ঢাকা ০৫:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

থমকে গেছে “হাসিনার দেশবিরোধী সীমান্ত চুক্তি” বাতিলের কার্যক্রম

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ০২:৩০:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
  • / ৩৮ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে শেখ হাসিনার আমলে সই হওয়া দেশবিরোধী চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ থমকে গেছে। গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এ চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এ লক্ষে কার্যক্রমও শুরু করেছিল তারা। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

জানা গেছে, চুক্তিটি নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছে বর্তমান সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার চুক্তিটি বাতিলের পথে হাঁটবে নাকি এটাকে বহাল রাখা হবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান তিনি।

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ নিয়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সময়ের সমঝোতা স্মারকটিকে দেশবিরোধী আখ্যায়িত করে এটি বাতিল চান দেশের ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিবিরোধী এমন চুক্তি একটি স্বাধীন দেশের জন্য আত্মঘাতী। ভারতকে একতরফা সুবিধা দিয়ে সই করা চুক্তি বহাল রাখা হলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ইস্যুতে করা শেখ হাসিনার চুক্তির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও সরকারের একাধিক সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে আমার দেশ। তারা জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪১৫৬ কিলোমিটার (কিমি) সীমান্তের ৩২৭১ কিমিজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া তৈরির কাজ শেষ করেছে প্রতিবেশী দেশটি। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি ভঙ্গ করে ২০১০ সালে শুরু করে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এ বেড়া নির্মাণের কাজ করে ভারত। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তার অজুহাতে ভারত সীমান্তজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ জোরদার করে। কোথাও কোথাও আইন ভঙ্গ করে শূন্যরেখায় বেড়া নির্মাণ করেছে ভারত।

সূত্র জানায়, অবশিষ্ট ৮৮৫ কিমি এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্তে শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিজিবি ও দেশের সীমান্ত এলাকার মানুষ বাধা দিলে বিএসএফ মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার আমলের চুক্তিগুলোর রেফারেন্স দিচ্ছে। কখনো কখনো হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।

যেভাবে সামনে আসে হাসিনার চুক্তি

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত অধিশাখার কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ-ভারত যুগ্ম-সীমান্ত নির্দেশাবলি-১৯৭৫ অনুযায়ী, উভয় দেশের শূন্যরেখার ১৫০ গজের মধ্যে প্রতিরক্ষা সংবলিত যে কোনো কাজ সম্পন্নের বিষয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া উভয় দেশের প্রয়োজনে শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করার ক্ষেত্রে একে অপরের সম্মতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দুই দেশের সীমান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনেও বিষয়টি এভাবেই উল্লেখ রয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন এবং পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর কয়েক মাস প্রতিবেশী দেশটি সীমান্তে বেড়া নির্মাণসহ জবরদস্তিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকে। ওই সময় সীমান্ত হত্যাও ছিল শূন্যের কোটায়। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের চৌকা-সুখদেবপুর সীমান্তে বিএসএফ কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে এলে বিজিবি প্রবলভাবে বাধা দেয়। এর কয়েকদিন পর কুড়িগ্রাম ও নওগাঁ সীমান্তেও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে আসে বিএসএফ। কয়েক দিনের ব্যবধানে বিএসএফ পাঁচটি পয়েন্টে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের চেষ্টা করে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিজিবি প্রবলভাবে বাধা দিলে বিএসএফের পক্ষ থেকে ২০১০ সালে শেখ হাসিনার করা একটি চুক্তির রেফারেন্স তুলে ধরা হয়। সেখানে তারা জানায়, তিনবিঘা এলাকায় ওই চুক্তির আলোকে ভারত জিরো লাইনে (শূন্যরেখা) কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করে। যা ছিল আন্তর্জাতিক আইন ও ১৯৭৫ সালের ‘বাংলাদেশ-ভারত যুগ্ম সীমান্ত নির্দেশাবলি’র স্পষ্ট লংঘন। তাতে উভয় দেশের শূন্যরেখার ১৫০ গজের মধ্যে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত যে কোনো কাজ সম্পন্নের বিষয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া উভয় দেশের প্রয়োজনে শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্নের ক্ষেত্রে একে অপরের সম্মতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিজিবির এমন তথ্যের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনার সময়ে করা সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই সময়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে এ বিষয়ে জানতে চায়। প্রণয় ভার্মা ওই সময় বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব জসিম উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে একটি ‘সমঝোতা স্মারক’-এর কথা উল্লেখ করে।

চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সময়ে সীমান্ত নিয়ে করা চুক্তি, সমঝোতা স্মারকসহ এ সংক্রান্ত আরো যেসব চু্ক্তি রয়েছে তা পর্যালোচনা করে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ বিষয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গণমাধ্যমেন এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সীমান্তে বেড়া দেওয়া নিয়ে যেসব অসম সমঝোতা চুক্তি হয়েছে, সেগুলো বাতিলের বিষয়ে ভারতকে পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।’

অন্তর্বর্তী সরকারের ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলে ভারত মূলত সীমান্তে কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণে বেশি প্রভাব খাটায়। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তারা তো তিন বিঘায় শূন্যরেখায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। সেটার জন্য ভারত ওই সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই করেছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। এমন চুক্তি একটি স্বাধীন দেশের জন্য চরম অবমাননাকর বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

ওই চুক্তি বাতিলে বর্তমান সরকারের কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান ওই কর্মকর্তাও। তিনি বলেন, এগুলো সরকারের নীতিগত বিষয়। নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিরাই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।

কাঁটাতারের বেড়ার পক্ষে ভারতের সাফাই

২০২৫ সালে ভারতের কাছে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং বিএসএফের দাবি অনুযায়ী শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে করা চুক্তির বিষয়ে জানতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার। এর জবাবে ওই সময় দেশটির প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (পিআইবি) সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ‘ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া’ শিরোনামের ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘দুই দেশের সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪০৯৬ দশমিক ৭ কিমি। এর মধ্যে ৩২৩২ দশমিক ২১৮ কিমি বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছে। বেড়া তৈরির মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত অপরাধমূলক কার্যকলাপ, চোরাচালান ও অপরাধীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। তাছাড়া পাচার রোধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অপরাধমুক্ত সীমান্ত নিশ্চিত করা সহজ হয়।

এতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে সব প্রটোকল ও চুক্তি মেনেই সীমান্তের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বেড়া নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ভারত। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে ঢাকাকে অবহিত করেছে দিল্লি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ৮৬৪ দশমিক ৪৮২ কিমি এখনো বেড়া নির্মাণ করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ১৭৪ কিমি বেড়া নির্মাণ করা অসম্ভব। কারণ এসব এলাকায় জমি অধিগ্রহণ নিয়ে সমস্যা আছে এবং কিছু এলাকায় জলাভূমি রয়েছে। তাছাড়া কিছু এলাকায় বেড়া নির্মাণ নিয়ে বিজিবির রয়েছে ঘোর আপত্তি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রায় লোকসভায় উত্থাপিত প্রশ্নের লিখিত উত্তরে এসব তথ্য জানিয়েছিলেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

গোপন চুক্তি প্রকাশ ও বাতিল দাবি

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, ভারতের সঙ্গে বিগত শেখ হাসিনার সরকার এমন অনেক চুক্তি করেছে, যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। এসব চুক্তি জাতীয় স্বার্থে প্রকাশ হওয়া জরুরি। পাশাপাশি যেসব চুক্তি জনস্বার্থ পরিপন্থী এবং দেশের স্বার্থবিরোধী, সেগুলো দ্রুত বাতিলের উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো ভারতের প্রতি এ সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দেশ ও দেশের জনগণের প্রতি পুরোপুরি দায়বদ্ধ। এ দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই তাদের ভূমিকা ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানক বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও সীমান্ত নিয়ে ১৯৭৫ সালে ভারতের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী ভারত কোনোভাবেই শূন্যরেখার ১৫০ গজ ভেতরে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না। দেড়শ গজের বাইরেও কোনো বেড়া কিংবা অন্য কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে হলে ভারত অবশ্যই বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগে অবহিত করতে বাধ্য। কিন্তু প্রতিবেশী দেশটি আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি লংঘন করে সীমান্তে বাংলাদেশকে না জানিয়ে বেড়া নির্মাণ করছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, যে সমঝোতা স্মারকের কথা বলে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়াসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করছে, সেটা হতে পারে না। এমন কোনো সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে থাকলেও সেটা বহাল থাকতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইনের বিপরীতে এমন চুক্তির কার্যকারিতাও থাকে না বলে জানান এ নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

চুক্তি বাতিলের বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সীমান্ত নিয়ে শেখ হাসিনার সময় স্বাক্ষরিত চুক্তি বাতিলে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখে বলতে পারব।

