ঢাকা ০৬:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধাবসান: চুক্তিস্বাক্ষর হবে শুক্রবার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৪:১১:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
  • / ২৪ বার পড়া হয়েছে

দীর্ঘ ১০৬ দিনের রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী সঙ্ঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধাবসানের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ২০২৬ সালের ১৫ জুন প্রকাশিত আলজাজিরার এক লাইভ আপডেট প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দুই দেশই একটি সমঝোতা স্মারক বা ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ চূড়ান্ত করেছে। ইরানের পক্ষ থেকে এটিকে সব ফ্রন্টে, বিশেষ করে লেবাননে যুদ্ধাবসানের একটি চুক্তি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার নতুন আশার আলো দেখালেও এর স্থায়িত্ব ও কৌশলগত শর্তাবলি নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। চলতি সপ্তাহের আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এ চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে।

প্রাথমিক খসড়া অনুযায়ী, এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার সামরিক বৈরিতার অবসান ঘটবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পথ সুগম হবে। তবে চুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো কুয়াশাচ্ছন্ন।

তেহরান থেকে আলজাজিরার প্রতিনিধি তৌহিদ আসাদি জানান, ইরান এই চুক্তিকে নিজেদের একটি বড় বিজয় হিসেবে প্রচার করছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেছেন লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি এই সমঝোতায় স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা তেহরানের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল। এ ছাড়া অতীতে এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধে (জুন ২০২৫ এবং পরবর্তী সময়ে) হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং ইরানের অবরুদ্ধ অর্থ ছাড়ের দাবিও এই চুক্তির অংশ।

তবে ওয়াশিংটন থেকে আলজাজিরার প্রতিনিধি অ্যালান ফিশার জানান, মার্কিন প্রশাসন বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দাবি করছে যে, তারা ওবামা আমলের চেয়েও অনেক ভালো একটি চুক্তি করতে সক্ষম হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট করেছেন ইরানকে কোনো নগদ অর্থ দেয়া হচ্ছে না। এই পরস্পরবিরোধী বয়ানের কারণে চুক্তির ভেতরের সুনির্দিষ্ট মেকানিজম বা পদ্ধতিগুলো এখনো সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়।

হরমুজ প্রণালী : শুল্ক বিতর্ক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি

এই যুদ্ধের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা ছিল হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া। বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারের জন্য অন্যতম লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই প্রণালীটি চালুর বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল শুরু করেছে, যার মধ্যে অনেকগুলোই তেল বোঝাই।’ তিনি একে ‘সাউদার্ন হাইওয়ে’ হিসেবে উল্লেখ করে নিরাপদ পথ বলে দাবি করেন।

তবে হরমুজ প্রণালী ব্যবহারের শর্ত নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ইরান ও ওমান যৌথভাবে ঘোষণা করেছে এই প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে ‘পরিষেবা শুল্ক’ নেয়া হবে। ইসমাইল বাঘাই জানান, আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং এই জলপথের পরিবেশ ও সার্বিক সুরক্ষায় ইরান-ওমান যে বিপুল অর্থ ব্যয় করবে, তার জন্য এই ফি আদায় অত্যন্ত যৌক্তিক।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিএনবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা এই প্রণালী দীর্ঘমেয়াদে সম্পূর্ণ ‘টোল-মুক্ত’ থাকবে। তবে এ-সংক্রান্ত টেকনিক্যাল আলোচনা এখনো বাকি রয়েছে। এ দিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের টোল বা শুল্ক আরোপ বরদাশত করা হবে না। প্রয়োজনে ফরাসি বিমানবাহী রণতরী ‘চার্লস ডি গল’ আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ওই অঞ্চলে মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

পাশাপাশি আরেকটি বড় সঙ্কট হলো নৌ মাইন। সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধকালীন সময়ে হরমুজ প্রণালীতে পেতে রাখা মাইনগুলো পরিষ্কার করতে উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন এবং মাইনসুইপারের অন্তত ৪০ থেকে ৫০ দিন সময় লাগবে। ফলে চুক্তি হলেও আন্তর্জাতিক বীমা এবং জাহাজ সংস্থাগুলো এখনই এই পথ ব্যবহারে পুরোপুরি আস্থা পাচ্ছে না।

