ফেনীর পরশুরামের বক্সমাহমুদে এক কিশোরীকে (সিমি-ছদ্মনাম) ধর্ষণের মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন অভিযুক্ত ইমাম মোজাফফর আহমদ (২৫)। ফরেনসিক পরীক্ষায় ওই কিশোরীর ভূমিষ্ঠ সন্তানের সঙ্গে মোজাফফরের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়নি, বরং ধরা পড়েছে আসল অভিযুক্ত।
ধর্ষণ মামলায় জেল খাটলেন ইমাম, ডিএনএ পরীক্ষায় ধরা পড়লো ধর্ষক ভাই
- আপডেট সময় ০৪:৪৪:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
- / ৫ বার পড়া হয়েছে
মোজাফফর আহমদ বলেন, অবশেষে সত্যের জয় হয়েছে। এ ঘটনায় আমি সামাজিক ও পারিবারিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছি। মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারিয়েছি। মামলার খরচ চালাতে বাড়ির পাশে মূল্যবান জায়গা বিক্রি করে দিয়েছি, অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমি কারাভোগ, সামাজিক মর্যাদাহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ চাই।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে মক্তবের পাঠ শেষ করে পরশুরামের বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের সিমি (১৪)। মক্তবে যাওয়া বন্ধ করার পাঁচ বছর পর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে ওই ছাত্রী। পরে সন্তানও প্রসব করে সে। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর সিমির মক্তবের শিক্ষক মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করে সিমির পরিবার। তখন ইমাম মোজাফফর এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন দাবি করে কাকুতি-মিনতি করলেও কারও মন গলেনি।
এই পরিস্থিতিতে মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারান তিনি। মিথ্যা অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর ফেনীর আদালতে যান মোজাফফর। এসময় আদালত প্রাঙ্গণ থেকে গ্রামের মাতব্বর ও সিমির মা মোজাফফরকে জোরপূর্বক পুলিশের হাতে তুলে দেন। এরপর এক মাস দুই দিন কারাভোগ করেন মোজাফফর। ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর জামিনে বেরিয়ে মোজাফফর নামেন আইনি লড়াইয়ে। মামলার খরচ যোগাতে বিক্রি করেন ৫ শতক জায়গা। যদিও প্রতিনিয়ত সামাজিকভাবে ট্রলের শিকার হতে থাকেন। ভেঙে পড়েন মানসিকভাবে।
এদিকে ওই বছরের ২২ ডিসেম্বর অভিযুক্ত মোজাফফরকে ঢাকার মালিবাগে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য স্বশরীরে এবং সিমির সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ফরেনসিক ল্যাবরেটরি থেকে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি পরশুরাম মডেল থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক জাহিদুল ইসলামের কাছে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পাঠানো হয়।
এতে বলা হয়, পরীক্ষায় ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষের বীর্যের উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি। ভ্যাজাইনাল সোয়াবে বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত না হওয়ায় মোজাফফরের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে তুলনা করে মতামত প্রদান করা সম্ভব নয়। মামলার ভিকটিম ও তার সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশু কন্যা সন্তানের জৈবিক পিতা নির্ধারণে ডিএনএ পরীক্ষার নিমিত্তে ভিকটিম ও তার সন্তানকে পরীক্ষাগারে উপস্থিত হয়ে ডিএনএর নমুনা প্রদানের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়।
এদিকে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন ফেনীতে এলে পুলিশ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে তদন্ত শুরু করে। কিশোরী সিমিকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে একপর্যায়ে সে জানায়, তাকে তার সহোদর ভাই মোরশেদই তাকে টানা ধর্ষণ করেন। প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে মোরশেদকে ধর্ষণের দায় থেকে বাঁচাতে সিমির পরিবার মক্তব শিক্ষক ও ইমাম মোজাফফরকে ফাঁসায়।
২০২৫ সালের ১৯ মে সিমিকে ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে বড় ভাই মোরশেদকে (২২) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মোরশেদ পরিবারের অগোচরে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে ২০ মে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
আদালতে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিমি, আর ভূমিষ্ঠ সন্তান ও অভিযুক্ত বড় ভাই মোরশেদকে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য একই বছরের ৪ আগস্ট ঢাকায় পুলিশের ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। ৯ আগস্ট ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ভিকটিমের সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশু কন্যার সঙ্গে মোরশেদের ডিএনএ নমুনা মিলে যাওয়ায় তিনি তার জৈবিক পিতা। ডিএনএ পরীক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ডিএনএ পরীক্ষায় মোরশেদের সঙ্গে শিশুটির পিতা হিসেবে ৯৯.৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে। মোজাফফর ওই কিশোরীর গর্ভজাত সন্তানের জৈবিক পিতা নন।
এরপর গত ১৭ এপ্রিল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) শরীফ হোসেন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মোজাফফর আহমেদের বিরুদ্ধে আনীত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০০)-এর ৯(১) ধারায় অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় মামলার দায় হতে তাকে অব্যাহতি প্রদান এবং গ্রেপ্তার আসামি মোরশেদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একই ধারায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রটি দাখিল করেন। গ্রেপ্তারের পর থেকে মোরশেদ ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন।
অব্যাহতি পাওয়ার বিষয়ে মোজাফফর আহমদ বলেন, বিভিন্ন সময় প্রায় মসজিদের ইমাম ও মাদরাসার শিক্ষকদের বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে ফাঁসানো হয়। প্রকৃত সত্য তুলে ধরা হলে এভাবে আমার মতো অনেক নিরপরাধ মানুষ বেঁচে যাবে।
তিনি নিজের সামাজিক মর্যাদাহানি ও এক মাস কারাভোগের ক্ষতিপূরণও দাবি করেছেন।
মোজাফফর আহমদের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, এ ধরনের ঘটনা বিরল। তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষায় সত্য উদঘাটন হয়েছে।
জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের পরশুরাম উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মুফতি আমিনুল ইসলাম জানান, সুন্নি, কওমি বা সরকারি বুঝি না, সে একজন মজলুম ইমাম ও তালেবে ইলম। ক্ষতিগ্রস্ত ইমামের ক্ষতিপূরণ কে দেবে? তাকে মানসিকভাবে সাহস দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ও আইনিভাবে সহযোগিতা করা উচিত।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ গভীরভাবে তদন্ত করে। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর চার্জশিট থেকে মোজাফফরের নাম প্রত্যাহার করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর আপন বড় ভাই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। নিরপরাধ একজনকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।



















