ঢাকা ১২:৫২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে জুমার নামাজের সময় বিভিন্ন মসজিদ অবরুদ্ধ করে হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডব

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ০৮:২০:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
  • / ২৯ বার পড়া হয়েছে

উত্তরপ্রদেশের খোদা এলাকায় স্থানীয় মসজিদগুলোর সামনে হিন্দু রক্ষা দল এবং অন্যান্য উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যদের জমায়েত, উসকানিমূলক স্লোগান এবং নামাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গতকাল জুমার নামাজের সময় ভারী পুলিশ মোতায়েনের মধ্যেই এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুমার নামাজের সময় বিপুল সংখ্যক চরমপন্থী স্থানীয় মসজিদগুলোর সামনে জড়ো হন। তারা মসজিদে প্রবেশের পথ অবরুদ্ধ করেন এবং জামাতে নামাজ আদায়ে মারাত্মকভাবে বিঘ্ন ঘটান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীরা অত্যন্ত উসকানিমূলক এবং আপত্তিকর স্লোগান দিচ্ছেন।

পুলিশের ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এই উসকানিমূলক জমায়েতটি ঘটে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডিসিপি ধবল জয়সওয়ালের নেতৃত্বে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলাকায় ফ্ল্যাগ মার্চ করেছিলেন এবং ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হচ্ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা জমায়েত হতে সক্ষম হয়।

এই বিক্ষোভে চরমপন্থী হিন্দু রক্ষা দল এবং রাষ্ট্রীয় হনুমান দলসহ বেশ কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। এছাড়া হিন্দু মহাসভার নেত্রী রিয়া কিন্নরও বিক্ষোভকারীদের সাথে যোগ দেন এবং স্থানীয় মসজিদে জুমার নামাজ বন্ধ করার এই প্রচেষ্টাকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান।

গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রিয়া কিন্নর বলেন, “আমরাও এখানে নামাজ হতে দেব না। তারা যদি একদিন নামাজ না পড়ে, তবে তাদের কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে না।”

এর আগে গত সোমবার, হিন্দু রক্ষা দলের রাজ্য সভাপতি ললিত শর্মা ঘোষণা করেছিলেন, “আমরা পুরো এলাকায় জুমার নামাজ হতে দেব না।” তিনি মুসলিমদের নামাজ পড়া থেকে বিরত রাখতে সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে একের পর এক উসকানিমূলক মন্তব্য করেন।

ললিত শর্মা দাবি করেন, নামাজ বন্ধ করার মাধ্যমেই “হিন্দু শক্তির প্রদর্শন” হবে। তিনি অতীতে উত্তরাখণ্ডে মুসলিমদের নামাজ বন্ধ করার ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমি একবার উত্তরাখণ্ডেও ওদের নামাজ বন্ধ করে দিয়েছিলাম।” এছাড়া তিনি মুসলিমদের প্রতি আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের তাকে প্রতিহত করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।

এমনকি তিনি ‘সম্মিলিত শাস্তি’ বা যৌথ শাস্তির পক্ষে কথা বলে চরম বিতর্ক উসকে দেন। তিনি বলেন, শুধু অভিযুক্ত নয়, তার পরিবারকেও এর ফল ভোগ করতে হবে। “যে মা জন্ম দিয়েছে তাকেও এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে… এমনকি বাবারও এনকাউন্টার হওয়া উচিত। যারা এদের বড় করেছে, শাস্তি তাদেরও পাওয়া উচিত।”

সম্প্রতি ওই এলাকায় ১৭ বছর বয়সী কিশোর সূর্য প্রতাপ চৌহানকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই ক্ষোভের সূত্রপাত। পুলিশ উক্ত হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত আসাদকে একটি এনকাউন্টারে হত্যা করে। এরপর স্থানীয় প্রশাসন আসাদের বাড়িতে উচ্ছেদ বা ভাঙচুরের নোটিশ পাঠায় এবং এলাকার তিনটি মাদ্রাসাকেও আইনি নোটিশ দেওয়া হয়।

সমালোচকদের মতে, প্রশাসনের এই পদক্ষেপগুলো এক ধরনের ‘সম্মিলিত শাস্তি’র শামিল। তারা অভিযোগ তুলেছেন যে, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির অপরাধের জন্য পুরো একটি সম্প্রদায়কে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে এবং হেনস্তা করা হচ্ছে।

পাশাপাশি, খোদা এলাকার কিছু ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম এবং ইউটিউবারদের বিরুদ্ধেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, তারা এই সংবেদনশীল বিষয়টিকে নিয়ে অতি-নাটকীয় ও উসকানিমূলক প্রতিবেদন তৈরি করে এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে এবং সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি করেছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ভারতে জুমার নামাজের সময় বিভিন্ন মসজিদ অবরুদ্ধ করে হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডব

আপডেট সময় ০৮:২০:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

উত্তরপ্রদেশের খোদা এলাকায় স্থানীয় মসজিদগুলোর সামনে হিন্দু রক্ষা দল এবং অন্যান্য উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যদের জমায়েত, উসকানিমূলক স্লোগান এবং নামাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গতকাল জুমার নামাজের সময় ভারী পুলিশ মোতায়েনের মধ্যেই এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুমার নামাজের সময় বিপুল সংখ্যক চরমপন্থী স্থানীয় মসজিদগুলোর সামনে জড়ো হন। তারা মসজিদে প্রবেশের পথ অবরুদ্ধ করেন এবং জামাতে নামাজ আদায়ে মারাত্মকভাবে বিঘ্ন ঘটান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীরা অত্যন্ত উসকানিমূলক এবং আপত্তিকর স্লোগান দিচ্ছেন।

পুলিশের ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এই উসকানিমূলক জমায়েতটি ঘটে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডিসিপি ধবল জয়সওয়ালের নেতৃত্বে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলাকায় ফ্ল্যাগ মার্চ করেছিলেন এবং ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হচ্ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা জমায়েত হতে সক্ষম হয়।

এই বিক্ষোভে চরমপন্থী হিন্দু রক্ষা দল এবং রাষ্ট্রীয় হনুমান দলসহ বেশ কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। এছাড়া হিন্দু মহাসভার নেত্রী রিয়া কিন্নরও বিক্ষোভকারীদের সাথে যোগ দেন এবং স্থানীয় মসজিদে জুমার নামাজ বন্ধ করার এই প্রচেষ্টাকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান।

গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রিয়া কিন্নর বলেন, “আমরাও এখানে নামাজ হতে দেব না। তারা যদি একদিন নামাজ না পড়ে, তবে তাদের কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে না।”

এর আগে গত সোমবার, হিন্দু রক্ষা দলের রাজ্য সভাপতি ললিত শর্মা ঘোষণা করেছিলেন, “আমরা পুরো এলাকায় জুমার নামাজ হতে দেব না।” তিনি মুসলিমদের নামাজ পড়া থেকে বিরত রাখতে সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে একের পর এক উসকানিমূলক মন্তব্য করেন।

ললিত শর্মা দাবি করেন, নামাজ বন্ধ করার মাধ্যমেই “হিন্দু শক্তির প্রদর্শন” হবে। তিনি অতীতে উত্তরাখণ্ডে মুসলিমদের নামাজ বন্ধ করার ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমি একবার উত্তরাখণ্ডেও ওদের নামাজ বন্ধ করে দিয়েছিলাম।” এছাড়া তিনি মুসলিমদের প্রতি আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের তাকে প্রতিহত করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।

এমনকি তিনি ‘সম্মিলিত শাস্তি’ বা যৌথ শাস্তির পক্ষে কথা বলে চরম বিতর্ক উসকে দেন। তিনি বলেন, শুধু অভিযুক্ত নয়, তার পরিবারকেও এর ফল ভোগ করতে হবে। “যে মা জন্ম দিয়েছে তাকেও এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে… এমনকি বাবারও এনকাউন্টার হওয়া উচিত। যারা এদের বড় করেছে, শাস্তি তাদেরও পাওয়া উচিত।”

সম্প্রতি ওই এলাকায় ১৭ বছর বয়সী কিশোর সূর্য প্রতাপ চৌহানকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই ক্ষোভের সূত্রপাত। পুলিশ উক্ত হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত আসাদকে একটি এনকাউন্টারে হত্যা করে। এরপর স্থানীয় প্রশাসন আসাদের বাড়িতে উচ্ছেদ বা ভাঙচুরের নোটিশ পাঠায় এবং এলাকার তিনটি মাদ্রাসাকেও আইনি নোটিশ দেওয়া হয়।

সমালোচকদের মতে, প্রশাসনের এই পদক্ষেপগুলো এক ধরনের ‘সম্মিলিত শাস্তি’র শামিল। তারা অভিযোগ তুলেছেন যে, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির অপরাধের জন্য পুরো একটি সম্প্রদায়কে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে এবং হেনস্তা করা হচ্ছে।

পাশাপাশি, খোদা এলাকার কিছু ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম এবং ইউটিউবারদের বিরুদ্ধেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, তারা এই সংবেদনশীল বিষয়টিকে নিয়ে অতি-নাটকীয় ও উসকানিমূলক প্রতিবেদন তৈরি করে এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে এবং সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি করেছে।