লেবানন পরিস্থিতি ও ইসরাইলের তীব্র বিরোধিতা

এই চুক্তিতে লেবাননের সার্বভৌমত্ব এবং যুদ্ধবিরতি অন্তর্ভুক্ত থাকাকে ইরানের একটি বড় কূটনৈতিক জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আলী আকবর দারেইনি বলেন, ‘এই চুক্তি লেবানন এবং বিশেষ করে হিজবুল্লাহর প্রতি ইরানের গভীর প্রতিশ্রুতির প্রমাণ। এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি বড় পরীক্ষা যে তিনি ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার রাজনৈতিক সদিচ্ছা রাখেন কি না।’

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সালাম বলেন, তারা এখন তাদের ভূমি থেকে সম্পূর্ণ ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং বন্দীদের মুক্তির জন্য দ্বিগুণ প্রচেষ্টা চালাবেন।

তবে এই চুক্তিকে নিজেদের জন্য ‘কৌশলগত পরাজয়’ হিসেবে দেখছে ইসরাইল। দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পার্টির প্রধান বেনি গান্তজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই লেবাননে ইসরাইলের সামরিক স্বাধীনতা খর্ব করা বা উত্তর অঞ্চলের বাসিন্দাদের ঝুঁকিতে ফেলে সেনা প্রত্যাহার মেনে নেয়া যায় না।’ ইসরাইলের অতি-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচও এই চুক্তির বিরোধিতা করেছেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান ‘সৃজনশীল উপায়ে’ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

ফিলিস্তিন ও গাজার বাস্তব চিত্র

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির এই আবহ যখন তৈরি হচ্ছে, তখনো গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন থামেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় গাজায় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় এক শিশুসহ আরও বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই চলমান গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার তিনজনে পৌঁছেছে এবং আহত হয়েছেন এক লাখ ৭৩ হাজার ২৫২ জন। গত অক্টোবর থেকে নামমাত্র ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর থাকলেও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী নিয়মিতভাবে গাজার অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে চুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছে।

একই সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরাইলের অতি-ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা করলেও সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাবে তা ব্যর্থ হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের ওপর নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ফ্রান্স ইতিমধ্যে বেন-গভিরের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং ইতালিতে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও অর্থনৈতিক প্রভাব

বিশ্বের প্রধান প্রধান শক্তিগুলো এই চুক্তিকে সাধুবাদ জানিয়েছে। চীন, সৌদি আরব, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও স্পেন এই সমঝোতাকে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি একে ‘কূটনীতি ও কা-জ্ঞানের এক সময়োপযোগী জয়’ বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লেয়েন কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়ে বলেছেন, ইরানের ওপর থেকে মানবাধিকার ও গণবিধ্বংসী অস্ত্রসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা তখনই প্রত্যাহার করা হবে, যখন মাটিতে ইরানের ‘আচরণে বিশ্বাসযোগ্য এবং যাচাইযোগ্য পরিবর্তন’ দেখা যাবে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই চুক্তির ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা গেছে। যুদ্ধ থামার খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর সুদের হার বাড়ানোর চাপ কমবে- এই আশায় ওয়াল স্ট্রিটের মূল সূচকগুলো চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। ডাও জোন্স ০.৩২%, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ১.১৫% এবং নাসডাক কম্পোজিট ২.১৬% বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাকিস্তানের ঐতিহাসিক কূটনীতি ও বিশ্বনেতাদের প্রশংসা

চলতি ২০২৬ সালের এই অন্যতম বৃহৎ ভূরাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধানে ইসলামাদাবাদ যে পরিপক্বতা দেখিয়েছে, তা বিশ্ব রাজনীতিতে পাকিস্তানের অবস্থানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সোমবার ভোররাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রথম ঘোষণা করেন দু’পক্ষের মধ্যে চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়েছে। এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক বার্তায় তিনি জানান, ‘এই চুক্তিতে লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।’