নিউজটি শেয়ার করুন

থমকে গেছে “হাসিনার দেশবিরোধী সীমান্ত চুক্তি” বাতিলের কার্যক্রম

আপডেট সময় ০২:৩০:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে শেখ হাসিনার আমলে সই হওয়া দেশবিরোধী চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ থমকে গেছে। গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এ চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এ লক্ষে কার্যক্রমও শুরু করেছিল তারা। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

জানা গেছে, চুক্তিটি নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছে বর্তমান সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার চুক্তিটি বাতিলের পথে হাঁটবে নাকি এটাকে বহাল রাখা হবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান তিনি।

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ নিয়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সময়ের সমঝোতা স্মারকটিকে দেশবিরোধী আখ্যায়িত করে এটি বাতিল চান দেশের ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিবিরোধী এমন চুক্তি একটি স্বাধীন দেশের জন্য আত্মঘাতী। ভারতকে একতরফা সুবিধা দিয়ে সই করা চুক্তি বহাল রাখা হলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ইস্যুতে করা শেখ হাসিনার চুক্তির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও সরকারের একাধিক সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে আমার দেশ। তারা জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪১৫৬ কিলোমিটার (কিমি) সীমান্তের ৩২৭১ কিমিজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া তৈরির কাজ শেষ করেছে প্রতিবেশী দেশটি। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি ভঙ্গ করে ২০১০ সালে শুরু করে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এ বেড়া নির্মাণের কাজ করে ভারত। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তার অজুহাতে ভারত সীমান্তজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ জোরদার করে। কোথাও কোথাও আইন ভঙ্গ করে শূন্যরেখায় বেড়া নির্মাণ করেছে ভারত।

সূত্র জানায়, অবশিষ্ট ৮৮৫ কিমি এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্তে শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিজিবি ও দেশের সীমান্ত এলাকার মানুষ বাধা দিলে বিএসএফ মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার আমলের চুক্তিগুলোর রেফারেন্স দিচ্ছে। কখনো কখনো হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।

যেভাবে সামনে আসে হাসিনার চুক্তি

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত অধিশাখার কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ-ভারত যুগ্ম-সীমান্ত নির্দেশাবলি-১৯৭৫ অনুযায়ী, উভয় দেশের শূন্যরেখার ১৫০ গজের মধ্যে প্রতিরক্ষা সংবলিত যে কোনো কাজ সম্পন্নের বিষয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া উভয় দেশের প্রয়োজনে শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করার ক্ষেত্রে একে অপরের সম্মতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দুই দেশের সীমান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনেও বিষয়টি এভাবেই উল্লেখ রয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন এবং পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর কয়েক মাস প্রতিবেশী দেশটি সীমান্তে বেড়া নির্মাণসহ জবরদস্তিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকে। ওই সময় সীমান্ত হত্যাও ছিল শূন্যের কোটায়। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের চৌকা-সুখদেবপুর সীমান্তে বিএসএফ কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে এলে বিজিবি প্রবলভাবে বাধা দেয়। এর কয়েকদিন পর কুড়িগ্রাম ও নওগাঁ সীমান্তেও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে আসে বিএসএফ। কয়েক দিনের ব্যবধানে বিএসএফ পাঁচটি পয়েন্টে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের চেষ্টা করে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিজিবি প্রবলভাবে বাধা দিলে বিএসএফের পক্ষ থেকে ২০১০ সালে শেখ হাসিনার করা একটি চুক্তির রেফারেন্স তুলে ধরা হয়। সেখানে তারা জানায়, তিনবিঘা এলাকায় ওই চুক্তির আলোকে ভারত জিরো লাইনে (শূন্যরেখা) কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করে। যা ছিল আন্তর্জাতিক আইন ও ১৯৭৫ সালের ‘বাংলাদেশ-ভারত যুগ্ম সীমান্ত নির্দেশাবলি’র স্পষ্ট লংঘন। তাতে উভয় দেশের শূন্যরেখার ১৫০ গজের মধ্যে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত যে কোনো কাজ সম্পন্নের বিষয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া উভয় দেশের প্রয়োজনে শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্নের ক্ষেত্রে একে অপরের সম্মতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিজিবির এমন তথ্যের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনার সময়ে করা সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই সময়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে এ বিষয়ে জানতে চায়। প্রণয় ভার্মা ওই সময় বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব জসিম উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে একটি ‘সমঝোতা স্মারক’-এর কথা উল্লেখ করে।

চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সময়ে সীমান্ত নিয়ে করা চুক্তি, সমঝোতা স্মারকসহ এ সংক্রান্ত আরো যেসব চু্ক্তি রয়েছে তা পর্যালোচনা করে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ বিষয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গণমাধ্যমেন এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সীমান্তে বেড়া দেওয়া নিয়ে যেসব অসম সমঝোতা চুক্তি হয়েছে, সেগুলো বাতিলের বিষয়ে ভারতকে পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।’

অন্তর্বর্তী সরকারের ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলে ভারত মূলত সীমান্তে কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণে বেশি প্রভাব খাটায়। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তারা তো তিন বিঘায় শূন্যরেখায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। সেটার জন্য ভারত ওই সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই করেছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। এমন চুক্তি একটি স্বাধীন দেশের জন্য চরম অবমাননাকর বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

ওই চুক্তি বাতিলে বর্তমান সরকারের কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান ওই কর্মকর্তাও। তিনি বলেন, এগুলো সরকারের নীতিগত বিষয়। নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিরাই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।

কাঁটাতারের বেড়ার পক্ষে ভারতের সাফাই

২০২৫ সালে ভারতের কাছে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং বিএসএফের দাবি অনুযায়ী শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে করা চুক্তির বিষয়ে জানতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার। এর জবাবে ওই সময় দেশটির প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (পিআইবি) সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ‘ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া’ শিরোনামের ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘দুই দেশের সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪০৯৬ দশমিক ৭ কিমি। এর মধ্যে ৩২৩২ দশমিক ২১৮ কিমি বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছে। বেড়া তৈরির মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত অপরাধমূলক কার্যকলাপ, চোরাচালান ও অপরাধীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। তাছাড়া পাচার রোধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অপরাধমুক্ত সীমান্ত নিশ্চিত করা সহজ হয়।

এতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে সব প্রটোকল ও চুক্তি মেনেই সীমান্তের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বেড়া নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ভারত। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে ঢাকাকে অবহিত করেছে দিল্লি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ৮৬৪ দশমিক ৪৮২ কিমি এখনো বেড়া নির্মাণ করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ১৭৪ কিমি বেড়া নির্মাণ করা অসম্ভব। কারণ এসব এলাকায় জমি অধিগ্রহণ নিয়ে সমস্যা আছে এবং কিছু এলাকায় জলাভূমি রয়েছে। তাছাড়া কিছু এলাকায় বেড়া নির্মাণ নিয়ে বিজিবির রয়েছে ঘোর আপত্তি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রায় লোকসভায় উত্থাপিত প্রশ্নের লিখিত উত্তরে এসব তথ্য জানিয়েছিলেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

গোপন চুক্তি প্রকাশ ও বাতিল দাবি

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, ভারতের সঙ্গে বিগত শেখ হাসিনার সরকার এমন অনেক চুক্তি করেছে, যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। এসব চুক্তি জাতীয় স্বার্থে প্রকাশ হওয়া জরুরি। পাশাপাশি যেসব চুক্তি জনস্বার্থ পরিপন্থী এবং দেশের স্বার্থবিরোধী, সেগুলো দ্রুত বাতিলের উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো ভারতের প্রতি এ সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দেশ ও দেশের জনগণের প্রতি পুরোপুরি দায়বদ্ধ। এ দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই তাদের ভূমিকা ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানক বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও সীমান্ত নিয়ে ১৯৭৫ সালে ভারতের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী ভারত কোনোভাবেই শূন্যরেখার ১৫০ গজ ভেতরে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না। দেড়শ গজের বাইরেও কোনো বেড়া কিংবা অন্য কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে হলে ভারত অবশ্যই বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগে অবহিত করতে বাধ্য। কিন্তু প্রতিবেশী দেশটি আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি লংঘন করে সীমান্তে বাংলাদেশকে না জানিয়ে বেড়া নির্মাণ করছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, যে সমঝোতা স্মারকের কথা বলে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়াসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করছে, সেটা হতে পারে না। এমন কোনো সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে থাকলেও সেটা বহাল থাকতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইনের বিপরীতে এমন চুক্তির কার্যকারিতাও থাকে না বলে জানান এ নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

চুক্তি বাতিলের বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সীমান্ত নিয়ে শেখ হাসিনার সময় স্বাক্ষরিত চুক্তি বাতিলে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখে বলতে পারব।