ঢাকা ০৩:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আ.লীগ নেতাকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারে বিশেষ শর্ত

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ১১:৩১:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
  • / ২২ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রাম প্রাণিসম্পদ বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন মুরগি খামারের খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ-সংক্রান্ত টেন্ডারে আওয়ামী লীগের এক পদধারী নেতার প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে বিশেষ শর্ত আরোপের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলছে, ই-জিপি পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও টেন্ডারের কারিগরি শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের সাশ্রয়ের সুযোগও কমে যাচ্ছে। এই ঘটনায় তদন্ত করছে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দেওয়া লিখিত অভিযোগ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে পাঠানো আবেদনপত্র এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগী সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগ, সীতাকুণ্ড পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হারুণ উর রশিদের ‘বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘আব্দুলাহ অ্যান্ড ব্রাদার্সকে’ কাজ পাইয়ে দিতে এই বিশেষ শর্ত দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর হারুণ উর রশিদ পলাতক রয়েছেন। কিন্তু তার এই দুই প্রতিষ্ঠান প্রাণিসম্পদ বিভাগের সাম্প্রতিক কয়েকটি টেন্ডারে অংশ নিয়েছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠান আ.লীগের আমলে সব কাজই পেয়েছে।

কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, বিভাগীয় কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর ফজলে রাব্বি এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর আঞ্চলিক মুরগি খামার ও সীতাকুণ্ডের কয়েকটি টেন্ডারকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে আবরার ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগে বলা হয়েছে, টেন্ডার আইডি ১২৬৪৬০১-এ মোরগ-মুরগির খাদ্য উপকরণ হিসেবে ধানের তুষ, প্রোবায়োটিক, মাল্টি এনজাইম, সয়াবিন তেল, লাইমস্টোন ও লবণ ক্রয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রোবায়োটিক ও মাল্টি এনজাইম সরবরাহের ক্ষেত্রে ‘ম্যানুফ্যাকচারার অথরাইজেশন’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অথচ এসব পণ্য দেশে উৎপাদিত হয় না; বিদেশ থেকে আমদানি করে বাজারজাত করা হয়। ফলে ‘ম্যানুফ্যাকচারার অথরাইজেশন’ শর্ত বাস্তবে অধিকাংশ সরবরাহকারীর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবরার ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী তার অভিযোগে বলেন, ‘প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো একক কোম্পানির স্পেসিফিকেশন দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু এখানে এমন স্পেসিফিকেশন দেওয়া হয়েছে, যা মূলত একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির পণ্যের সঙ্গে মিলে। ফলে অন্য অনেক দরদাতা অংশ নিতে পারেননি।’

তিনি আরো দাবি করেন, তার প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন অজুহাতে মূল্যায়ন থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

১৭ বছর ধরে একই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ

অভিযোগকারীরা আরো দাবি করেন, চট্টগ্রামের খুলশী ওয়্যারলেস মুরগি খামার, সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী ও পার্বত্য জেলার কয়েকটি খামারের খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে সীমিত কয়েকজন ঠিকাদারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক যোগসাজশের মাধ্যমে একটি গোষ্ঠী বছরের পর বছর অধিকাংশ কাজ পেয়ে আসছে। ফলে নতুন বা অন্যান্য যোগ্য প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেও বাস্তবে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তাদের অভিযোগ আ.লীগ নেতার ওই দুটি প্রতিষ্ঠান গত ১৭ বছর ধরে একচেটিয়া কাজ করে যাচ্ছে। এখনো তাকে কাজ পাইয়ে দিতে চেষ্টা চলছে।

এ ধরনের অভিযোগ শুধু চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—মুন্না ট্রেডার্স, সাওদা এন্টারপ্রাইজ, ফারুক এন্টারপ্রাইজ, তাসুমো ফ্যাশনস ও এনকিউএন এন্টারপ্রাইজ—প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন জমা দেয়। আবেদনে বলা হয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীন বিভিন্ন খামারে দীর্ঘদিন ধরে কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান একচেটিয়াভাবে কাজ করছে। টেন্ডার সিডিউলে এসব শর্ত আরোপ করা হয়, যা নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে।

তারা টেন্ডার সিডিউলের শর্ত শিথিল করে অধিকসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানান। পরে গত ৩ মে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাইজামান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে বিষয়টি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ব্যাহত