পাকিস্তানের এই যুগান্তকারী মধ্যস্থতার পর বিশ্বনেতাদের প্রশংসায় ভাসছে দেশটি : তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান অসাধারণ মধ্যস্থতার জন্য পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি কাতার ও সৌদি আরবের কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আলে ছানিও ইসলামাবাদের ভূমিকাকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই সাফল্যের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, পাকিস্তান ও কাতারকে অভিনন্দন জানিয়ে একে ‘শান্তির বড় সুযোগ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্টোনিও কস্তা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কুয়েত ও নেদারল্যান্ডসের নেতারা পাকিস্তানের গঠনমূলক ভূমিকার গভীর প্রশংসা করেছেন। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিতসু মোতেগি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দারকে টেলিফোনে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

৬০ দিনের রূপরেখা : চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি

রয়টার্স ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। খসড়া সমঝোতার মূল শর্তগুলো নিচে দেয়া হলো :

ক. নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালী : চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে, যা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে। বিনিময়ে ইরান অবিলম্বে সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে বিশ্বজুড়ে জাহাজের ইঞ্জিন চালু করার আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন, ‘তেল প্রবাহিত হতে দাও!’

খ. আর্থিক সুবিধা ও অবরুদ্ধ ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় : চুক্তির সবচেয়ে বড় চমক হলো, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের স্থগিত রাখা ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় করতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি নগদ অর্থ স্থানান্তর, আঞ্চলিক দেশগুলোর আর্থিক সহযোগিতা এবং বিশেষ ঋণসুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ ছাড়াও চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে।

গ. পারমাণবিক ও পুনর্গঠন পরিকল্পনা : পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান সম্মত হয়েছে যে তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তেহরান অতিরিক্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পারমাণবিক স্থাপনার সম্প্রসারণ থেকে বিরত থাকবে। তবে সবচেয়ে বড় ছাড় হিসেবে ভবিষ্যতের পূর্ণাঙ্গ চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডেই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ লঘু (ডাইলিউট) করার অনুমতি দেবে। একই সাথে ওয়াশিংটন তার আঞ্চলিক মিত্রদের নিয়ে ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তুত করবে।

তেলের বাজারে স্বস্তি ও এশিয়ার শেয়ার বাজার চাঙ্গা : চুক্তির খবর আন্তর্জাতিক বাজারে আসার সাথে সাথেই বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিবাচক হাওয়া বইতে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের দাম নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্টের অপরিশোধিত তেলের মূল্য ৪ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের তেলের মূল্য ৪.৫ শতাংশ কমে গেছে। তেলের মূল্য হ্রাসের এ খবরে এশিয়ার প্রধান প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে ব্যাপক চাঙ্গা ভাব লক্ষ করা গেছে।

ক্ষুব্ধ ইসরাইল: ‘বাজে চুক্তি’র আখ্যা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই ঐতিহাসিক সমঝোতায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইসরাইল। চুক্তির সম্ভাব্য কাঠামো ও ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই ইসরাইলের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্কের ঝড় উঠেছে। ইসরাইলের প্রভাবশালী হিব্রু দৈনিক ‘ইয়েদিওত আহরোনত’ এই সমঝোতাকে সরাসরি একটি ‘বাজে চুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ অসন্তোষ নয়; বরং ইরানকে ঘিরে ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশল এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের একক সামরিক প্রভাবের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বিপর্যয়। যদিও ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে তারা এই আলোচনার অংশ নয়, তবে তাদের চরম অনীহা সত্ত্বেও মার্কিন প্রশাসন ও ইরান যেভাবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে গেছে, তা তেল আবিবকে আঞ্চলিকভাবে অনেকটাই কোণঠাসা করে ফেলেছে।

সামগ্রিক মূল্যায়ন

পাকিস্তান, কাতার ও সৌদি আরবের সমন্বিত কূটনীতি মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে। আগামী শুক্রবার জেনেভায় এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ৬০ দিনের যে কাউন্টডাউন শুরু হবে, তা মূলত নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক ও কৌশলগত ভবিষ্যৎ। ইসরাইলের তীব্র বিরোধিতা এবং লেবাননে হিজবুল্লাহ-ইসরাইল সঙ্ঘাতের স্থায়ী সমাধান কিভাবে নিশ্চিত হয়- সেটিই এখন দেখার বিষয়। মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার বিতর্ক এবং গভীর অবিশ্বাস।

যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডার ফুরিয়ে আসছে কি না, তা নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত মাসে মার্কিন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হং কাও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ইরান যুদ্ধের কারণে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি স্থগিত করতে হয়েছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সিবিএস টেলিভিশনে এই দাবিকে সংবাদমাধ্যমের ‘মনগড়া গল্প’ বলে উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার আগের চেয়েও শক্তিশালী এবং তারা বর্তমানে ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গোলাবারুদ তৈরি করছে।

সব কিছুর ঊর্ধ্বে, এই চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যেই রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক অবিশ্বাস। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ১৯৫৩ সালের মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক ইরানের গণতান্ত্রিক মোসাদ্দেক সরকারকে উৎখাতের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমেরিকার ওপর আমাদের এই অবিশ্বাস অত্যন্ত গভীর। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে তাদের এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।’ তিনি আরো স্পষ্ট করেন যে, এই চুক্তির মানে এই নয় যে ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে হওয়া কোনো অপরাধ তেহরান ভুলে যাবে বা ক্ষমা করে দেবে।

১০৬ দিনের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের অবসান নিঃসন্দেহে বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর। তবে জেনেভায় শুক্রবার চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত অনেক সমীকরণই বদলে যেতে পারে। এক দিকে যেমন হরমুজ প্রণালীর শুল্ক ও মাইন অপসারণের মতো প্রযুক্তিগত জটিলতা রয়েছে, অন্য দিকে ইসরাইলের পক্ষ থেকে এই চুক্তি নস্যাৎ করার তীব্র হুমকি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ভঙ্গুর শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে নাকি এটি কেবলই একটি সাময়িক ‘সমঝোতার আড়ালে ভুল বোঝাবুঝি’ হয়ে থাকবে, তা আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের কূটনৈতিক পরিপক্বতার ওপর নির্ভর করছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধাবসান: চুক্তিস্বাক্ষর হবে শুক্রবার

আপডেট সময় ০৪:১১:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

দীর্ঘ ১০৬ দিনের রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী সঙ্ঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধাবসানের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ২০২৬ সালের ১৫ জুন প্রকাশিত আলজাজিরার এক লাইভ আপডেট প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দুই দেশই একটি সমঝোতা স্মারক বা ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ চূড়ান্ত করেছে। ইরানের পক্ষ থেকে এটিকে সব ফ্রন্টে, বিশেষ করে লেবাননে যুদ্ধাবসানের একটি চুক্তি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার নতুন আশার আলো দেখালেও এর স্থায়িত্ব ও কৌশলগত শর্তাবলি নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। চলতি সপ্তাহের আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এ চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে।

প্রাথমিক খসড়া অনুযায়ী, এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার সামরিক বৈরিতার অবসান ঘটবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পথ সুগম হবে। তবে চুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো কুয়াশাচ্ছন্ন।

তেহরান থেকে আলজাজিরার প্রতিনিধি তৌহিদ আসাদি জানান, ইরান এই চুক্তিকে নিজেদের একটি বড় বিজয় হিসেবে প্রচার করছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেছেন লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি এই সমঝোতায় স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা তেহরানের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল। এ ছাড়া অতীতে এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধে (জুন ২০২৫ এবং পরবর্তী সময়ে) হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং ইরানের অবরুদ্ধ অর্থ ছাড়ের দাবিও এই চুক্তির অংশ।

তবে ওয়াশিংটন থেকে আলজাজিরার প্রতিনিধি অ্যালান ফিশার জানান, মার্কিন প্রশাসন বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দাবি করছে যে, তারা ওবামা আমলের চেয়েও অনেক ভালো একটি চুক্তি করতে সক্ষম হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট করেছেন ইরানকে কোনো নগদ অর্থ দেয়া হচ্ছে না। এই পরস্পরবিরোধী বয়ানের কারণে চুক্তির ভেতরের সুনির্দিষ্ট মেকানিজম বা পদ্ধতিগুলো এখনো সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়।

