যশোরে ‘সচ্ছল’ ৬২ নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড
- আপডেট সময় ০২:১৭:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
- / ২৫ বার পড়া হয়েছে
যশোরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্বোধন করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উপকারভোগীদের তালিকায় গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়েছে। বাছাই করা ১ হাজার ৯৮০ উপকারভোগীর মধ্যে এমন ৬২ জনকে পাওয়া গেছে, যারা সচ্ছল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ তথ্য স্বীকার করে জানিয়েছেন, ওই ৬২ জনের কার্ড স্থগিত করা হয়েছে। তাদের কাছে যাওয়া টাকা ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উপকারভোগী যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সমাজসেবা অধিদপ্তরের দপ্তরপ্রধানসহ তিনজনকে বদলি করা হয়েছে। তবে এই বদলি শাস্তিমূলক নাকি রুটিন ওয়ার্ক, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
গত ১৬ মে যশোর সদরের চাঁচড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচি ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই অনুষ্ঠানে যশোর সদর আসনের সংসদ সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত উপস্থিত থেকে তালিকাভুক্ত নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন।
এর আগে গত ১৩ মে জেলা তথ্য অফিসের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত অবহিতকরণ সভায় জানানো হয়, দেশজুড়ে ফ্যামিলি কার্ড চালুর লক্ষ্যে দ্বিতীয় দফায় যে পরীক্ষামূলক (পাইলট) কার্যক্রম শুরু হচ্ছে, তার আওতায় চাঁচড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডকে রাখা হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাঠকর্মীরা কীভাবে এ কার্যক্রমের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের বাছাই করেছেন, তার বিশদ বর্ণনাও দেওয়া হয় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে।
সূত্রে জানা যায়, যেহেতু ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রধানমন্ত্রীর ‘ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প’, তাই এর উপকারভোগীদের নিয়ে যাতে কোনো ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি না হয়, সেজন্য যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান খুবই তৎপর ছিলেন। তিনি বারবার এ বিষয়ে তাগাদা দেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক হারুন অর রশিদকে। উপপরিচালকও জেলা প্রশাসককে বিষয়টি নিয়ে আশ্বস্ত করেন। তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে জেলা প্রশাসক এ বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) শরণাপন্ন হন। এনএসআইয়ের পক্ষ থেকে ১৪ মে সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসককে জানানো হয়, তাদের কর্মীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করে সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের মধ্যে এমন অন্তত ৬২ জনকে পেয়েছেন, যাদের পরিবার সচ্ছল। জেলা প্রশাসক তখনই সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালককে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী উপপরিচালক সমাজসেবা অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালককে ই-মেইল করেন। কিন্তু একদিন পর যখন প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন, তখন দেখা যায়, গোয়েন্দা তথ্যে সচ্ছল হিসেবে চিহ্নিত ওই ৬২ জনের নামও রয়েছে এবং যথারীতি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তাদের অ্যাকাউন্টেও টাকা ঢুকে যায়।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, উদ্বোধন অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে আমি জানতে পারি গোয়েন্দা রিপোর্টে সচ্ছল হিসেবে চিহ্নিত নারীদের নামও চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। এতে আমি খুবই বিরক্ত হই। প্রধানমন্ত্রীর ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠান উদ্বোধনের ঠিক আগে আমি সমাজকল্যাণ সচিবকে ফোন করে বিষয়টি জানাই। কিন্তু তখন হয়তো আর করার কিছু ছিল না।
জেলা প্রশাসক আরো বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সমাজসেবা অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার নেওয়ার নির্দেশ দিই। কিন্তু তিনি তার মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের ঢাকাস্থ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করে ই-মেইল পাঠান খুলনায়। পরদিন শুক্রবার হওয়ায় হয়তো খুলনার পরিচালক অফিসিয়াল ই-মেইল ওপেন করেননি। ফলে আমাদের জিরো এরর রাখার চেষ্টা হোঁচট খায়।
এদিকে, সচ্ছল ৬২ নারী ফ্যামিলি কার্ডের আওতাভুক্ত হওয়ার ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর সমাজসেবা অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক হারুন অর রশীদ, সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম ও ইতি দত্ত সেন নামে তিন কর্মকর্তাকে যশোর থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তবে উল্লিখিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) করা হয়েছে নাকি স্বাভাবিক বদলি করা হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে।
বিদায়ী উপপরিচালক হারুন অর রশীদ ফোনে বলেন, আমাকে স্ট্যান্ড রিলিজ নয়, স্বাভাবিক বদলি করা হয়েছে।
একই তথ্য দেন যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুজন সরকার। তিনি বলেন, উপপরিচালক হারুন ঈদের আগেই আমাকে জানিয়েছিলেন, তাকে বদলি করা হয়েছে। ঈদের পর তিনি যশোরের কর্মস্থল ছাড়েন।
সমাজসেবা অধিদপ্তর যশোর কার্যালয়ে এখন কোনো উপপরিচালক নেই। পাবনা থেকে কাজী কাদের মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি নামে একজন সহকারী পরিচালক গত ১ জুন যশোরে যোগ দিয়েছেন। যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার দেশকে বলেন, আমি যশোরে যোগ দিয়েই ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে এসেছি। কারণ, আমার আব্বা মারা গেছেন। ফলে যশোরের কোনো কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে কি না, তা আমার জানার সুযোগ হয়নি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, অফিস অর্ডার না দেখে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
এদিকে সচ্ছল হিসেবে চিহ্নিত যে ৬২ নারীকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে, তাদের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে—জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রথমত সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তাদের অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া সরকারি টাকা ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গক্রমে জেলা প্রশাসক বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের ডিডি বা এডি সরাসরি উপকারভোগী বাছাই করেন না। এ কাজ করেন তাদের সমাজকর্মীরা। সেখানে গাফিলতি ছিল। ডিডি আন্তরিক থাকা সত্ত্বেও ত্রুটি থেকে গেছে, যা দুঃখজনক।
অন্য এক প্রশ্নে জেলা প্রশাসক বলেন, সম্ভাব্য সুবিধাভোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না। এ প্রসঙ্গে আমি নিজে একাধিকবার প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি সব ধরনের রাজনৈতিক বাছবিচারের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে যশোর থেকে সরানো হয়েছে বলে শুনেছি। তবে তাদের স্ট্যান্ড রিলিজ নাকি স্বাভাবিক বদলি করা হয়েছে, তা আমার জানা নেই।
জেলা পরিষদ প্রশাসক আরো বলেন, যে ৬২ নারীকে সচ্ছল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, অবশ্যই তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। নতুন করে জরিপ চালিয়ে ওই ওয়ার্ডে আর কাউকে উপযুক্ত মনে হলে তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এখানে কোনো ধরনের দলবাজির সুযোগ আগেও দেওয়া হয়নি, ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে না।
ফ্যামিলি কার্ডের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রস্তুতে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে মাঠপর্যায়ে কাজ করেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের ৫৪ সমাজকর্মী।



