আরেকটি অভিযোগে শিখা ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, দেশের বিভিন্ন মুরগি খামারের খাদ্য উপকরণ ক্রয়ের টেন্ডারে ‘টক্সিন বাইন্ডার’ ও ‘প্রোটিন কনসেনট্রেন্ট’ নামে কিছু পণ্যের জন্য এমন কারিগরি শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা বাজারের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, এসব শর্তের কারণে নির্দিষ্ট একটি কোম্পানির পণ্য ছাড়া অন্য কোনো পণ্য যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। ফলে কার্যত দুয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী কারিগরি স্পেসিফিকেশন এমন হতে হবে, যাতে তা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করে। কিন্তু বাস্তবে কিছু টেন্ডারে এমন শর্ত দেওয়া হচ্ছে, যা প্রতিযোগিতা সীমিত করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এর ফলে সরকারও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, প্রতিযোগিতা কমে গেলে ক্রয়মূল্য বেশি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অভিযোগকারী ঠিকাদারদের কয়েকজন বলেন, তারা টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল চান না; বরং সব যোগ্য প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে চান। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, সংশ্লিষ্ট টেন্ডারগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত; ই-জিপি প্রক্রিয়ায় সব যোগ্য ঠিকাদারের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; প্রতিযোগিতাবিরোধী বা অযৌক্তিক শর্ত বাতিল করা; ক্রয় কার্যক্রমে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা; নিম্নমানের খাদ্য বা ওষুধ সরবরাহের অভিযোগ থাকলে দুদকের মাধ্যমে তদন্ত করা।

একজন অভিযোগকারী বলেন, ‘আমরা চাই না কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা হোক। আমরা চাই নিয়ম মেনে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকুক।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের খুলশী ওয়্যারলেস মুরগি খামারের উপপরিচালক ও টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ডা. আলমগীর বলেন, টেন্ডার কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে সরকারি ই-জিপি পদ্ধতি এবং প্রচলিত ক্রয়বিধি অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। কারিগরি স্পেসিফিকেশন ও যোগ্যতার শর্ত সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসারেই নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো ঠিকাদারের অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষ যাচাই করবে। আমরা স্বচ্ছতা বজায় রেখেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছি।

খুলশী ওয়্যারলেস মুরগি খামারের উপপরিচালক (ডিডি) ও সংশ্লিষ্ট টেন্ডারের শর্ত প্রণয়নকারী কর্মকর্তা ডা. ওয়ারিস কামালও একই কথা বলেন।

তবে পরিচালক ডা. মো. আতিয়ার রহমান আ.লীগের ঠিকাদারের পক্ষ নিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ করলেও সেটি দেখার বিষয় নয়। যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে থাকলে আ.লীগের প্রতিষ্ঠান হলেও পাবে।

অভিযোগ রয়েছে ১০ শতাংশ ঘুস নিয়ে আ.লীগের ওই ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার কাজ করছেন এই কর্মকর্তা।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আ.লীগ নেতাকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারে বিশেষ শর্ত

আপডেট সময় ১১:৩১:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

চট্টগ্রাম প্রাণিসম্পদ বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন মুরগি খামারের খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ-সংক্রান্ত টেন্ডারে আওয়ামী লীগের এক পদধারী নেতার প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে বিশেষ শর্ত আরোপের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলছে, ই-জিপি পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও টেন্ডারের কারিগরি শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের সাশ্রয়ের সুযোগও কমে যাচ্ছে। এই ঘটনায় তদন্ত করছে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দেওয়া লিখিত অভিযোগ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে পাঠানো আবেদনপত্র এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগী সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগ, সীতাকুণ্ড পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হারুণ উর রশিদের ‘বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘আব্দুলাহ অ্যান্ড ব্রাদার্সকে’ কাজ পাইয়ে দিতে এই বিশেষ শর্ত দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর হারুণ উর রশিদ পলাতক রয়েছেন। কিন্তু তার এই দুই প্রতিষ্ঠান প্রাণিসম্পদ বিভাগের সাম্প্রতিক কয়েকটি টেন্ডারে অংশ নিয়েছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠান আ.লীগের আমলে সব কাজই পেয়েছে।

কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, বিভাগীয় কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর ফজলে রাব্বি এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর আঞ্চলিক মুরগি খামার ও সীতাকুণ্ডের কয়েকটি টেন্ডারকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে আবরার ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগে বলা হয়েছে, টেন্ডার আইডি ১২৬৪৬০১-এ মোরগ-মুরগির খাদ্য উপকরণ হিসেবে ধানের তুষ, প্রোবায়োটিক, মাল্টি এনজাইম, সয়াবিন তেল, লাইমস্টোন ও লবণ ক্রয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রোবায়োটিক ও মাল্টি এনজাইম সরবরাহের ক্ষেত্রে ‘ম্যানুফ্যাকচারার অথরাইজেশন’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অথচ এসব পণ্য দেশে উৎপাদিত হয় না; বিদেশ থেকে আমদানি করে বাজারজাত করা হয়। ফলে ‘ম্যানুফ্যাকচারার অথরাইজেশন’ শর্ত বাস্তবে অধিকাংশ সরবরাহকারীর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবরার ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী তার অভিযোগে বলেন, ‘প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো একক কোম্পানির স্পেসিফিকেশন দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু এখানে এমন স্পেসিফিকেশন দেওয়া হয়েছে, যা মূলত একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির পণ্যের সঙ্গে মিলে। ফলে অন্য অনেক দরদাতা অংশ নিতে পারেননি।’