হরমুজ প্রণালী : শুল্ক বিতর্ক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি

এই যুদ্ধের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা ছিল হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া। বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারের জন্য অন্যতম লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই প্রণালীটি চালুর বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল শুরু করেছে, যার মধ্যে অনেকগুলোই তেল বোঝাই।’ তিনি একে ‘সাউদার্ন হাইওয়ে’ হিসেবে উল্লেখ করে নিরাপদ পথ বলে দাবি করেন।

তবে হরমুজ প্রণালী ব্যবহারের শর্ত নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ইরান ও ওমান যৌথভাবে ঘোষণা করেছে এই প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে ‘পরিষেবা শুল্ক’ নেয়া হবে। ইসমাইল বাঘাই জানান, আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং এই জলপথের পরিবেশ ও সার্বিক সুরক্ষায় ইরান-ওমান যে বিপুল অর্থ ব্যয় করবে, তার জন্য এই ফি আদায় অত্যন্ত যৌক্তিক।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিএনবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা এই প্রণালী দীর্ঘমেয়াদে সম্পূর্ণ ‘টোল-মুক্ত’ থাকবে। তবে এ-সংক্রান্ত টেকনিক্যাল আলোচনা এখনো বাকি রয়েছে। এ দিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের টোল বা শুল্ক আরোপ বরদাশত করা হবে না। প্রয়োজনে ফরাসি বিমানবাহী রণতরী ‘চার্লস ডি গল’ আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ওই অঞ্চলে মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

পাশাপাশি আরেকটি বড় সঙ্কট হলো নৌ মাইন। সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধকালীন সময়ে হরমুজ প্রণালীতে পেতে রাখা মাইনগুলো পরিষ্কার করতে উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন এবং মাইনসুইপারের অন্তত ৪০ থেকে ৫০ দিন সময় লাগবে। ফলে চুক্তি হলেও আন্তর্জাতিক বীমা এবং জাহাজ সংস্থাগুলো এখনই এই পথ ব্যবহারে পুরোপুরি আস্থা পাচ্ছে না।

লেবানন পরিস্থিতি ও ইসরাইলের তীব্র বিরোধিতা

এই চুক্তিতে লেবাননের সার্বভৌমত্ব এবং যুদ্ধবিরতি অন্তর্ভুক্ত থাকাকে ইরানের একটি বড় কূটনৈতিক জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আলী আকবর দারেইনি বলেন, ‘এই চুক্তি লেবানন এবং বিশেষ করে হিজবুল্লাহর প্রতি ইরানের গভীর প্রতিশ্রুতির প্রমাণ। এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি বড় পরীক্ষা যে তিনি ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার রাজনৈতিক সদিচ্ছা রাখেন কি না।’

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সালাম বলেন, তারা এখন তাদের ভূমি থেকে সম্পূর্ণ ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং বন্দীদের মুক্তির জন্য দ্বিগুণ প্রচেষ্টা চালাবেন।

তবে এই চুক্তিকে নিজেদের জন্য ‘কৌশলগত পরাজয়’ হিসেবে দেখছে ইসরাইল। দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পার্টির প্রধান বেনি গান্তজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই লেবাননে ইসরাইলের সামরিক স্বাধীনতা খর্ব করা বা উত্তর অঞ্চলের বাসিন্দাদের ঝুঁকিতে ফেলে সেনা প্রত্যাহার মেনে নেয়া যায় না।’ ইসরাইলের অতি-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচও এই চুক্তির বিরোধিতা করেছেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান ‘সৃজনশীল উপায়ে’ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

ফিলিস্তিন ও গাজার বাস্তব চিত্র

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির এই আবহ যখন তৈরি হচ্ছে, তখনো গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন থামেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় গাজায় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় এক শিশুসহ আরও বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই চলমান গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার তিনজনে পৌঁছেছে এবং আহত হয়েছেন এক লাখ ৭৩ হাজার ২৫২ জন। গত অক্টোবর থেকে নামমাত্র ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর থাকলেও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী নিয়মিতভাবে গাজার অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে চুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছে।

