আল-আকসা নিয়ে হুমকিতে জর্ডান
- আপডেট সময় ০৪:১০:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
- / ২২ বার পড়া হয়েছে
মক্কা ও মদিনার পর ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা। মুসলমানরা প্রায় ১ হাজার ৪০০ বছর ধরে আল-আকসা মসজিদে নামাজ আদায় করে আসছেন। তাত্ত্বিকভাবে এবং আইন অনুযায়ী আল-আকসা মসজিদের তত্ত্বাবধান করার দায়িত্ব জর্ডানের রাজপরিবারের। বর্তমানে এই দায়িত্ব পালন করছেন দেশটির বর্তমান শাসক বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। হজরত মুহাম্মদ (সা.) পূর্বপুরুষ হাশেমী বংশের সন্তান। তিনি রাসুল (সা.)-এর সরাসরি বংশধারার ৪১তম স্থানে রয়েছেন এবং তিনি আল-আকসার রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনে প্রতিরক্ষার জন্য দায়ী।
কিন্তু পশ্চিমাদের সহায়তায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই পবিত্র স্থানটির ওপর নজর পড়ে ইহুদি বর্ণবাদী দেশটির। বিশেষ করে, পঁচিশ বছর ধরে ইসরাইলের কট্টর জায়নবাদী ও মুসলিমবিদ্বেষী নেতারা আল-আকসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে আগ্রাসী তৎপরতা চালিয়ে আসছে।
২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইলের তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা এরিয়েল শ্যারন ১,০০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য নিয়ে আল-আকসা কমপ্লেক্সে অভিযান চালান। তার এই পদক্ষেপটি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা বা গণঅভ্যুত্থানের সূত্রপাত ঘটায়। এটি ছিল ইসরাইলের আল-আকসা কমপ্লেক্স দখলের অপচেষ্টার ধীরগতির তৎপরতার সূচনা। শ্যারনের সেই জঘন্য অভিযানের পর থেকেই ইসরাইল আল-আকসা কমপ্লেক্সের ওপর জর্ডানের নিয়ন্ত্রণ খর্ব করে চলেছে।
গত মাসেও ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী এই কমপ্লেক্সের সর্বত্র বিচরণ করেছে এবং চত্বরটির কেন্দ্রে একটি পুলিশ স্টেশনও স্থাপন করেছিল। মসজিদের কর্মীরা ইসরাইলি সেনাদের অনুমতি ছাড়া তাদের অফিস রঙ করতে বা পানি সরবরাহের পাইপ মেরামত করতে পারেননি। চত্বরটির দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত প্রাচীন প্রার্থনা কক্ষের দেয়ালগুলো বুলেটের ছিদ্রে ভরা। ইসরাইলি বাহিনী মুসল্লিদের লক্ষ্য করে যে গুলি চালিয়েছে, এর অনেকগুলেই দেয়ালে গিয়ে আঘাত করেছিল। আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা সমর্থিত দীর্ঘস্থায়ী স্থিতাবস্থা অনুসারে এই হস্তক্ষেপ শুধু জঘন্যই নয়, সম্পূর্ণ অবৈধও। কিন্তু ইসরাইল এর চেয়েও খারাপ কিছু ঘটানোর পরিকল্পনা করছে।
অন্ধকার নজির
সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আল-আকসার তত্ত্বাবধানের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন থেকে জর্ডানের রাজপরিবারকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র করছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কিন্তু জর্ডানি ও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে আল-আকসা মসজিদের ইমাম এবং অন্য কর্মকর্তাদের নিয়োগের ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করবে ইসরাইল। এমনকি তা শুক্রবারের খুতবার বিষয়বস্তু অনুমোদনেও ইসরাইলকে ভূমিকা পালনের সুযোগ করে দেবে বলে জানা গেছে।
১৯৯৪ সালে ইহুদিসন্ত্রাসী বারুখ গোল্ডস্টেইন ২৯ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করার পর হেবরনের ইব্রাহিমি মসজিদকে বিভক্ত করা হয়েছিল। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। ঘাতক গোল্ডস্টেইন ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের অন্যতম আদর্শ। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি তার ড্রইং রুমের দেয়ালে গোল্ডস্টেইনের ছবি টাঙিয়ে রেখেছিলেন।
বেন গভির নিয়মিতভাবে আল-আকসার স্থিতাবস্থা লঙ্ঘন করছেন, পঁচিশ বছর আগে শ্যারনের অনুকরণে আল-আকসায় জোর করে প্রবেশ করছেন। গত মাসে তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমার নিজেকে এখানকার মালিক বলে মনে হয়।’ এই উগ্রপন্থি ইহুদি আল-আকসা কমপ্লেক্সের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মুসলমানদের ইবাদতের প্রাচীন স্থান ‘ডোম অব দ্য রক’ ধ্বংস করে তার জায়গায় তৃতীয় মন্দির নির্মাণে বদ্ধপরিকর। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ আল-আকসায় ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের মুখে কি নতি স্বীকার করবেন?
