনের পক্ষে গণমাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন এমন ব্যক্তিরা টার্গেট কিলিং হতে পারেন- এমন আশঙ্কা রয়েছে। সেই হুমকিও দিয়ে রেখেছেন পতিত সরকারের একাধিক এমপি। পতিত দল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন ফেসবুকে সম্প্রতি এক পোস্টে লিখেন- ‘নো বোট, নো ভোট’।

নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে ব্যবহার : সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির জন্য নেশাখোর, ভবঘুরে, মদখোর, ডান্ডিখোর, ফুটপাথের টোকাই, ছিনতাইকারী, রিকশাচালকসহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উসকে দিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত করার চিন্তা রয়েছে। আর এর নেপথ্যে থাকবে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগসহ পতিত সরকারের দেশে অবস্থান করা শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। তারই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের এলাকায় নিরাপদ অবস্থান করছেন এবং তারা পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে নানামুখী ছদ্মবেশ ধারণ করে তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। পতিত আওয়ামী লীগের মধ্যমসারির নেতাদের আলাপ-আলোচনায়ও এমনটি উঠে এসেছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার মতে, আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম ভোট হতে যাচ্ছে। যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থাকবে না সেই নির্বাচন কিভাবে হয়- সেটা কিছুদিন পরেই টের পাওয়া যাবে। ওই নেতার আলাপে নির্বাচন ঠেকাতে সব ধরনের প্রচেষ্টার কথা উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতাকর্মী ভারতে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ বর্তমানে গোপন বৈঠক করছে। এ ছাড়া অনলাইনে নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগসহ নানা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি দেয়াসহ ধর্মীয় অপপ্রচার চালিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশে বাধাগ্রস্ত করার পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে ডিপ ফেক ভিডিও, মিথ্যা ভাষণ বা নকল বার্তা তৈরি করে অসত্য তথ্য প্রচার করতে পারে। গোয়েন্দারা জানান, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও পাবনা জেলার ১০টি আসনে চরমপন্থীদের তৎপরতা আছে। পার্বত্য জেলার তিন আসনে রয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, স্বার্থান্বেষী মহল ও আওয়ামী লীগ এসব চরমপন্থী গ্রুপ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারে আওয়ামী লীগ।

গোয়েন্দা সূত্র আরো জানায়, গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে পাঁচ হাজার ৭৬৩টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে চার হাজার ৪২৩টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এখনো উদ্ধার হয়নি এক হাজার ৩৪০টি অস্ত্র। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন ধরনের ১০ হাজার ৫০৬টি অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়। এগুলোর মধ্যে ৬৫৭টি অস্ত্র এখনো জমা পড়েনি। ধারণা করা হচ্ছে, এসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ সন্ত্রাসী, ডাকাত, ছিনতাইকারী, মাদককারবারি এবং কিশোর গ্যাংয়ের হাতে চলে গেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এসব অস্ত্র ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে।

সূত্র আরো জানায়, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ওপর আক্রমণ চালিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেয়া এবং থানা ঘেরাওসহ নানা কারণে পুলিশের মধ্যে এখনো ভীতি কাজ করছে। পুলিশের মনোবল দ্রুত চাঙা ও সক্রিয় করা না গেলে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ৫ আগস্টের পর যেসব শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিন পেয়েছে তারা চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে স্বার্থান্বেষী মহল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর অপচেষ্টা চালাতে পারে।

ওই সূত্র আরো জানায়, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, মাগুরা, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জসহ কয়েকটি জেলার ২৬টি আসনে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে শক্ত। দলটির কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা কম। এ ক্ষেত্রে ওইসব এলাকাসহ সারা দেশে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দলের প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটাতে পারে তারা। পাশাপাশি ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া, ভয়ভীতি দেখানো এবং নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চালানো হতে পারে। এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, পতিত সরকারের নেতাকর্মীরা এখনো দেশে থাকলেও পুলিশ তাদের নজরদারিতে রেখেছে। আমাদের গোয়েন্দা ইউনিটগুলো সার্বক্ষণিক তাদের গতিবিধি অনুসরণ করছে। আমরা আশাবাদী এই নির্বাচনে কোনো ধরনের অঘটন ঘটবে না। পুলিশের সবগুলো ইউনিটের পাশাপাশি র‌্যব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মাঠে কাজ করছে। তিনি আরো বলেন, নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা বিদেশে বসে অনেক ধরনের নির্দশনা দিয়ে থাকতে পারে। তবে তাদের সক্ষমতা নেই নির্বাচন বানচালের।

