ভারতে মুসলিম নিধনে ব্যবহৃত স্লোগান ‘জয় শ্রী রাম’ বাংলাদেশে প্রকাশ্য মিছিলে
- আপডেট সময় ০৫:০৯:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
- / ২৮ বার পড়া হয়েছে
গাইবান্ধায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবতা শ্রী রামচন্দ্রের ছবি বা প্রতিমার কথিত অবমাননাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশজুড়ে পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক উস্কানি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি এই ঘটনার প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ভারতের চরমপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের বহুল বিতর্কিত ও রাজনৈতিক স্লোগান ‘জয় শ্রী রাম’ ব্যবহারের ঘটনায় তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে আয়োজিত মশাল মিছিলে এই স্লোগানটি উচ্চারিত হওয়ায় বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। নেটিজেন এবং বিশ্লেষকদের অনেকেই এই ঘটনার নেপথ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ইন্ধন এবং গভীর ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের আভাস দেখছেন।
গত ১৬ জুন মধ্যরাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) সনাতন বিদ্যার্থী সংসদের উদ্যোগে একটি মশাল মিছিল বের হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির থেকে শুরু হওয়া এই মিছিলে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীরা ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দেন। এর আগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশেও একই দাবিতে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলে এই বিতর্কিত স্লোগানটি শোনা যায়।
প্রতিবাদের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে। বিভিন্ন সনাতনী সংগঠনের ব্যানারে আয়োজিত বিশাল মশাল মিছিল থেকে শাহবাগের রাজপথে প্রকম্পিত হয় ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান। মিছিলকারীরা ‘আমার মাটি, আমার মা, বাংলাদেশ ছাড়ব না’, ‘এক দেশ দুই বিচার, চলবে না চলবে না’ ইত্যাদি স্লোগান দিলেও, সবার মনোযোগ কাড়ে ভারতে মুসলিম নিপীড়নের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনিটি। বাংলাদেশের মতো একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে প্রকাশ্য রাজপথে এই উগ্র রাজনৈতিক স্লোগানের অনুপ্রবেশকে সাধারণ মানুষ ও নেটিজেনরা সহজভাবে নিতে পারছেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, ঐতিহাসিকভাবে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানটি হিন্দুধর্মের একাংশের ভগবান রামের প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সম্ভাষণের একটি মাধ্যম ছিল। তবে, আশির দশকের শেষভাগে ভারতে ‘রাম জন্মভূমি আন্দোলন’ এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময়কাল থেকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)-এর মতো সংগঠনগুলো এটিকে রাজনৈতিক রূপ দিতে শুরু করে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পথচলতি বা গণপিটুনির শিকার মুসলিম যুবকদের জোরপূর্বক ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে বাধ্য করার অসংখ্য ভিডিও ও খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাবরেজ আনসারী, আসিফ খান বা পেহলু খানের মতো অসংখ্য মুসলিমকে পিটিয়ে হত্যার সময় উগ্রবাদী জনতা এই স্লোগানটিকে রণধ্বনি হিসেবে ব্যবহার করেছে। ২০২০ সালের দিল্লির দাঙ্গা কিংবা অতি সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রামনবমীর শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও মসজিদে হামলা ও অগ্নিসংযোগের সময় এই স্লোগানটি দিয়েই উন্মত্ত জনতাকে উত্তেজিত করা হয়েছে। এমনকি তথাকথিত ‘গোরক্ষক’ নামক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোও মুসলিমদের ওপর হামলা ও হত্যার সময় এই স্লোগানটি ব্যবহার করছে।
ভারতের সাধারণ ও উদারপন্থী হিন্দু সমাজ এবং ধর্মীয় পণ্ডিতরা এই স্লোগানের হিংস্র রূপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এই স্লোগানের সাথে সনাতন ধর্মের মূল বাণী বা সাধারণ হিন্দুদের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি মূলত আরএসএস ও বিজেপি পরিচালিত উগ্রগোষ্ঠীর রাজনৈতিকভাবে আমদানি করা স্লোগান।
পশ্চিমবঙ্গের নোবেলজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এ বিষয়ে কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, “আমি এর আগে কখনও এভাবে ‘জয় শ্রী রাম’ শুনিনি। এখন মানুষকে মারধরে এটা ব্যবহার করা হচ্ছে। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে এর কোনও যোগসূত্র নেই বলেই আমার ধারণা। ‘জয় শ্রী রাম’ উক্তি করল না বলে লোককে মারা হল, খুন করা হল, তাতেই আমার আপত্তি… এর সাহায্যে যদি লোককে মারা যায়, বিশেষত মুসলমানদের, তা হলে তো আপত্তি করার নিশ্চয় কারণ থাকবে।’’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক কমিশন তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোতে ভারতে এই স্লোগান ব্যবহার করে মুসলিমদের ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়নের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং একে ধর্মীয় স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বাংলাদেশে গাইবান্ধার ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে যেভাবে হঠাৎ দেশজুড়ে সুসংগঠিতভাবে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান তুলে মিছিল করা হচ্ছে, তাকে একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করছেন নেটিজেনরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, বাংলাদেশেও ভারতের হিন্দুত্ববাদী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো গোপনে শেকড় গাড়ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
ফেসবুক ও এক্স (টুইটার) প্ল্যাটফর্মে শত শত ব্যবহারকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, বাংলাদেশে যেকোনো নাগরিকের অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। গাইবান্ধায় যদি কোনো ধর্মীয় অবমাননা হয়ে থাকে, তবে প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে এবং অপরাধীকে শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু সেই ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশে ভারতের মুসলিম নিধনের স্লোগান আমদানি করা এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাতের উস্কানি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
নেটিজেনদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একটি ‘অসহিষ্ণু রাষ্ট্র’ হিসেবে চিত্রায়িত করতে ভারত ও আওয়ামী লীগের যৌথ ইন্ধনে এই ধরনের উগ্র স্লোগান রাজপথে ছড়ানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ আবহমানকাল ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ। এখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান যুগের পর যুগ ধরে শান্তিতে বসবাস করে আসছে। তবে প্রতিবাদের নামে প্রতিবেশী দেশের একটি উগ্র ও সন্ত্রাসী ঘরানার স্লোগান ঢাকার রাজপথে উচ্চারিত হওয়া দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ। সচেতন মহল মনে করছেন, গাইবান্ধার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি, এই মিছিলে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান ব্যবহারের মাধ্যমে কারা দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর বা ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে তাদেরও দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।




