জর্ডান এমন একটি দেশ, যার ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ মূলত ইসরাইল সীমান্তের সঙ্গে একটি সরু ভূখণ্ডে বাস করে। এই পরিস্থিতিতে সংঘাত বাধলে বাদশাহ আবদুল্লাহর জন্য ইসরাইল হবে একটি নিষ্ঠুর শত্রু। কিন্তু তারপরও তার আল-আকসায় ইসরাইলি আগ্রাসন প্রতিরোধ করার মতো জোরালো যুক্তি আছে তার কাছে। কারণ, ১৯১৬ সালের আরব বিদ্রোহের প্রথম দিন থেকেই হাশেমী বংশের বাদশাহরা ফিলিস্তিনের পরিচয়, এর জনগণ এবং জেরুসালেমের পবিত্র স্থানগুলো রক্ষার জন্য আরব সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে বাদশাহ আবদুল্লাহরও।
ইসরাইল আল-আকসা কমপ্লেক্স দখলের চেষ্টা করলে তা প্রতিরোধে ধর্মযুদ্ধ শুরু করার অধিকার তার আছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইসরাইল যদি আল-আকসা দখলের চেষ্টা করে, তবে আবদুল্লাহ সম্ভবত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তা মেনে নিয়ে একটি প্রতিবাদ বিবৃতি দিয়েই সন্তুষ্ট থাকবেন। কিন্তু এটিও মনে রাখতে হবে, আবদুল্লাহ এর আগেও আগেও ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আবদুল্লাহ ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবকে এই বার্তা পাঠিয়েছিলেন, নেতানিয়াহু যদি ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক জর্ডানের ভূখণ্ডে বিতাড়িত করার হুমকি কার্যকর করেন, তবে জর্ডান ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে প্রস্তত। জর্ডান বর্তমানে সীমান্ত সুরক্ষিত রাখে, যার ফলে ইসরাইলের জন্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়। এটি ধরে নেওয়া যেতে পারে, যুদ্ধ শুরু হলে সেই স্থিতিশীলতা রাতারাতি উধাও হয়ে যাবে।
যুদ্ধে ইসরাইলের উন্নত সশস্ত্র বাহিনীকে জর্ডান যে পরাজিত করতে পারবে না, তা আবদুল্লাহর জানা আছে। কিন্তু তার এটাও জানা আছে, হাশেমী সম্প্রদায়কে উৎখাত করলে ইসরাইলকেও মূল্য দিতে হবে। জর্ডানের সঙ্গে ইসরাইলের ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্তের বেশির ভাগই পার্বত্য অঞ্চল এবং কিছু অংশে পাহারা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। জর্ডান বর্তমানে তার সীমান্ত সুরক্ষিত রাখে, যা ইসরাইলের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। এটি ধরে নেওয়া যেতে পারে, যুদ্ধ শুরু হলে ইসরাইলের সেই স্থিতিশীলতা রাতারাতি উধাও হয়ে যাবে।
মনে রাখতে হবে, ইসরাইলের পূর্বদিকে জর্ডানের একটি উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে। ফলে ইসরাইলকে এমন দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হবে যে ধরনের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত করেছিল। এটি হবে ইসরাইলের এমন একটি অভিযান, যা নিশ্চিতভাবেই সিরিয়া, ইরাক, সৌদি আরব এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ থেকে যোদ্ধাদের টেনে আনবে।
ধর্ম যুদ্ধ
গাজায় ইসরাইলি গণহত্যা এবং অধিকৃত পশ্চিমতীর ও লেবাননে ইসরাইলের নৃশংসতার কারণে আঞ্চলিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। এই ক্ষোভ শুধু জর্ডানের ২৪ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থীই নয়, বরং সমগ্র জর্ডানবাসীই অনুভব করছে। উল্লেখ্য, জর্ডান/পশ্চিম তীর সীমান্তে সাম্প্রতিক দুটি হামলা পূর্ব তীরের বাসিন্দারাই চালিয়েছিল।
গাজায় ইসরাইলি বোমাবর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞের সময় নিষ্ক্রিয় থাকার জন্য অপরাধবোধে ভোগেন জর্ডানবাসী। তাদের এই অপরাধবোধই ব্যাখ্যা করে কেন জর্ডানের সীমান্ত ইসরাইলের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটি বাদশাহ আবদুল্লাহর চিন্তাভাবনায়ও প্রভাব ফেলবে। তিনি হয়তো এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন, ঝুঁকি যাই হোক না কেন, আল-আকসায় ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধই হাশেমী সম্প্রদায়কে টিকে থাকার সেরা সুযোগ করে দেবে।
বাদশাহ হয়তো এটাও উপলব্ধি করেন, ইরানের কাছে ট্রাম্পের অসম্মানজনক পরাজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্র নয়। যদি আবদুল্লাহ আল-আকসার প্রতিরক্ষার জন্য যুদ্ধে যান, তবে আপাতদৃষ্টিতে অরক্ষিত জর্ডান হয়তো দেখবে যে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ধারণার চেয়েও তার বেশি বন্ধু রয়েছে।
যেহেতু ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থানে অবৈধ লুটপাটের অভিযানের কথা ভাবছে, সেজন্য বাদশাহ আবদুল্লাহকেও অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সে সংকট হচ্ছে, হয় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর কাছে নতি স্বীকার করা অথবা প্রতিরোধ করে নিজের জীবন এবং সিংহাসনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা। তার এই সিদ্ধান্তের ওপর শুধু হাশেমী রাজবংশের কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎই নির্ভর করছে না, বরং এটি পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্যই একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করবে।
কারণ পবিত্র এই স্থানটি ইসলামি ধর্মতত্ত্ব ও বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি প্রায় দুই বিলিয়ন মুসলমানের বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করে। বাদশাহ আবদুল্লাহ কখনোই ইসরাইল বা অন্য কাউকে এই মসজিদ নিয়ন্ত্রণ করতে দেবেন না। আল্লাহ না করুন, যদি ইসরাইল আল-আকসার স্থিতাবস্থা পরিবর্তন করে, তাহলে তা একটি ধর্ম যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবে, যা আল-আকসার সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে মোতালেব জামালী