নিউজটি শেয়ার করুন

নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র: টার্গেট কিলিংয়ের ছক আ’লীগের

আপডেট সময় ১২:৩৭:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বানচাল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে তারা নির্বাচন বানচালে হত্যাকাণ্ডসহ নাশকতার কাজে অস্ত্র ব্যবহার করার প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের প্রচারণায় ছদ্মবেশে নাশকতাসহ বিভিন্ন ধরনের হামলা চালাতে পারে বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ধারণা করছে।

গতকাল একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা বাংলাদেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে ভোট চাইছে। এই সুযোগ তারা কাজে লাগাতে বিদেশে পলাতক থাকা নেতাকর্মীদের কাছে ‘ধানমন্ডি ৩২’ টেলিগ্রাম ও ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে পরামর্শ নিচ্ছে। নেতাদের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা কাজ করছে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, পলাতক নেতাকর্মীরা যারা অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছিল তারা কেউ তা ফেরত দেয়নি। আসন্ন নির্বাচনে সেই অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। আবার অনেকেই চায়ের দোকানে বসে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টির একটি পথ খুঁজছে পতিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

অনেকে ছদ্মবেশে ক্যুপরামর্শ দিয়ে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দেয়ার জন্য ভোটকেন্দ্রে না যেতে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে।

এ দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে একদিকে রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে অন্য দিকে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিনিয়ত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। আর এসব ঘটনা মুহর্তের মধ্যে পতিত সরকারের নামে-বেনামে একদল সমর্থকগোষ্ঠী সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে দেশে একটি অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। নির্বাচন বানচালের ছক বাস্তবায়নে চূড়ান্তরূপে মরিয়া হয়ে উঠেছে পতিত আওয়ামী লীগ। যেকোনো মূল্যে নির্বাচন বানচাল করার জন্য টার্গেট কিলিংয়ের মতো মিশনের কথা ভাবছে পতিত দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। আর এই টার্গেটের শিকার হতে পারেন জুলাই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ নেতা, এমপি প্রার্থী ও যুক্তিতর্ক দিয়ে গণমাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন এমন ব্যক্তিরা। সংশ্লিষ্ট সূত্র, রাজনৈতিক সূত্র এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থার একাধিক সূত্র থেকে পতিত আওয়ামী লীগের টার্গেট কিলিংয়ের বিষয় সম্পর্কে জানা গেছে।

কিলিং মিশনে টার্গেট কারা : সূত্রের দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনের এমপি প্রার্থী ছিলেন। তার ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এ দেশে একটি বড় বলয় তৈরি হয়েছিল। তার জনপ্রিয়তা যখন আকাশচুম্বি ঠিক তখনি পরিকল্পিতভাবে খুব কাছ থেকেই হাদিকে গেল মাসে গুলি করে হত্যা করে আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান এবং তাকে সহযোগিতা করে আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী আলমগীর হোসেন শেখ। যদিও এর পেছনের মূল পরিকল্পনায় পতিত দলটির শীর্ষ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, ইলিয়াস মোল্লা এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। হাদিকে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ফেসবুকে বুনো উল্লাস করেন অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনের মতো ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগীরা। শাওনের ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন- ‘ব্রেইনসাফ’। গেল ৮ জানুয়ারি রাতে একইভাবে মোটরবাইকে তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজারে স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান ওরফে মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। নির্বাচন সামনে রেখে জুলাই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ নেতা, এমপি প্রার্থী ও যুক্তিতর্ক দিয়ে নির্বাচনের পক্ষে গণমাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন এমন ব্যক্তিরা টার্গেট কিলিং হতে পারেন- এমন আশঙ্কা রয়েছে। সেই হুমকিও দিয়ে রেখেছেন পতিত সরকারের একাধিক এমপি। পতিত দল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন ফেসবুকে সম্প্রতি এক পোস্টে লিখেন- ‘নো বোট, নো ভোট’।

নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে ব্যবহার : সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির জন্য নেশাখোর, ভবঘুরে, মদখোর, ডান্ডিখোর, ফুটপাথের টোকাই, ছিনতাইকারী, রিকশাচালকসহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উসকে দিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত করার চিন্তা রয়েছে। আর এর নেপথ্যে থাকবে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগসহ পতিত সরকারের দেশে অবস্থান করা শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। তারই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের এলাকায় নিরাপদ অবস্থান করছেন এবং তারা পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে নানামুখী ছদ্মবেশ ধারণ করে তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। পতিত আওয়ামী লীগের মধ্যমসারির নেতাদের আলাপ-আলোচনায়ও এমনটি উঠে এসেছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার মতে, আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম ভোট হতে যাচ্ছে। যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থাকবে না সেই নির্বাচন কিভাবে হয়- সেটা কিছুদিন পরেই টের পাওয়া যাবে। ওই নেতার আলাপে নির্বাচন ঠেকাতে সব ধরনের প্রচেষ্টার কথা উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতাকর্মী ভারতে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ বর্তমানে গোপন বৈঠক করছে। এ ছাড়া অনলাইনে নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগসহ নানা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি দেয়াসহ ধর্মীয় অপপ্রচার চালিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশে বাধাগ্রস্ত করার পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে ডিপ ফেক ভিডিও, মিথ্যা ভাষণ বা নকল বার্তা তৈরি করে অসত্য তথ্য প্রচার করতে পারে। গোয়েন্দারা জানান, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও পাবনা জেলার ১০টি আসনে চরমপন্থীদের তৎপরতা আছে। পার্বত্য জেলার তিন আসনে রয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, স্বার্থান্বেষী মহল ও আওয়ামী লীগ এসব চরমপন্থী গ্রুপ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারে আওয়ামী লীগ।

গোয়েন্দা সূত্র আরো জানায়, গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে পাঁচ হাজার ৭৬৩টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে চার হাজার ৪২৩টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এখনো উদ্ধার হয়নি এক হাজার ৩৪০টি অস্ত্র। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন ধরনের ১০ হাজার ৫০৬টি অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়। এগুলোর মধ্যে ৬৫৭টি অস্ত্র এখনো জমা পড়েনি। ধারণা করা হচ্ছে, এসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ সন্ত্রাসী, ডাকাত, ছিনতাইকারী, মাদককারবারি এবং কিশোর গ্যাংয়ের হাতে চলে গেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এসব অস্ত্র ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে।

সূত্র আরো জানায়, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ওপর আক্রমণ চালিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেয়া এবং থানা ঘেরাওসহ নানা কারণে পুলিশের মধ্যে এখনো ভীতি কাজ করছে। পুলিশের মনোবল দ্রুত চাঙা ও সক্রিয় করা না গেলে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ৫ আগস্টের পর যেসব শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিন পেয়েছে তারা চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে স্বার্থান্বেষী মহল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর অপচেষ্টা চালাতে পারে।

ওই সূত্র আরো জানায়, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, মাগুরা, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিরাজগঞ্জসহ কয়েকটি জেলার ২৬টি আসনে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে শক্ত। দলটির কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা কম। এ ক্ষেত্রে ওইসব এলাকাসহ সারা দেশে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দলের প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটাতে পারে তারা। পাশাপাশি ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া, ভয়ভীতি দেখানো এবং নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চালানো হতে পারে। এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, পতিত সরকারের নেতাকর্মীরা এখনো দেশে থাকলেও পুলিশ তাদের নজরদারিতে রেখেছে। আমাদের গোয়েন্দা ইউনিটগুলো সার্বক্ষণিক তাদের গতিবিধি অনুসরণ করছে। আমরা আশাবাদী এই নির্বাচনে কোনো ধরনের অঘটন ঘটবে না। পুলিশের সবগুলো ইউনিটের পাশাপাশি র‌্যব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মাঠে কাজ করছে। তিনি আরো বলেন, নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা বিদেশে বসে অনেক ধরনের নির্দশনা দিয়ে থাকতে পারে। তবে তাদের সক্ষমতা নেই নির্বাচন বানচালের।