একই সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরাইলের অতি-ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা করলেও সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাবে তা ব্যর্থ হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের ওপর নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ফ্রান্স ইতিমধ্যে বেন-গভিরের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং ইতালিতে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও অর্থনৈতিক প্রভাব

বিশ্বের প্রধান প্রধান শক্তিগুলো এই চুক্তিকে সাধুবাদ জানিয়েছে। চীন, সৌদি আরব, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও স্পেন এই সমঝোতাকে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি একে ‘কূটনীতি ও কা-জ্ঞানের এক সময়োপযোগী জয়’ বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লেয়েন কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়ে বলেছেন, ইরানের ওপর থেকে মানবাধিকার ও গণবিধ্বংসী অস্ত্রসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা তখনই প্রত্যাহার করা হবে, যখন মাটিতে ইরানের ‘আচরণে বিশ্বাসযোগ্য এবং যাচাইযোগ্য পরিবর্তন’ দেখা যাবে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই চুক্তির ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা গেছে। যুদ্ধ থামার খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর সুদের হার বাড়ানোর চাপ কমবে- এই আশায় ওয়াল স্ট্রিটের মূল সূচকগুলো চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। ডাও জোন্স ০.৩২%, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ১.১৫% এবং নাসডাক কম্পোজিট ২.১৬% বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাকিস্তানের ঐতিহাসিক কূটনীতি ও বিশ্বনেতাদের প্রশংসা

চলতি ২০২৬ সালের এই অন্যতম বৃহৎ ভূরাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধানে ইসলামাদাবাদ যে পরিপক্বতা দেখিয়েছে, তা বিশ্ব রাজনীতিতে পাকিস্তানের অবস্থানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সোমবার ভোররাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রথম ঘোষণা করেন দু’পক্ষের মধ্যে চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়েছে। এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক বার্তায় তিনি জানান, ‘এই চুক্তিতে লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।’

পাকিস্তানের এই যুগান্তকারী মধ্যস্থতার পর বিশ্বনেতাদের প্রশংসায় ভাসছে দেশটি : তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান অসাধারণ মধ্যস্থতার জন্য পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি কাতার ও সৌদি আরবের কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আলে ছানিও ইসলামাবাদের ভূমিকাকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই সাফল্যের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, পাকিস্তান ও কাতারকে অভিনন্দন জানিয়ে একে ‘শান্তির বড় সুযোগ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্টোনিও কস্তা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কুয়েত ও নেদারল্যান্ডসের নেতারা পাকিস্তানের গঠনমূলক ভূমিকার গভীর প্রশংসা করেছেন। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিতসু মোতেগি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দারকে টেলিফোনে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

৬০ দিনের রূপরেখা : চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি

রয়টার্স ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। খসড়া সমঝোতার মূল শর্তগুলো নিচে দেয়া হলো :

ক. নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালী : চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে, যা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে। বিনিময়ে ইরান অবিলম্বে সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে বিশ্বজুড়ে জাহাজের ইঞ্জিন চালু করার আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন, ‘তেল প্রবাহিত হতে দাও!’

খ. আর্থিক সুবিধা ও অবরুদ্ধ ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় : চুক্তির সবচেয়ে বড় চমক হলো, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের স্থগিত রাখা ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় করতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি নগদ অর্থ স্থানান্তর, আঞ্চলিক দেশগুলোর আর্থিক সহযোগিতা এবং বিশেষ ঋণসুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ ছাড়াও চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে।

গ. পারমাণবিক ও পুনর্গঠন পরিকল্পনা : পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান সম্মত হয়েছে যে তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তেহরান অতিরিক্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পারমাণবিক স্থাপনার সম্প্রসারণ থেকে বিরত থাকবে। তবে সবচেয়ে বড় ছাড় হিসেবে ভবিষ্যতের পূর্ণাঙ্গ চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডেই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ লঘু (ডাইলিউট) করার অনুমতি দেবে। একই সাথে ওয়াশিংটন তার আঞ্চলিক মিত্রদের নিয়ে ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তুত করবে।