তিনি আরো দাবি করেন, তার প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন অজুহাতে মূল্যায়ন থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

১৭ বছর ধরে একই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ

অভিযোগকারীরা আরো দাবি করেন, চট্টগ্রামের খুলশী ওয়্যারলেস মুরগি খামার, সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী ও পার্বত্য জেলার কয়েকটি খামারের খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে সীমিত কয়েকজন ঠিকাদারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক যোগসাজশের মাধ্যমে একটি গোষ্ঠী বছরের পর বছর অধিকাংশ কাজ পেয়ে আসছে। ফলে নতুন বা অন্যান্য যোগ্য প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেও বাস্তবে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তাদের অভিযোগ আ.লীগ নেতার ওই দুটি প্রতিষ্ঠান গত ১৭ বছর ধরে একচেটিয়া কাজ করে যাচ্ছে। এখনো তাকে কাজ পাইয়ে দিতে চেষ্টা চলছে।

এ ধরনের অভিযোগ শুধু চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—মুন্না ট্রেডার্স, সাওদা এন্টারপ্রাইজ, ফারুক এন্টারপ্রাইজ, তাসুমো ফ্যাশনস ও এনকিউএন এন্টারপ্রাইজ—প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন জমা দেয়। আবেদনে বলা হয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীন বিভিন্ন খামারে দীর্ঘদিন ধরে কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান একচেটিয়াভাবে কাজ করছে। টেন্ডার সিডিউলে এসব শর্ত আরোপ করা হয়, যা নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে।

তারা টেন্ডার সিডিউলের শর্ত শিথিল করে অধিকসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানান। পরে গত ৩ মে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাইজামান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে বিষয়টি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ব্যাহত

আরেকটি অভিযোগে শিখা ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, দেশের বিভিন্ন মুরগি খামারের খাদ্য উপকরণ ক্রয়ের টেন্ডারে ‘টক্সিন বাইন্ডার’ ও ‘প্রোটিন কনসেনট্রেন্ট’ নামে কিছু পণ্যের জন্য এমন কারিগরি শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা বাজারের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, এসব শর্তের কারণে নির্দিষ্ট একটি কোম্পানির পণ্য ছাড়া অন্য কোনো পণ্য যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। ফলে কার্যত দুয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী কারিগরি স্পেসিফিকেশন এমন হতে হবে, যাতে তা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করে। কিন্তু বাস্তবে কিছু টেন্ডারে এমন শর্ত দেওয়া হচ্ছে, যা প্রতিযোগিতা সীমিত করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এর ফলে সরকারও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, প্রতিযোগিতা কমে গেলে ক্রয়মূল্য বেশি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অভিযোগকারী ঠিকাদারদের কয়েকজন বলেন, তারা টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল চান না; বরং সব যোগ্য প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে চান। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, সংশ্লিষ্ট টেন্ডারগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত; ই-জিপি প্রক্রিয়ায় সব যোগ্য ঠিকাদারের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; প্রতিযোগিতাবিরোধী বা অযৌক্তিক শর্ত বাতিল করা; ক্রয় কার্যক্রমে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা; নিম্নমানের খাদ্য বা ওষুধ সরবরাহের অভিযোগ থাকলে দুদকের মাধ্যমে তদন্ত করা।

একজন অভিযোগকারী বলেন, ‘আমরা চাই না কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা হোক। আমরা চাই নিয়ম মেনে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকুক।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের খুলশী ওয়্যারলেস মুরগি খামারের উপপরিচালক ও টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ডা. আলমগীর বলেন, টেন্ডার কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে সরকারি ই-জিপি পদ্ধতি এবং প্রচলিত ক্রয়বিধি অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। কারিগরি স্পেসিফিকেশন ও যোগ্যতার শর্ত সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসারেই নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো ঠিকাদারের অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষ যাচাই করবে। আমরা স্বচ্ছতা বজায় রেখেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছি।

খুলশী ওয়্যারলেস মুরগি খামারের উপপরিচালক (ডিডি) ও সংশ্লিষ্ট টেন্ডারের শর্ত প্রণয়নকারী কর্মকর্তা ডা. ওয়ারিস কামালও একই কথা বলেন।

তবে পরিচালক ডা. মো. আতিয়ার রহমান আ.লীগের ঠিকাদারের পক্ষ নিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ করলেও সেটি দেখার বিষয় নয়। যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে থাকলে আ.লীগের প্রতিষ্ঠান হলেও পাবে।

অভিযোগ রয়েছে ১০ শতাংশ ঘুস নিয়ে আ.লীগের ওই ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার কাজ করছেন এই কর্মকর্তা।