তেলের বাজারে স্বস্তি ও এশিয়ার শেয়ার বাজার চাঙ্গা : চুক্তির খবর আন্তর্জাতিক বাজারে আসার সাথে সাথেই বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিবাচক হাওয়া বইতে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের দাম নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্টের অপরিশোধিত তেলের মূল্য ৪ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের তেলের মূল্য ৪.৫ শতাংশ কমে গেছে। তেলের মূল্য হ্রাসের এ খবরে এশিয়ার প্রধান প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে ব্যাপক চাঙ্গা ভাব লক্ষ করা গেছে।

ক্ষুব্ধ ইসরাইল: ‘বাজে চুক্তি’র আখ্যা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই ঐতিহাসিক সমঝোতায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইসরাইল। চুক্তির সম্ভাব্য কাঠামো ও ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই ইসরাইলের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্কের ঝড় উঠেছে। ইসরাইলের প্রভাবশালী হিব্রু দৈনিক ‘ইয়েদিওত আহরোনত’ এই সমঝোতাকে সরাসরি একটি ‘বাজে চুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ অসন্তোষ নয়; বরং ইরানকে ঘিরে ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশল এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের একক সামরিক প্রভাবের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বিপর্যয়। যদিও ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে তারা এই আলোচনার অংশ নয়, তবে তাদের চরম অনীহা সত্ত্বেও মার্কিন প্রশাসন ও ইরান যেভাবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে গেছে, তা তেল আবিবকে আঞ্চলিকভাবে অনেকটাই কোণঠাসা করে ফেলেছে।

সামগ্রিক মূল্যায়ন

পাকিস্তান, কাতার ও সৌদি আরবের সমন্বিত কূটনীতি মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে। আগামী শুক্রবার জেনেভায় এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ৬০ দিনের যে কাউন্টডাউন শুরু হবে, তা মূলত নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক ও কৌশলগত ভবিষ্যৎ। ইসরাইলের তীব্র বিরোধিতা এবং লেবাননে হিজবুল্লাহ-ইসরাইল সঙ্ঘাতের স্থায়ী সমাধান কিভাবে নিশ্চিত হয়- সেটিই এখন দেখার বিষয়। মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার বিতর্ক এবং গভীর অবিশ্বাস।

যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডার ফুরিয়ে আসছে কি না, তা নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত মাসে মার্কিন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হং কাও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ইরান যুদ্ধের কারণে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি স্থগিত করতে হয়েছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সিবিএস টেলিভিশনে এই দাবিকে সংবাদমাধ্যমের ‘মনগড়া গল্প’ বলে উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার আগের চেয়েও শক্তিশালী এবং তারা বর্তমানে ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গোলাবারুদ তৈরি করছে।

সব কিছুর ঊর্ধ্বে, এই চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যেই রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক অবিশ্বাস। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ১৯৫৩ সালের মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক ইরানের গণতান্ত্রিক মোসাদ্দেক সরকারকে উৎখাতের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমেরিকার ওপর আমাদের এই অবিশ্বাস অত্যন্ত গভীর। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে তাদের এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।’ তিনি আরো স্পষ্ট করেন যে, এই চুক্তির মানে এই নয় যে ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে হওয়া কোনো অপরাধ তেহরান ভুলে যাবে বা ক্ষমা করে দেবে।

১০৬ দিনের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের অবসান নিঃসন্দেহে বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর। তবে জেনেভায় শুক্রবার চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত অনেক সমীকরণই বদলে যেতে পারে। এক দিকে যেমন হরমুজ প্রণালীর শুল্ক ও মাইন অপসারণের মতো প্রযুক্তিগত জটিলতা রয়েছে, অন্য দিকে ইসরাইলের পক্ষ থেকে এই চুক্তি নস্যাৎ করার তীব্র হুমকি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ভঙ্গুর শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে নাকি এটি কেবলই একটি সাময়িক ‘সমঝোতার আড়ালে ভুল বোঝাবুঝি’ হয়ে থাকবে, তা আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের কূটনৈতিক পরিপক্বতার ওপর নির্ভর করছে।